খলিলের সামনে জাতিসংঘে পাঁচ চ্যালেঞ্জ
Advertisement
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ এবার বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ অধিবেশনের সভাপতি। ফলে একদিকে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ, অন্যদিকে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসাবে সব দেশের মধ্যে সমন্বয় ও ঐকমত্য তৈরির দায়িত্ব-দুই ভূমিকাই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে ঢাকাকে।
ড. খলিলের মেয়াদ ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হলেও তার এবারের কর্মসূচি ছয়টি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো-শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু, মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা, প্রযুক্তি এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা ও জাতিসংঘ সংস্কার। এই বৈশ্বিক এজেন্ডার সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সরাসরি যোগ রয়েছে অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে। রোহিঙ্গা সংকট থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন, এলডিসি উত্তরণ, অভিবাসন এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা-প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সামনে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর ড. খলিলুর রহমান মিয়ানমারবিষয়ক মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং সংকটের মূল কারণ মোকাবিলায় প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির বিষয়টি উঠে আসে। ২৩ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রথম লড়াই এখন শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ সংগ্রহ নয়, মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা।
জলবায়ুর ক্ষতি ও অর্থের হিসাব : জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য আর ভবিষ্যতের কোনো শঙ্কা নয়; এটি ভূমি, খাদ্য, পানি, জীবিকা ও মানুষের স্থানান্তরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের বাস্তবতার কথা তুলে ধরা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির বক্তব্যে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠ এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হতে পারে-যা দেশের প্রায় ৩ শতাংশ ভূখণ্ডের সমান। একই বক্তব্যে বলা হয়, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাসহ জলবায়ুর প্রভাবে দেশের ভেতরে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ স্থানচ্যুত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই জলবায়ু আলোচনার মূল প্রশ্ন শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো অভিযোজন করবে কীভাবে, ক্ষয়ক্ষতির অর্থ পাবে কোথা থেকে এবং প্রযুক্তি ও অর্থায়ন কত দ্রুত পৌঁছাবে। ড. খলিলুর রহমানের ঘোষিত জলবায়ু কর্মসূচিতে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলকে কার্যকর করা এবং স্বল্পোন্নত দেশ ও ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য সহজলভ্য, পূর্বানুমানযোগ্য ও প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিতের কথা রয়েছে। এখানেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় লড়াই-আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অর্থায়নে পরিণত করা।
এলডিসি উত্তরণ : বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হতে যাচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা বা এলডিসি থেকে উত্তরণ। বাংলাদেশকে ২৪ নভেম্বর ২০২৬ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে উত্তরণের প্রস্তুতিপর্ব বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি বলেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলে প্রস্তুতিপর্ব বাড়ানো উপযুক্ত হতে পারে। ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ বিষয়টি নথিভুক্ত করে এবং ২৪ নভেম্বরের আগে সাধারণ পরিষদকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করে। এখানে বাংলাদেশের সামনে দুটি প্রশ্ন-প্রথমত, উত্তরণের পর রপ্তানি ও বাণিজ্য সুবিধার পরিবর্তন কীভাবে সামলানো হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহায়তা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে রূপান্তরকাল কীভাবে মসৃণ করা হবে। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশবিষয়ক কার্যালয় ২০২৬ সালের ‘বাংলাদেশ গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এলডিসি দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ঋণ, অর্থায়ন, জলবায়ুঝুঁকি ও প্রযুক্তিগত বৈষম্যকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ এলডিসি দেশগুলোতে বাস করলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যে এসব দেশের অংশ ১ দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। ২৪ সেপ্টেম্বর এলডিসি দেশগুলোর বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অর্থনীতিতে এলডিসি দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে জাতিসংঘ প্রযুক্তি ব্যাংকের ভূমিকা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের তৃতীয় লড়াই হলো-‘এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর যেন উন্নয়নের গতি কমে না যায়, বরং নতুন বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়।’
অভিবাসন ও মানব পাচার : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের ভূমিকা বড়। কিন্তু মানব পাচার বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২২ সেপ্টেম্বর ড. খলিলুর রহমান ইউরোপীয় কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিষয় ও অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় ‘অনিয়মিত অভিবাসন, অভিবাসী পাচার, মানব পাচার, অপরাধীচক্র এবং নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথ বাড়ানোর’ বিষয় উঠে আসে। উৎস, ট্রানজিট ও গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়। ড. খলিলুর রহমানের ৮১তম সাধারণ পরিষদের মানবাধিকার ও মানবিক কার্যক্রমবিষয়ক কর্মসূচিতে উৎস, ট্রানজিট ও গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে অভিবাসী ও শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শান্তিরক্ষা ও জাতিসংঘ সংস্কার : শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা বহু বছরের। কিন্তু এখন শান্তিরক্ষা ব্যবস্থাও পরিবর্তনের মুখে। সংঘাতের ধরন বদলেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে এবং জাতিসংঘের অর্থনৈতিক চাপও বেড়েছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রথম অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী করা। তার ঘোষিত উদ্যোগে মানবসম্পদ ও প্রযুক্তির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে শান্তিরক্ষা ব্যবস্থাকে ‘ফিট ফর পারপাস’ করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনার গুরুত্ব অনেক। কারণ শান্তিরক্ষায় দেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দৃশ্যমান ভূমিকার অন্যতম ক্ষেত্র।
অর্থাৎ রোহিঙ্গা, জলবায়ু, এলডিসি উত্তরণ, অভিবাসন ও শান্তিরক্ষা-এগুলো ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির ঘোষিত অগ্রাধিকারের কোনো না কোনো অংশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ছয় স্তম্ভের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু, অভিবাসী ও মানবিক সুরক্ষা এবং জাতিসংঘ সংস্কার-সবগুলোতেই বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। তবে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসাবে ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি ‘সবার সভাপতি’। সাধারণ পরিষদের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের একটি করে ভোট রয়েছে।
সভাপতির কাজ হলো অধিবেশনের কার্যক্রম পরিচালনা, আলোচনায় সমন্বয় করা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরিতে সহায়তা করা। রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন, জলবায়ুর অর্থ, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, নিরাপদ অভিবাসন এবং শান্তিরক্ষায় ভূমিকা-জাতিসংঘে বাংলাদেশের আগামী দিনের কূটনৈতিক লড়াই মূলত এই পাঁচ জায়গাতেই।

