ঢাকায় ৭শ অতিরিক্ত শিক্ষক, গ্রামে হাহাকার
ক্লাস নেই, দিন কাটে আড্ডায়
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ নেই। অথচ এ দুই বিষয়ে ১৬ জন শিক্ষক কর্মরত। সবুজবাগ সরকারি কলেজে মৃত্তিকাবিজ্ঞান ও দর্শন না থাকলেও এ দুই বিষয়ে চারজন শিক্ষক রয়েছেন। মূলত ক্লাস না থাকলেও তদবির করে ঢাকায় থাকার জন্যই এসব শিক্ষক এখানে পদায়ন নিয়েছেন। শুধু এ দুটি কলেজই নয়, রাজধানীর ২৫টি সরকারি কলেজে অনুমোদিত পদের চেয়ে প্রায় ৭শ শিক্ষক বেশি রয়েছেন; যাদের অনেকেই নিয়মিত ক্লাস নেন না। কারও কারও সময় কাটে ঘোরাফেরা আর আড্ডায়। অথচ এর ঠিক উলটো চিত্র ঢাকার বাইরের জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকার কলেজগুলোয়। সেখানে চরম শিক্ষক সংকটে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বৈষম্যের অন্যতম কারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের রাজধানীমুখী প্রবণতা। ঢাকায় পদায়ন পেতে তদবির, প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ এবং বদলি-পদায়নে স্বচ্ছতার ঘাটতির (অনিয়ম) কারণে দীর্ঘদিন রাজধানীর কলেজগুলোয় অতিরিক্ত শিক্ষক পদায়নের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যার খেসারত দিচ্ছেন প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীরা। এরপরও রাজধানীর কলেজগুলোয় শিক্ষকদের উপস্থিতি, নিয়মিত ক্লাস নেওয়া এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব অতিরিক্ত শিক্ষকের অনেকেই নিয়মিত কলেজে আসেন না। কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-শৃঙ্খলাও মানেন না। মাস শেষে শুধু বেতন-ভাতা তুলছেন। অনেক সিনিয়র শিক্ষক আছেন যারা সপ্তাহে বা মাসে একটি ক্লাসও নেন না।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, সরকারি কলেজে শিক্ষক পদায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
রাজধানীতে পদের চেয়ে শিক্ষক বেশি : মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর ২৫টি সরকারি কলেজে মোট অনুমোদিত পদ ১ হাজার ৫০৯টি। এর বিপরীতে কর্মরত ২ হাজার ১৭৯ জন। অর্থাৎ, অনুমোদিত পদের চেয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক ৬৭০ জন। শতকরা হিসাবে ৪৪ দশমিক ৪ ভাগ অতিরিক্ত। সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন সরকারি বাঙলা কলেজে। সেখানে ১১৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৯১ জন (অতিরিক্ত ৭৬ জন)। মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে ৪৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে শিক্ষক আছেন ১০৫ জন; অর্থাৎ ৬১ জনই অতিরিক্ত। সবুজবাগ কলেজে ২২টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৭৮ জন শিক্ষক; এখানে অতিরিক্ত ৫৬ জন। ঢাকা সরকারি উদ্যান কলেজের বাংলা বিভাগে দুটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ১০ জন। এছাড়া কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সে ১৫টি পদের বিপরীতে শিক্ষক ৬৮ জন, দুয়ারীপাড়া কলেজে ২২টির বিপরীতে ৭০ জন, তিতুমীর কলেজে ১৭১টির বিপরীতে ২০৯ জন, কবি নজরুল সরকারি কলেজে ৮৬টির বিপরীতে ১২১ জন, সোহরাওয়ার্দী কলেজে ৭৩টির বিপরীতে ১০৫ জন, আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২১টি পদের বিপরীতে শিক্ষক ৪০ জন, উত্তরা কলেজে ৪১টির বিপরীতে ৬৮ জন, ঢাকা কলেজে ২০১টির বিপরীতে ২২৩ জন, ইডেন মহিলা কলেজে ২১৬টির বিপরীতে ২৪৬ জন এবং বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ১২৫টির বিপরীতে ১৫৪ জন শিক্ষক রয়েছেন। লালমাটিয়া সরকারি কলেজ ও ঢাকা টিটিসি কলেজে ৩৭টি করে পদের বিপরীতে কর্মরত শিক্ষক ৫৪ জন করে। তবে রাজধানীর রূপনগর সরকারি কলেজ, লালবাগ সরকারি কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় পদের চেয়ে শিক্ষক কম রয়েছে।
মফস্বলে উলটো চিত্র : রাজধানীতে অতিরিক্ত শিক্ষকের ভিড় থাকলেও ঢাকার বাইরের কলেজগুলো ধুঁকছে শিক্ষক সংকটে। মাউশির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭০৮টি সরকারি কলেজে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২ হাজার শূন্য পদ পূরণের আবেদন দিয়েছে মাউশি।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি কলেজে দর্শন, রসায়ন, আইসিটিসহ ছয়টি বিষয়ে কোনো প্রভাষক নেই। অন্যান্য বিভাগেও শিক্ষক সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় শূন্য পদে শিক্ষক চেয়ে সম্প্রতি মাউশিতে আবেদন করেছেন কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবদুল বাসার।
বরগুনা সরকারি মহিলা কলেজেও সংকট প্রকট। বাণিজ্য বিভাগের পাঁচটি পদের বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন। বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতে একজন করে শিক্ষক থাকলেও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষক নেই। মানবিক বিভাগের সমাজকর্ম, ইতিহাস ও ইসলাম শিক্ষা বিষয়েও শিক্ষক সংকট রয়েছে। কলেজটির শিক্ষক তরিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে আমাদের অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হয়। অনেক সময় নিজের বিষয়ের বাইরে গিয়েও ক্লাস নিতে বাধ্য হই। এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষক সংকটপূর্ণ কলেজগুলোয় প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক এবং কোথাও শিক্ষক সংকট থাকলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদান ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি মনিটরিংয়ের আওতায় আনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীর কলেজগুলোয় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক পদায়নের বিষয়টি খতিয়ে দেখব। শিক্ষক পদায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত শিক্ষক থাকলে বা অন্য প্রতিষ্ঠানে সংকট থাকলে সেই বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

