Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

নাগরিক প্ল্যাটফরমের আলোচনা

বাজেটে তথ্যের নৈরাজ্য

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেটে তথ্যের নৈরাজ্য

Advertisement

আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক খাত সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু তেমন কিছু পায়নি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত। সামষ্টিক অর্থনীতি ও বাজেটীয় কাঠামোর দিক থেকে তথ্যের নৈরাজ্যে সৃষ্টি হয়েছে। যে তথ্য-উপাত্ত দেওয়া আছে, সেখানে বড় ধরনের সমস্যা আছে। বিভিন্ন সূচকে সরকারি সংস্থা অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যেও গরমিল। অর্থনীতিতে অর্জন এবং পরিকল্পনার যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেখানে করোনার প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। আইটি খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই তথ্য অর্থমন্ত্রী কোথায় পেলেন, তার উৎস উল্লেখ করেননি। আর ‘বাজেটের গাড়িতে যাত্রী তুলতে ভুলে গেছেন অর্থমন্ত্রী’। এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) সংক্রান্ত নাগরিক প্ল্যাটফরমের আলোচনায় রোববার বক্তারা এসব কথা বলেন। সংগঠনের কোর গ্রুপের সদস্য সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে বাজেট নিয়ে ভার্চুয়ালভাবে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সংগঠনের কোর গ্রুপের সদস্য জনস্বাস্থ্যবিদ মোশতাক রাজা চৌধুরী, ব্যবসায়ী নেতা আসিফ ইব্রাহিম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহিনা আনাম প্রমুখ। বক্তারা বলেন, করোনার কারণে শিক্ষা খাতে বিপর্যয়ের বিষয়টি বাজেটে আনা হয়নি। এছাড়া দারিদ্র্য বিমোচনে তেমন কোনো কর্মসূচি নেই।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এবারের বাজেটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি স্বাধীনতার ৫০ বছর, বঙ্গবন্ধুর জন্মের শতবার্ষিকী, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম এবং করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট। এছাড়া এই বছরেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলসিডি) থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা এসেছে। সে কারণে এবারের বাজেটের আকাঙ্ক্ষা ও তাৎপর্য ভিন্ন। অসুবিধায় থাকা মানুষের জন্য এবার কী থাকছে সেটি অবশ্যই বড় বিষয়। তিনি বলেন, আয়-ব্যয় ও ঘাটতি নিয়ে অনেক আলোচনায় হয়েছে। আমরা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এবং জাতীয় আয়কে (জিএনআই) তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বাজেটে এ সংক্রান্ত যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সরকারি অন্য তিনটি উৎস থেকে পাওয়া তথ্যকে আমরা মিলিয়ে দেখেছি। পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেটি বাজেটের তথ্যের চেয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেশি। আবার অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় যে প্রাক্কলন দেওয়া হয়েছে, সেটি বাজেটে কম।

আর এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল করোনার আগে অর্থাৎ গত বছর। এর মানে হলো, করোনার আগে যে পরিকল্পনা ছিল, তার চেয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেওয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, করোনাকে বিবেচনায় নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট তৈরি করেছে কিনা।

অন্যদিকে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার চেয়ে বাজেটে আড়াই শতাংশ বেশি বলা হয়েছে। তারা এখানে ২ হাজার ৬৪ ডলার বলেছে। আবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে ৪০ ডলার কমিয়ে ২ হাজার ২৪ ডলার বলা হয়েছে। আগামী বছরের জন্য অষ্টম বার্ষিকীতে ছিল ২ হাজার ৩৪৫ ডলার। কিন্তু বাজেটে বলা হয়েছে ২ হাজার ৪৬২ ডলার। অর্থাৎ করোনার আগে যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, করোনার পরে মাথাপিছু আয় আরও বাড়বে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কতটা যৌক্তিক তা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। ফলে এসবের ভিত্তি জানা জরুরি।

অন্যদিকে একটি বিষয়ে সবাই স্বীকার করবেন, অর্থনৈতিক বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছর শক্তিশালী ছিল। করোনার কারণে ইতিহাসের মধ্যে চলতি অর্থবছরের আর্থিক ভিত অনেক দুর্বল। কিন্তু সরকার যে বাজেট দিয়েছে, সেখানে ২০১৯-২০’র চেয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরকে শক্তিশালী দেখানো হয়েছে। গত বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ২, এবার দেখানো হয়েছে ৬ দশমিক ৮। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ২৩ দশমিক ৬ থেকে ২৪ দশমিক ২ এবং সরকারি বিনিয়োগও ৮ দশমিক ১ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ২-এ উন্নীত হয়েছে। আমি এসব তথ্যের ব্যাখ্যা দাবি করছি। তিনি বলেন, জিডিপি ও বিনিয়োগ বাড়লে অন্যান্য সূচকে এর প্রভাব পড়ে। আমরা ওই প্রক্সি সূচকগুলো বিবেচনা করে দেখেছি। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছিল ৭৫ শতাংশ। সেখানে এবার বাস্তবায়ন হয়েছে ৫০ শতাংশের নিচে। আবার বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে এ খাতের ঋণ প্রবাহ ১৪ শতাংশের কথা বলা হলেও ১০ মাসে হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। আবার পুঁজি পণ্য ৩ দশমিক ১ থেকে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমেছে। কাঁচামাল ব্যবহার বাড়েনি। আবার উৎপাদনের ভৌত সূচক বা কোয়ান্টাম ইনডেক্সের সঙ্গে মিলছে না। গত বছর ছিল ১৪ দশমিক ৩। এ বছর সেখানে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ছোট উৎপাদনের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ৮ নেমেছে। ফলে আমি পরিষ্কার করে বলছি, বাজেটে ২০২১-২২ অর্থবছরের যে তথ্য-উপাত্ত দেওয়া আছে, সেখানে বড় ধরনের সমস্যা আছে। এখানে করোনার প্রভাব বিবেচনার মধ্যে নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে পুঁজির উৎপাদনশীলতা সূচকে দেখানো হয়েছে, এ বছর ৬ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ কম পুঁজি ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন করা যায়। কিন্তু সক্ষমতার ব্যবহার না বাড়লে এটি কীভাবে বাড়ল তা বুঝে আসছে না। করোনাকালে আমাদের দরিদ্রতা, বেকারত্ব এবং বৈষম্য বেড়েছে। কিন্তু বাজেটে বলা হয়েছে, দরিদ্রতা ১৭ শতাংশ থেকে কমে ১২ শতাংশ হবে। আবার ’২৪ সালের জন্য ৮ শতাংশ থেকে কমে সাড়ে ৪ শতাংশে আসবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ করোনার আগে যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, এবার তার চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ করোনার কারণে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে বিবেচনায়ই নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সিপিডিসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দারিদ্র্য পরিস্থিতি করোনার কারণে ১০ থেকে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু নতুন দরিদ্রকে সরকারি বিবেচনায় অনুধাবন, স্বীকৃতি বা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সঠিক তথ্য পেলেই দেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ত।

সিপিডির এই বিশেষ ফেলো আরও বলেন, গত কয়েক বছরে বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে রাস্তা বড় হয়েছে। কিন্তু সেই রাস্তার গাড়িতে পিছিয়ে পড়া মানুষকে যাত্রী হিসেবে তুলতে পারেননি অর্থমন্ত্রী। বাজেটের গাড়িতে যাত্রী তুলতে ভুলে গেছেন অর্থমন্ত্রী। একটি ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণভাবে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। বাজেট থেকে প্রাতিষ্ঠানিক খাত বেশি সুবিধা পেয়েছে। অনানুষ্ঠানিক তেমন কিছু পায়নি। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা বাজেট প্রণয়নে আমলে আনা হয়নি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, করোনার কারণে শিক্ষা খাত বিপর্যয়ের বিষয়টি বাজেটে আনা হয়নি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, পিছিয়ে পড়া মানুষ কত আছে, তা নিয়ে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি আছে। তাই সঠিক নীতি নেওয়া যাচ্ছে না। জনস্বাস্থ্যবিদ মোশতাক রাজা চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক সমস্যা সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই। সংস্কারের উদ্যোগ নেই। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, করপোরেট কর কমানো হলেও করোনাকালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য তেমন উদ্যোগ নেই। এছাড়া সরকারি কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ব্যাপারে কোনো ঘোষণা নেই। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তথ্য না থাকায় পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বিদেশি ঋণ শোধে চাপ বাড়ছেই

বিদেশি ঋণ শোধে চাপ বাড়ছেই

নবজাগরণের অগ্রদূত মুন্শী মেহেরুল্লাহ দুই দশক বন্ধ রেলস্টেশন

দুই দশক বন্ধ রেলস্টেশন

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বিটিটিসি’র প্রতিবেদন রমজানের আগে বাড়ছে নিত্যপণ্যের আমদানি

রমজানের আগে বাড়ছে নিত্যপণ্যের আমদানি

কক্সবাজারে উচ্ছেদ শুরু গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো চারতলা রিসোর্ট

গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো চারতলা রিসোর্ট

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম