৩৯০ জন কারাগারে
আনসারের বিক্ষোভে ষড়যন্ত্র দেখছে সরকার
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে আকস্মিক সচিবালয় অবরুদ্ধ করে রাখার পেছনে আনসার সদস্যদের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে সরকার। ইতোমধ্যে ঘটনার নেপথ্য কুশীলবদের খুঁজে বের করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবি পূরণে সব ধরনের আলোচনার পথ খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সচিবালয় ঘিরে রেখে বিশৃঙ্খলা এবং ছাত্র-জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত আনসার সদস্যদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩৯০ জন আনসার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর আদালতের আদেশে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঘটনার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল একে ভয়াবহ পরিস্থিতি বলে উল্লেখ করেছেন।
ষড়যন্ত্র : চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে রোববার সকালে শাহবাগ এলাকায় আনসারদের অবস্থান কর্মসূচির পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে সরকার। এমনকি তাদের কর্মসূচি পূর্বনির্ধারিত ছিল না। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। মূলত রোববার দুপুরের পর আকস্মিক তারা সচিবালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেয়। পরে সচিবালয়ে উপদেষ্টা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে রেখে তাৎক্ষণিক দাবি আদায়ের পেছনে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, হঠাৎ বিপুলসংখ্যক আনসার সদস্যের রাজধানীতে জমায়েতের বিষয়টি সন্দেহজনক। এর পেছনে ইন্ধনদাতা হিসাবে পতিত হাসিনা সরকারের বেশ কয়েকজন পলাতক নেতার হাত রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আনসারদের একটি অত্যুৎসাহী গোষ্ঠী দাবি আদায়ের নামে সচিবালয় দখল করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। তবে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে কুচক্রীদের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাতে সচিবালয়ে কয়েকজন উপদেষ্টা ও ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটকে রাখা হয়েছে-এমন খবর পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে মিছিল নিয়ে তারা সচিবালয় অভিমুখে রওয়ানা দেন। কিন্তু প্রেস ক্লাব এলাকায় পৌঁছালে বিক্ষোভরত আনসার সদস্যদের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ বাধে। আনসার সদস্যরা ছাত্রদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমসহ আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে শিক্ষার্থীরা ছুটে এলে পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উচ্ছৃঙ্খল আনসার সদস্যদের হটাতে ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে অ্যাকশন শুরু করে পুলিশ। এমন সম্মিলিত আক্রমণের মুখে আনসার সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন। দলে দলে তারা সচিবালয় ছেড়ে পালিয়ে যান। এ সময় ছাত্রদের আক্রোশ থেকে রেহাই পেতে আনসার সদস্যদের অনেকে পোশাক খুলে ওপরে হাত তুলে লাইন ধরে বেরিয়ে যান। তবে ঘটনার আকস্মিকতায় সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনে আটকে পড়া অর্ধশতাধিক আনসার সদস্য পরে সেনাবাহিনীর কাছে আশ্রয় নেন।
গ্রেফতার ৩৯০ : সোমবার রমনা, শাহবাগ, পল্টন ও বিমানবন্দর থানায় দায়েরকৃত পৃথক চার মামলায় ৩৯০ জন আনসার সদস্যকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এছাড়া মামলায় আরও ২-৩ হাজার আনসার সদস্যকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। সোমবার গ্রেফতার ৩৯০ আনসারকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরে শুনানি শেষে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এ সংক্রান্ত মামলার এজাহারে বলা হয়, চাকরি জাতীয়করণসহ বিভিন্ন দাবিতে আনসার সদস্যরা রাজপথ অবরোধ করে রাখেন। এ সময় পুলিশ তাদের ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুরোধ অমান্য করে রাস্তা অবরোধের মাধ্যমে যান চলাচলের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ অন্য উপদেষ্টারা তাদের দাবিদাওয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সাধারণ আনসারদের পক্ষে কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে তাৎক্ষণিক বৈঠক করেন। তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো একটি কমিটি গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নে আশ্বাস দেন। কিন্তু আনসার সদস্যরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সচিবালয়ের চারপাশে অবস্থান নিয়ে অবরুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেন। তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে তারা রাস্তার ওপর আগুন ধরিয়ে দেন এবং চলাচলরত যানবাহনে ভাঙচুর চালান। এতে জনতার মধ্যে একধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির সঞ্চার হয়।
এদিকে সোমবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সচিবালয়ে অনুপ্রবেশকারী কয়েকজন আনসার সদস্য জীবনরক্ষায় নিরাপদ আশ্রয় চাওয়া কয়েকজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে সেনাবাহিনী। এর আগে কিছু আনসার সদস্য সচিবালয়ের ৩ নম্বর গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। কয়েকজন আনসার সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছাত্রদের ওপর অতর্কিত হামলা করেন। সচিবালয়ের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর টহলের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এতে ছয় সেনাসদস্য আহত হন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েনরত সেনাসদস্যরা বারবার আনসার সদস্যদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় আকাশের দিকে ২৭টি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। পরে সচিবালয় এলাকায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়। আনসার সদস্যদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরে অবরুদ্ধ সাত উপদেষ্টা, আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সচিবালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সেনাবাহিনীর সহায়তায় সচিবালয় এলাকা ছেড়ে যান।
শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল : রোববারের ঘটনার পর বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে আনসারের উপমহাপরিচালক ও পরিচালক পদমর্যাদার ১৯ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। বদলিকৃত উপমহাপরিচালকরা হলেন গাজীপুরের সফিপুরে অবস্থিত আনসার ও ভিডিপি একাডেমির ডেপুটি কমান্ড্যান্ট নূরুল হাসান ফরিদীকে খুলনা রেঞ্জে, চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিচালক সাইফুল্লাহ রাসেলকে সদর দপ্তরে, খুলনা রেঞ্জের উপমহাপরিচালক শাহ আহমদ ফজলে রাব্বীকে রাজশাহী রেঞ্জে, সিলেট রেঞ্জের উপমহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আউয়ালকে ময়মনসিংহ রেঞ্জে, রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিচালক কামরুন নাহারকে আনসার একাডেমির ডেপুটি কম্যান্ডান্ট, সদর দপ্তরের উপমহাপরিচালক (অপারেশন্স) ফখরুল আলমকে বরিশাল রেঞ্জে, ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিচালক সাইফুর রহমানকে চট্টগ্রাম রেঞ্জে, বরিশাল রেঞ্জের উপমহাপরিচালক আশরাফুল আলমকে ঢাকা রেঞ্জে এবং ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিচালক মো. জিয়াউল হাসানকে সিলেট রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া দপ্তর দরদবদল হয়েছে ১০ পরিচালকের।
পরিস্থিতি ভয়াবহ হতো : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন ছাত্ররা মোকাবিলা না করলে সচিবালয়ে ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ হতো। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে গিয়ে এ কথা বলেন তিনি। উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনারা তাদের (আনসারদের) যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখেছেন। তাদের দাবি ছিল এক্ষুনি রাত ১০টার সময় প্রজ্ঞাপন করে তাদের জাতীয়করণ করতে হবে। আমরা মনে করি, কাল (রোববার) আনসার বাহিনীর ছদ্মাবরণে যারা এসেছিল, কোনো দাবি আদায়ের এজেন্ডা তাদের ছিল না। তারা এমন একটা অসম্ভব দাবি তুলেছিল গন্ডগোল করার জন্য। সারা সচিবালয় ঘেরাও করে রেখেছিল। হয়তো আরও অনেকে যোগ দিত। ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারত। কিন্তু যে জাগ্রত ছাত্রসমাজ স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, তারা আবারও তাদের অপরিসীম ত্যাগের ভূমিকায় এই পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।’
আসিফ নজরুল আরও বলেন, তারা বারবার আলাপ-আলোচনা করে সম্মত হয়ে ফিরে গেছে। বারবার আমাদের ঘিরে রেখেছে। লাঠি তাদের স্টকে ছিল। আপনারা দেখেছেন, তারা কী মারমুখীভাবে ছাত্রদের ওপর, যে ছাত্ররা স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, যারা আমাদের স্বপ্ন এবং যাদের ভবিষ্যতের প্রতিভূ হিসাবে দেখি, তাদের রাস্তায় ফেলে কী নির্মমভাবে মেরেছে। তিনি বলেন, কোনো ষড়যন্ত্র সফল হবে না। যারা ষড়যন্ত্র করবে, যারা ছাত্র-জনতার এ গণ-অভ্যুত্থানকে দাবি আদায়ের ছদ্মাবরণে বা বিভিন্ন অজুহাতে, বিভিন্ন ছদ্মাবরণে যারা এটাকে নস্যাৎ করতে চাইবে, তাদের বিরুদ্ধে তো আমরা প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেব। এছাড়া ছাত্র-সমাজ যারা আছে, তারা জাগ্রত আছে। এই ছাত্র-সমাজকে পরাজিত করা এবং তাদের বিভ্রান্ত করা যাবে না। এ মেসেজই দিতে চাই।’
