চসিক নগরভবনে পুলিশের অভিযান
আবারও আলোচনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী বগা
অভিযোগের পরই খুলশী থানার ওসি বদলি * বগা জুলাই-আগস্টের যোদ্ধা : মেয়র শাহাদাত
Advertisement
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং লিডার ও নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন বগাকে ঘিরে আবারও নগরে চলছে আলোচনা। তার বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। সম্প্রতি একটি হত্যাকাণ্ডেও তার নাম এসেছে। তাকে গ্রেফতার করতে মঙ্গলবার রাতে টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নগরভবনে পুলিশ অভিযান চালায়। তবে বগাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের সময় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপ করেন। তবে মেয়র এ অভিযোগ অস্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, ওই রাতে বগা নগরভবনে যাননি। তার দুই ভাই খুলশী থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশের অভিযানকে ‘ষড়যন্ত্র’ উল্লেখ করে তিনি সিসিটিভি ফুটেজে বগার উপস্থিতি দেখানোর চ্যালেঞ্জ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বগা নগরভবনে অবস্থান করছেন-এমন তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে খুলশী থানা পুলিশের একাধিক টিম সেখানে যায়। অভিযানে সিএমপির উপকমিশনার (উত্তর) মো. হাসান মোস্তফা স্বপনও ছিলেন। তিনি নগরভবনে প্রবেশ করলে মেয়র পুলিশ সদস্যদের নিয়ে চলে যেতে বলেন। প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থানের পর রাত ৯টার দিকে বগাকে গ্রেফতার না করেই পুলিশ নগরভবন ত্যাগ করে। এরপর মেয়রও কার্যালয় থেকে বের হন। সাংবাদিকরা এ সময় ভিডিও ধারণ করলে মেয়রের অনুসারীরা কয়েকজন সাংবাদিককে ধাক্কা দেন এবং কয়েকজনের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন।
বুধবার নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে মেয়র বলেন, ‘চসিক কার্যালয়ে যে কেউ কমপ্লেইন নিয়ে আসতে পারে। আর সে যদি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হয়, তাকে গ্রেফতার করা পুলিশের দায়িত্ব।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াকিল কোনো আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী নয়। সে ১৭-১৮ বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল। জুলাই-আগস্টের যোদ্ধাও সে। তার বিরুদ্ধে তখনই ৬০-৭০টি মামলা দেওয়া হয়েছিল।’
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুর রহিমের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন মেয়র। তার দাবি, আবদুর রহিম আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাকলিয়া থানার ওসি ছিলেন এবং খুলশীতে যোগ দেওয়ার পর কোনো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী বা সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেননি। তবে মঙ্গলবার রাতে অভিযানের সময় ওসি আবদুর রহিম সেখানে ছিলেন না। তিনি দুই দিনের ছুটিতে ছিলেন।
বগার বিরুদ্ধে ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মিজানুর রহমান চৌধুরীকে তুলে নিয়ে মারধরের ঘটনায় মামলা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর খুলশী থানায় করা ওই মামলায় বগাকে এজাহারনামীয় ২ নম্বর আসামি করা হয়। এর পরদিন তাকে গ্রেফতার করতে ওয়্যারলেস এলাকায় অভিযান চালালে তার অনুসারীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে ওসিসহ আট পুলিশ সদস্য আহত হন এবং ওসির সরকারি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় বগা ও তার ভাই রকি হোসেন ওরফে পিচ্চিসহ ২৭১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ।
২৭ সেপ্টেম্বর ওয়্যারলেস তালতলা এলাকায় হৃদয় নামে এক কিশোর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। পরে পুলিশ আট কিশোরকে গ্রেফতার করে। পুলিশ জানায়, দুই কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। ৫-জি ও ৭-জি নামের ওই দুই গ্রুপের একটির নেতৃত্বে বিজয়, কামরান ও শান্ত এবং অন্যটির নেতৃত্বে বগা ও তার ভাই রকি হোসেন পিচ্চি রয়েছেন বলে পুলিশ জানতে পারে। এ ঘটনায় গ্রেফতার তিন কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
সর্বশেষ সোমবার রাতে বগাকে প্রধান আসামি করে খুলশী থানায় আরও একটি মামলা হয়েছে। জালালাবাদ এলাকায় শেখ মুহাম্মদ আরিফের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলাটি করা হয়। পরে বগার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সব মিলিয়ে হত্যা, চাঁদাবাজি, পাহাড় কাটা, জমি দখল-পালটা দখলসহ নানা অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে।
তবে সিএমপির সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, মঙ্গলবার রাতে টাইগারপাস এলাকায় বগার ঘোরাফেরার তথ্য পেয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল। তাকে না পেয়ে পুলিশ ফিরে আসে। নগরভবনে পুলিশ গিয়ে হট্টগোল করেছে-এমন কোনো তথ্য তার কাছে নেই।
সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ ও উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. হাসান মোস্তফা স্বপনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের সরকারি নম্বরে কল ও এসএমএস পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি।
ওসি বদলি : নগরভবনে অভিযানের পর বুধবার খুলশী থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুর রহিমকে সিটি এসবির পরিদর্শক হিসাবে বদলি করা হয়েছে। সূত্রের দাবি, মেয়র তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ‘পারপাস সার্ভ’ করার অভিযোগ তোলার পরই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে আবদুর রহিম বলেন, নগরভবনে অভিযানের বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না। স্ট্রোক করে গুরুতর অসুস্থ মামাকে দেখতে যাওয়ায় তিনি ছুটিতে ছিলেন।
