Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

যুদ্ধে তেল গ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি

দেড় লাখ কোটি টাকা লোকসানের শঙ্কা

Advertisement

শাহেদ সিদ্দিকী

শাহেদ সিদ্দিকী

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেড় লাখ কোটি টাকা লোকসানের শঙ্কা

Advertisement

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম গত ৪ বছরে সর্বোচ্চ। এর অন্যতম ভুক্তভোগী দেশের অর্থনীতি। শুধু তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে লোকসান দিতে হচ্ছে প্রতি মাসে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছরে এই তিন সেবা খাতে সরকারকে লোকসান গুনতে হবে দেড় লাখ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মূলত বিশ্ববাজারে তেল এবং গ্যাসের দাম গত চার বছরে সর্বোচ্চ। তাই যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে তেল-গ্যাসের বিল পরিশোধে এই লোকসান বাড়ছে। গত অর্থবছরে এই তিন খাতে লোকসান হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশকে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপিসি সব উদ্যোগ নিয়েছে। তেলের মজুত আছে ৩০ দিনের বেশি। ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য বিকল্প পথে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়েছে।

একই অবস্থা পেট্রোবাংলার। গ্যাস খাতের লোকসান নিয়ে চিন্তিত পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর অর্থাৎ মাত্র ৩ মাসে এলএনজি আমদানি করে লোকসান দিতে হয়েছে ১১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। নভেম্বর পর্যন্ত এই লোকসান ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে। সুতরাং যুদ্ধ না থামলে সামনে বাংলাদেশের জন্য যে বড় বিপদ আসছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বড় ক্ষত বিদ্যুৎ খাতে : বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রির জন্য পিডিবির লোকসানের পাল্লা দিনে দিনে ভারী হচ্ছে। ২০২৩-২৪ সালে পিডিবি লোকসান দিয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি (এর মধ্যে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকা)। গেল অর্থবছরে এই লোকসান গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা (এর মধ্যে ভর্তুকি ৪৩ হাজার কোটি টাকা)। জুনে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। মনে করা হয়েছিল বিদ্যুৎ খাতে লোকসান কিছুটা কমবে। কিন্তু তা না কমে বরং বেড়েছে। কারণ বিশ্ববাজারে বেড়েছে ফার্নেস অয়েল এবং কয়লার দাম। দেশে এখন দৈনিক বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয় ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এর মধ্যে কয়লা এবং ফার্নেস অয়েল দিয়ে উৎপাদিত হয় সাড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াটের মতো। পিডিবি জানিয়েছে, আগে প্রতি টন ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ৩০০ থেকে ৩৫০ ডলার। এখন সেটি গিয়ে ঠেকেছে ৯০০ ডলারে। এর সঙ্গে ভ্যাট-ট্যাক্স ধরলে এখন ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ে ৩১ টাকার মতো। একই সঙ্গে কয়লার আমদানি খরচ ও বেড়েছে। প্রতি টন কয়লার দাম এখন ১১০ ডলার থেকে বেড়ে ১৪০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। এ কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম আগের চেয়ে বাড়বে। সব মিলিয়ে এই অর্থবছরে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকার লোকসান হতে পারে পিডিবির।

সরকারি কর্মকর্তারা জানান, পিডিবি এখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে ৮ দশমিক ১৯ টাকায় (এর মধ্যে ৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়)। আর প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয় মূল্য পড়ছে প্রায় ১৪ টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেনার বিল পরিশোধের জন্য অর্থ বিভাগের কাছে ২৬ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাওয়া গেছে ২০ হাজার কোটি টাকা।

দাম বাড়িয়েও স্বস্তিতে নেই বিপিসি : দেশে প্রতিবছর ৭০ লাখ টনের বেশি তেল আমদানি করা হয়। এর পুরোটাই এনে বিক্রি করে বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি তেলের দাম। তাই লোকসান পুষিয়ে নিতে ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল এবং কেরোসিনে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এতে করে অন্য সব জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির কারণে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিপিসি লোকসান দিয়েছে ২৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। দাম বাড়ানোর কারণে এখন এই লোকসান কিছুটা কমেছে। প্রতি মাসে লোকসান হচ্ছে ২ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা।

বিপিসির এক হিসাবে বলেছে, এ বছর জানুয়ারিতে বিপিসি তেল আমদানির বিল দিয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। মার্চে ৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, এপ্রিলে ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা, মে মাসে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে ১৪টি পার্সেল (জাহাজ) তেল আমদানি করে বিল দিয়েছে ২ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। সেখানে চলতি বছরের আগস্টে ১৮টি পার্সেল আমদানি করে বিল দেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে সেপ্টেম্বরে ১৮টি পার্সেল আমদানি করে বিল দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এ বছর একই মাসে ১৭টি পার্সেল আমদানি করে বিল দেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ তেল আমদানির খরচ গত বছরের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

গ্যাস খাতের কি হবে : যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ইউনিট এলএনজি বিশ্ববাজার বা কাতার, ওমান থেকে কেনা হত ৯-১০ ডলারে। সেই গ্যাস এখন কিনতে হচ্ছে ৩১ থেকে ৩২ ডলারে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার বা ওমান গ্যাস দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে (যুদ্ধের ফলে) বাংলাদেশ এখন বেশির ভাগ গ্যাস আমদানি করছে জাপান-কোরিয়া মার্কার বা জেকেএম থেকে। আগে এক কার্গো এলএনজি কিনতে পেট্রোবাংলাকে বিল দিতে হতো ৩ থেকে সাড়ে তিন কোটি ডলার। এখন সেই বিল গিয়ে ঠেকেছে ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। এর প্রভাব পড়বে গ্যাস সরবরাহে। এখন প্রতি ইউনিট (দেশি ও আমদানি করা গ্যাসের মিশ্রণ) গ্যাসের দাম পড়ছে ৫২ টাকা ১৮ পয়সা। আর বিক্রি করা হচ্ছে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে সরকারের লোকসান ২৮ টাকা ২৮ পয়সা। গত অর্থবছরে প্রতি ইউনিট গ্যাস সরবরাহ ব্যয় ছিল ৪৬ টাকা ২৫ পয়সা। আর বিক্রি করা হয়েছে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে সরকারের লোকসান হয়েছে ২২ টাকা ৩৫ পয়সা। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি করে লোকসান দেওয়া হয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকার মতো। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এই লোকসান হয়েছে ১৩ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। আর নভেম্বর পর্যন্ত এই লোকসান হবে ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এই ২৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের মধ্যে এখন পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ১৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গ্যাসের দাম না কমলে চলতি অর্থবছরে গ্যাস খাতে লোকসান ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জাপানি বিনিয়োগ : আড়াইহাজার থেকে মাতারবাড়ী গন্তব্য হতে হবে মেড ইন বাংলাদেশ

গন্তব্য হতে হবে মেড ইন বাংলাদেশ

ঢাকায় ৭শ অতিরিক্ত শিক্ষক, গ্রামে হাহাকার ক্লাস নেই, দিন কাটে আড্ডায়

ক্লাস নেই, দিন কাটে আড্ডায়

টোকিওতে অর্থনৈতিক ফোরামে তারেক রহমান ৫ অগ্রাধিকার খাতে বড় বিনিয়োগের আহ্বান

৫ অগ্রাধিকার খাতে বড় বিনিয়োগের আহ্বান

যুদ্ধে তেল গ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি দেড় লাখ কোটি টাকা লোকসানের শঙ্কা

দেড় লাখ কোটি টাকা লোকসানের শঙ্কা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম