কাজ শেষ না করেই পুরো বিল তুলে নিয়ে গেছেন ঠিকাদার
jugantor
ঝিনাইদহে সড়ক উন্নয়ন কাজে দুর্নীতি
কাজ শেষ না করেই পুরো বিল তুলে নিয়ে গেছেন ঠিকাদার

  মিজানুর রহমান, ঝিনাইদহ  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের অধীন খালিশপুর-মহেশপুর-দত্তনগর-জিন্নানগর-যাদবপুর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের পুরো কাজ না করেই বিল তুলে নিয়ে গেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। আর এ কাজে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

জানা যায়, ঝিনাইদহের সীমান্ত সংলগ্ন মহেশপুর উপজেলার মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য ৪৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সড়কের মেরামত সংস্কার, মাটি ভরাট এবং ১৫টি কালভার্ট/ব্রিজ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৭৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের ১ মার্চ থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সময়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ৪টি প্যাকেজে কাজটি শেষ করার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। খুলনার মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড জেভি (যৌথ) সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ঠিকাদার নির্বাচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাখিল করা দরপত্র মূল্যায়ন করে ২০১৮ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে পৃথক স্মারকে ৪টি কার্যাদেশ জারি করা হয়।

প্রথম প্যাকেজে জিরো জিরো মিটার থেকে ২৭ দশমিক ৯০০ মিটার পর্যন্ত প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ধরা হয় ২৮ কোটি ৭১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। প্যাকেজটির মাত্র ১৬ দশমিক ৩০০ মিটার কাজ হয়েছে। যানবাহন চলাচলের অযোগ্য ১১ দশমিক ৬০০ মিটার কাজ আজও হয়নি। ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিল প্রদান করা হয়েছে ২০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

দ্বিতীয় প্যাকেজে ২৭ দশমিক ৯০০ মিটার থেকে ৪২ দশমিক শূন্য মিটার পর্যন্ত মোট দৈর্ঘ্য ১৪ দশমিক ১০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাজ হয়েছে মাত্র ৬ কিলোমিটার। বাকি ৮ দশমিক ১০০ কিলোমিটার কাজ ঠিকাদার করেননি। এ প্যাকেজে চুক্তিমূল্য ধরা হয় ১৬ কোটি ৪৭ লাখ ২১ হাজার টাকা। অথচ ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ৯ কোটি ৯০ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বিল দেয়া হয়েছে।

পরিমাপ বইয়ের (এমবি) হিসাব মোতাবেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে সব কটি প্যাকেজ মিলিয়ে ৪৯ কোটি ৭২ লাখ ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগের হিসাব শাখার দেয়া তথ্যে বলা হয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পরিশোধ করা হয়েছে ৫০ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে ৫৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকার গরমিল দেখা গেছে। জানা যায়, খুলনার মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড জেভি (যৌথ) কার্যাদেশ পাওয়ার পর নানা অজুহাতে কাজটি শুরু করতে বিলম্ব করে।

এর ফাঁকে গোপনে কাজটি হাতবদল হয়ে যায়। যশোর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার দু’জন ঠিকাদার কাজটি করেছেন। একপর্যায়ে সড়কটির সবচেয়ে খারাপ দুই অংশ ১৯ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। প্রাক্কলনে ত্রুটির অজুহাত খাড়া করা হয় এবং ঘটনা ধামাচাপা দিতে ২০১৯ সালের শেষ ভাগে মূল প্রকল্পের ডিপিপি মূল্য ৭৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা সংশোধন করে ৮৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা আরডিপিপি করা হয়। এ ক্ষেত্রে মূল প্রকল্পের চেয়ে ১১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বৃদ্ধি দেখানো হয়। একইসঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়।

দরপত্র চুক্তি মোতাবেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (জেভি) ৬৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কাজটি করার কথা ছিল। সেই হিসেবে সড়কটির ফেলে রাখা দুই অংশের কাজ শেষ করতে আরও ২৫ কোটি ১২ লাখ টাকা (সংশোধিত মূল্য সূত্রে) খরচ হবে। ইতোমধ্যে নতুন করে ৫ নম্বর প্যাকেজ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ওই দরপত্রে মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (জেভি) অংশগ্রহণ করলেও সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে ঢাকার আবেদ মুনসুর কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। দরপত্রটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন এবং অনুমোদন করা হয়েছে।

বিভাগীয় সূত্র এ খবর নিশ্চিত করেছে। অনুসন্ধানকালে এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হায়দার বলেন, ডিজাইন পরিবর্তন হওয়ার কারণে ঠিকাদার চুক্তি মোতাবেক কাজ করেননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঠিকাদারের এমন অধিকার রয়েছে। তার ভাষায় নির্বাচিত নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

ঝিনাইদহে সড়ক উন্নয়ন কাজে দুর্নীতি

কাজ শেষ না করেই পুরো বিল তুলে নিয়ে গেছেন ঠিকাদার

 মিজানুর রহমান, ঝিনাইদহ 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের অধীন খালিশপুর-মহেশপুর-দত্তনগর-জিন্নানগর-যাদবপুর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের পুরো কাজ না করেই বিল তুলে নিয়ে গেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। আর এ কাজে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

জানা যায়, ঝিনাইদহের সীমান্ত সংলগ্ন মহেশপুর উপজেলার মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য ৪৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সড়কের মেরামত সংস্কার, মাটি ভরাট এবং ১৫টি কালভার্ট/ব্রিজ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৭৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের ১ মার্চ থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সময়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ৪টি প্যাকেজে কাজটি শেষ করার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। খুলনার মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড জেভি (যৌথ) সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ঠিকাদার নির্বাচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাখিল করা দরপত্র মূল্যায়ন করে ২০১৮ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে পৃথক স্মারকে ৪টি কার্যাদেশ জারি করা হয়।

প্রথম প্যাকেজে জিরো জিরো মিটার থেকে ২৭ দশমিক ৯০০ মিটার পর্যন্ত প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ধরা হয় ২৮ কোটি ৭১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। প্যাকেজটির মাত্র ১৬ দশমিক ৩০০ মিটার কাজ হয়েছে। যানবাহন চলাচলের অযোগ্য ১১ দশমিক ৬০০ মিটার কাজ আজও হয়নি। ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিল প্রদান করা হয়েছে ২০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

দ্বিতীয় প্যাকেজে ২৭ দশমিক ৯০০ মিটার থেকে ৪২ দশমিক শূন্য মিটার পর্যন্ত মোট দৈর্ঘ্য ১৪ দশমিক ১০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাজ হয়েছে মাত্র ৬ কিলোমিটার। বাকি ৮ দশমিক ১০০ কিলোমিটার কাজ ঠিকাদার করেননি। এ প্যাকেজে চুক্তিমূল্য ধরা হয় ১৬ কোটি ৪৭ লাখ ২১ হাজার টাকা। অথচ ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ৯ কোটি ৯০ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বিল দেয়া হয়েছে।

পরিমাপ বইয়ের (এমবি) হিসাব মোতাবেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে সব কটি প্যাকেজ মিলিয়ে ৪৯ কোটি ৭২ লাখ ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগের হিসাব শাখার দেয়া তথ্যে বলা হয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পরিশোধ করা হয়েছে ৫০ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে ৫৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকার গরমিল দেখা গেছে। জানা যায়, খুলনার মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড জেভি (যৌথ) কার্যাদেশ পাওয়ার পর নানা অজুহাতে কাজটি শুরু করতে বিলম্ব করে।

এর ফাঁকে গোপনে কাজটি হাতবদল হয়ে যায়। যশোর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার দু’জন ঠিকাদার কাজটি করেছেন। একপর্যায়ে সড়কটির সবচেয়ে খারাপ দুই অংশ ১৯ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। প্রাক্কলনে ত্রুটির অজুহাত খাড়া করা হয় এবং ঘটনা ধামাচাপা দিতে ২০১৯ সালের শেষ ভাগে মূল প্রকল্পের ডিপিপি মূল্য ৭৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা সংশোধন করে ৮৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা আরডিপিপি করা হয়। এ ক্ষেত্রে মূল প্রকল্পের চেয়ে ১১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বৃদ্ধি দেখানো হয়। একইসঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়।

দরপত্র চুক্তি মোতাবেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (জেভি) ৬৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কাজটি করার কথা ছিল। সেই হিসেবে সড়কটির ফেলে রাখা দুই অংশের কাজ শেষ করতে আরও ২৫ কোটি ১২ লাখ টাকা (সংশোধিত মূল্য সূত্রে) খরচ হবে। ইতোমধ্যে নতুন করে ৫ নম্বর প্যাকেজ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ওই দরপত্রে মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (জেভি) অংশগ্রহণ করলেও সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে ঢাকার আবেদ মুনসুর কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। দরপত্রটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন এবং অনুমোদন করা হয়েছে।

বিভাগীয় সূত্র এ খবর নিশ্চিত করেছে। অনুসন্ধানকালে এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হায়দার বলেন, ডিজাইন পরিবর্তন হওয়ার কারণে ঠিকাদার চুক্তি মোতাবেক কাজ করেননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঠিকাদারের এমন অধিকার রয়েছে। তার ভাষায় নির্বাচিত নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।