বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত
গণতন্ত্র না একনায়কতন্ত্র সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের সব জায়গায়ই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র। এটা আধিপত্য বিস্তার নয়, স্বাভাবিক পররাষ্ট্রনীতি। এর বিপরীত হলো একনায়কতন্ত্র। বাংলাদেশ কোন পক্ষে থাকবে, এ সিদ্ধান্ত তাদের।
সোমবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘বে অব বেঙ্গল কনফারেন্স’-এ ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস এসব কথা বলেন। তার মতে, ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার বর্বর হামলা বিশ্ববাসীর জন্য ওয়েক আপ কল (সতর্কসংকেত)। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনের শেষ দিন ছিল সোমবার। অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, কানাডার হাইকমিশনার লিলি নিকোলস, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার জেরমি ব্রুয়ার। অধিবেশন পরিচালনা করেন সিজিএস-এর নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।
পিটার হাস বলেন, বিশ্বের যে কোনো দেশে গণতন্ত্র, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে কথা বলা আধিপত্য বিস্তার নয়, এটা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক পররাষ্ট্রনীতি। কারণ, মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য এ বিষয়ে সবার অঙ্গীকার রয়েছে। অনেকে ভাবেন যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আধিপত্য বিস্তার করে। মূলত এটা সারা বিশ্বের মানবাধিকারের জন্য একটা সাধারণ অধিকার। এ বিষয়ে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রই সম্মত হয়েছে। এটা কখনো আধিপত্য নয়। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্বাধীনতা ও উন্মুক্ততার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি হলো-এই অঞ্চলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সমৃদ্ধির প্রচারেও বিশ্বাস করে। রাষ্ট্রদূতের কাছে প্রশ্ন ছিল-বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা শব্দটা মূলত চীনের বিরুদ্ধে যায়। আমাদের প্রতিযোগিতা আইডিয়া (ধারণা) কেন্দ্রিক। এটা জোরের কোনো বিষয় নয়। যে জায়গায় একনায়কতন্ত্র চলে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ওইসব ধারণার জায়গায় প্রতিযোগিতা করে। তিনি বলেন, যেখানে প্রতিটি দেশ স্বচ্ছতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলে, সেখানে প্রতিযোগিতা নেই। এখন বাংলাদেশের কথা বললে, তাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা পূর্ব বা পশ্চিম কাকে অনুসরণ করবে। তারা আমাদের ধারণায়, না একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাস করে-এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের।
পিটার হাস বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মূল কথা হলো-প্রতিটি দেশই যাতে চাপমুক্ত থেকে নিজস্ব পথ বেছে নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল হলো-এই অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা। অবাধ ও উন্মুক্ত, সমৃদ্ধিশালী এবং নিরাপদ অঞ্চল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ঠিক করেন, তখন এ কথাই বলেছিলেন। পিটার হাস বলেন, আমি এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি কথা কোট করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক এরিয়া হবে অবশ্যই শান্তি ও সম্ভাবনার। তার কথায় যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ একমত। মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আমরা এই অঞ্চলকে গুরুত্ব দিচ্ছি। এখানে ৯শ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অঞ্চলের সহায়তায় ৩০ লাখের মতো আমেরিকান নাগরিক কাজ করে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এ সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন পিটার হাস। তিনি বলেন, বিশ্ববাসী শান্তি ও সম্ভাবনার পক্ষে। কিন্তু রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর বর্বর আক্রমণ করছে। এটা পুরো বিশ্ববাসীর জন্য সতর্কসংকেত (ওয়েক আপ কল)।
ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, যুক্তরাজ্য ইন্দো-প্যাসিফিকে মূল্যবোধকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় গুরুত্ব দেয়। অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক নিশ্চিতে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশসহ অন্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে চায়। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের আবারও প্রশংসা করেন তিনি। কানাডার হাইকমিশনার লিলি নিকোলস বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশনে মৌলিক বিষয় রয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষা অন্যতম। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহীদের স্কলারশিপ দেয় তার দেশ। তিনি বলেন, কানাডা পৃথিবীতে সুপার পাওয়ার নয়। এরপর আমাদের সমর্থ অনুসারে বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে কাজ করছি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জেরেমি ব্রুম বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতার জন্যই ইন্দো-প্যাসিফিক। বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি এগিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা। এর চূড়ান্ত সমাধান হলো নিজ দেশে প্রত্যাবাসন।
প্রসঙ্গত, এই অঞ্চলের শান্তি স্থিতিশীলতা দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ৫০টি অধিবেশনে ৭৫টি দেশের ২ শতাধিক আলোচক ছিলেন। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের গবেষক, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক ছিলেন। সমাপনী দিনেও বিভিন্ন সেশনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, সাবেক কূটনীতিক, খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
