জাতীয় জাদুঘরে ফের হচ্ছে নজরুল কর্নার
চলছে প্রস্তুতি, অক্টোবরের শেষে দৃশ্যমান হবে : মহাপরিচালক * কবির জিনিসপত্র অক্ষত প্রদর্শন চান খিলখিল কাজী
Advertisement
রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয়তলায় ৩৭ নম্বর কক্ষে একসময় চোখে পড়ত ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কর্নার’। সেখানে জাতীয় কবির ব্যবহৃত খাট, টেবিল, পাঞ্জাবি, চশমা, হাতের লেখা, ছবিসহ বেশকিছু জিনিসপত্র দেখে দর্শনার্থীরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ফিরে যেতেন অতীতে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আমলে জাতীয় কবির নামখচিত কর্নারটি বাদ দেওয়া হয়। এতে নজরুলপ্রেমী ও মুক্তচিন্তার মানুষ অনেকেই মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন, ক্ষোভও প্রকাশ করেন কেউ কেউ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হঠাৎ করে নজরুল কর্নারটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। নানা জায়গা থেকে দাবি উঠলে বিভিন্ন সময় সেটি পুনরায় চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর আলোর মুখ দেখেনি। অবশ্য এবার দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়া জাতীয় জাদুঘরের বর্তমান মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব যুগান্তরকে জানিয়েছেন, নতুন নজরুলবর্ষেই (২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে) কবি নজরুলকে বড় পরিসরে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার জাতীয় জাদুঘর ঘুরে দেখা গেছে, জাদুঘরে বিভিন্ন স্থানে স্মরণীয় ও বরণীয় ব্যক্তিদের ছবি বা কর্মের ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। জাদুঘরের ২৬ নম্বর কক্ষে বাংলা সাহিত্যের অন্তত ৫০ জনের অধিক কবি, লেখক ও মনীষীর ছবি স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীম উদ্দীন, হুমায়ূন আহমেদের ছবি বেশি চোখে পড়ে। এই কক্ষে নজরুলের ছবিও আছে। তবে তা স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। অনেকটা খুঁজে বের করে নিতে হয়।
নজরুল কর্নারটির সন্ধান করলে জাদুঘরের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি। এখানে কখনো নজরুল কর্নার ছিল কি না, তা-ও তারা বলতে পারেন না। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মচারী জানালেন, এমন একটা উদ্যোগ ছিল। কিন্তু কী কারণে তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে তা তিনি জানেন না। তিনি জানান, জাদুঘরের তৃতীয়তলার ৩৭ নম্বর কক্ষটি নজরুল কর্নার ছিল। কবি নজরুলের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও বিভিন্ন সময়ের ছবি ছিল। কিন্তু এখন সেখানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা-আন্দোলনভিত্তিক ছবি।
জাতীয় কবির কর্নারকে টানাহ্যাঁচড়া নিয়ে জাদুঘরে ঘুরতে আসা একদল শিক্ষার্থীও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, জাতীয় কবি তো কোনো দলের কেউ নন, তবে তাকে নিয়ে এমন অবহেলা কেন। তটিনি নামের বাংলা কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘জাদুঘর একটি দেশের দর্পণ, এখানে দলাদলি ও মত-দ্বিমতের প্রভাব দৃষ্টিকটু। একপক্ষ নজরুল কর্নার করেছে, অন্যপক্ষ ক্ষমতায় এসে তা সরিয়ে ফেলবে এমনটা প্রত্যাশিত নয়।’
জানা গেছে, ২০১০ সালের পর এই নজরুল কর্নার সরিয়ে পুরো কক্ষজুড়ে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি যুক্ত করা হয়। বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠলে ২০১৯ সালের দিকে তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কর্নারটি চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।
২০১৪-২০১৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। তিনি যুগান্তরকে জানান, তার সময়ে নজরুল কর্নার তিনি দেখেননি। তবে তিনি রবীন্দ্র, নজরুল, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আল মাহমুদসহ অনেক লেখকদের নিয়ে একটি গ্যালারি করেছিলেন।
জাতীয় কবির নাতনি খিলখিল কাজী ক্ষোভের সঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় জাদুঘরে নজরুল কর্নার অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনেকবার এ নিয়ে কথা বলেছি। কবির অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ওখানে রাখা হয়েছিল। সেগুলো এখন কী অবস্থায় আছে জানা নেই। আমরা চাই জিনিসগুলো অক্ষত অবস্থায় আবার যেন প্রদর্শন করা হয়।’
অক্টোবরের শেষে রেট্রোস্পেক্টিভ প্রদর্শনী
রোববার দুপুরে জাতীয় জাদুঘরের বর্তমান মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব যুগান্তরকে বলেন, ‘চলমান নজরুলবর্ষেই বড় পরিসরে নজরুলকে তুলে ধরতে চলছে নতুন প্রদর্শনীর প্রস্তুতি। অক্টোবরের শেষদিকে নজরুলকে নিয়ে একটি বিশেষ রেট্রোস্পেক্টিভ প্রদর্শনীর (ফিরে দেখা প্রদর্শনী) আয়োজন করা হবে। এর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ পুনরায় স্থাপন করা হবে নজরুল কর্নারে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন জাদুঘরের কিউরেটররা। আয়োজনের বিষয়বস্তু ও প্রদর্শনীর ধরন নির্ধারণে চলছে কিউরেটোরিয়াল ওয়ার্কশপ।’ তিনি জানান, ‘প্রদর্শনীতে থাকবে কবি নজরুলের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্মৃতিবিজড়িত বস্তুসামগ্রী। সংরক্ষণাগারে থাকা নজরুলের খাট, চশমাসহ বিভিন্ন নিদর্শন গ্যালারিতে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।’

