নবজাগরণের অগ্রদূত মুনশী মেহেরুল্লাহ
Advertisement
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর নামে করা যশোর সদরের চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের রেলস্টেশনটি দুই দশক ধরে বন্ধ। সোমবার তোলা যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় ধর্মীয় সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও সামাজিক বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে যুক্তি ও লেখনী দিয়ে লড়াই করেছিলেন মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ। ধর্মচিন্তক, সমাজসংস্কারক, যুক্তিবাদী বক্তা ও লেখক হিসাবে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন নবজাগরণের অগ্রদূত হিসাবে। অথচ যশোরে তার নামে প্রতিষ্ঠিত মেহেরুল্লাহ নগর রেলস্টেশনটি দীর্ঘদিন বন্ধ। নষ্ট হচ্ছে অবকাঠামো, দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা। স্টেশনটি চালুর দাবিতে আন্দোলনও করেছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকে এই মনীষীর জীবন ও কর্ম অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
যুক্তি ও লেখনীতে পরিচিতি : মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ১৮৬১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন যশোর জেলার কালীগঞ্জ থানার ঘোপ গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। এলাকাটি বর্তমানে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। তার পৈতৃক বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে। পাঁচ বছর বয়সে বাবা মুন্সী মুহাম্মদ ওয়ারেছ উদ্দীনকে হারান তিনি। যশোরের মৌলভি মোসহারউদ্দীনের কাছে ধর্মশিক্ষা এবং মৌলভি মুহাম্মদ ইসমাইলের কাছে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষা-সাহিত্য শেখেন। কুরআন-হাদিস ও ফারসি সাহিত্যেও জ্ঞান অর্জন করেন। দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করা সম্ভব হয়নি। কিছুদিন সরকারি চাকরি করার পর দরজিবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিয়ে যশোরে দোকান খোলেন।
সেসময় খ্রিষ্টান পাদরিদের ইসলাম ও মহানবী মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অপপ্রচারণার প্রতিবাদে বক্তৃতা ও লেখালেখি শুরু করেন তিনি। ধর্মীয় বিষয়ে পাদরিদের সঙ্গে একাধিকবার প্রকাশ্য বিতর্কে অংশ নেন। তার যুক্তিনির্ভর বক্তব্য ও লেখনীর কারণে পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘খৃষ্টীয় ধর্মের অসারতা’, ‘মেহেরুল ইসলাম’, ‘খৃষ্টান মুসলমান তর্ক-যুদ্ধ’, ‘বিধবা গঞ্জনা’, ‘হিন্দুধর্ম রহস্য’, ‘রদ্দে খ্রিষ্টান ও দলিলোল ইসলাম’, ‘ইসলামী বক্তৃতামালা’ এবং ‘নবরত্নমালা বা বাংলা গজল’। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯০৭ সালের ৮ জুন ৪৬ বছর বয়সে মারা যান তিনি। ছাতিয়ানতলা গ্রামে তাকে সমাহিত করা হয়।
তালাবদ্ধ স্টেশন, ভাঙছে অবকাঠামো : মেহেরুল্লাহ নগর রেলস্টেশনে সরেজমিন দেখা যায়, স্টেশনমাস্টারের কক্ষ ও টিকিট কাউন্টার তালাবদ্ধ। টিনের ছাউনির বেশির ভাগই ভেঙে পড়েছে। জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে সিগন্যাল টাওয়ারের দোতলা ভবন। পাশাপাশি দুটি রেললাইন থাকলেও একটি সচল। ওই লাইন দিয়ে খুলনা-রাজশাহী, ঈশ্বরদী ও ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল করে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল খায়ের (৯৫) বলেন, চাকরির কারণে ১৯৬০ সাল থেকে খুলনা-যশোর রুটে যাতায়াত করেছি। এ স্টেশন থেকেই ট্রেনে উঠেছি, আবার নেমেছিও।
স্থানীয় কৃষক মতিয়ার রহমান বলেন, ২০০০ সালের আগে স্টেশনটিতে সব ধরনের ট্রেন থামত। তখন বেশ জমজমাট ছিল। অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছিল। কিন্তু কেন স্টেশনটি বন্ধ হলো, তা তিনি জানেন না।
যশোর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মো. সাইফুজ্জামান বলেন, মেহেরুল্লাহ নগর রেলস্টেশনটি ২০০৬ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে।
ভোগান্তিতে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা : খুলনার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী প্রাপ্তি খাতুন বলেন, বাড়ি থেকে বাসে খুলনায় যাতায়াত করতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। ভাঙা সড়কে যানজট, দীর্ঘ অপেক্ষা ও বাড়তি খরচের কারণে দুর্ভোগ বাড়ে। স্টেশনটি চালু হলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হতো।
সবজি উৎপাদক ও ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি ও আরও ১০-১২ জন প্রায় প্রতিদিন মিনি ট্রাকে করে খুলনায় সবজি পাঠাই। সড়কপথে খরচ বেশি, নানা ঝামেলাও রয়েছে। সময়মতো গন্তব্যে সবজি পৌঁছানো যায় না। স্টেশনটি চালু থাকলে কম খরচে দ্রুত সবজি পরিবহণ করা সম্ভব হতো।
চূড়ামনকাটি বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, বাজারে প্রায় ২০০ কাপড় ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারা নিয়মিত কুষ্টিয়ার পোড়াদহ থেকে কাপড় আনেন। ট্রাকে মালামাল পরিবহণে খরচ বেশি হয়। ট্রেন চালু থাকলে একই দিনে পোড়াদহ থেকে মালামাল আনা সম্ভব হতো।
স্টেশন চালুর দাবি : স্টেশনটি চালুর দাবিতে চলতি বছরের আগস্টে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক এবং ছাতিয়ানতলা-চূড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. শিমুল হোসেন বলেন, যশোর সদর ও চৌগাছা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের প্রায় চার লাখ মানুষ এ স্টেশনের সুবিধা পেতে পারেন। এলাকাটির মধ্যবর্তী স্থানে স্টেশনটির অবস্থান। কাছেই যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। এ অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী রাজশাহী ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এখানকার উৎপাদিত সবজিও দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। এসব কারণে স্টেশনটি চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে এটি এই অঞ্চলের মনীষী মুনশী মেহেরুল্লাহর নামে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেও এর কার্যক্রম চালু রাখা উচিত।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই মুন্শী মেহেরুল্লাহর অবদান সম্পর্কে জানে না। তাই পাঠ্যক্রমে তার জীবন ও কর্ম অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
মুনশী মেহেরুল্লাহর চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য কর্নেল (অব.) মেহের মহব্বত হোসেন বলেন, স্টেশনটি চালু করা এখন সময়ের দাবি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীরা আসা-যাওয়া করেন। যশোর স্টেশন থেকে ক্যাম্পাসে যেতে তাদের ভোগান্তি হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তার জানা মতে, স্টেশনটি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী (পাকশী) গৌতম বিশ্বাস বলেন, শুধু মেহেরুল্লাহ নগর নয়, বন্ধ থাকা অন্যান্য স্টেশনও চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মেহেরুল্লাহ নগর স্টেশনে লেভেল ক্রসিংয়ের জন্য কিছু স্লিপার ফেলা হয়েছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
