দুদকের অভিযান
৩০ লাখ টাকা ঘুষ নিতে পারল না প্রতারক চক্র
৩ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ পরিশোধ * তেজগাঁওয়ে দুই দালাল গ্রেফতার
যুগান্তর রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০১৮, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্ষতিগ্রস্ত দু’জন ব্যক্তির কাছে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের ৩ কোটি টাকা পেতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছিল ঢাকা জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের একটি চক্র। ঘুষের টাকা না দেয়ায় চক্রটি মাসের পর মাস ধরে চেক হস্তান্তরে ঘোরাতে থাকে তাদের। ক্ষতিগ্রস্ত ওই দুই ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযোগ কেন্দ্র ১০৬-এ ঘটনাটি জানায়।
দুদকের অভিযোগ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা ঘটনাটি রেকর্ড করেন। এতে তারা দেখেন, রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজের জন্য তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় ভূমি অধিগ্রহণের সরকারি ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তিতে ঘুষ না দেয়ায় দুজন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এ অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। এতে দেখা যায়, এ ক্ষতিপূরণের চেকের ওপর শক্তিশালী দালালচক্র গড়ে উঠেছে, যারা ক্ষতিপূরণের দাবির ওপর ১০ পার্সেন্ট হারে ঘুষ আদায় করছে। দুদক জানতে পারে, জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের একটি চক্রের মাধ্যমে দালালরা প্রথমে ভূমি মালিকদের কাছ থেকে ঘুষের অঙ্ক বাবদ একটি অ্যাকাউন্ট পে চেক হাতিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে নগদ ঘুষ দালালদের কাছে হস্তান্তর করার পর অধিগ্রহণের মূল পাওনা বাবদ চেক ভূমি মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এই অভিযোগের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে দুদক মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরীর নির্দেশে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম গঠন করা হয়। ওই টিম প্রথমে ১১ অক্টোবর পুরনো ঢাকার ইসলামপুরের যমুনা ব্যাংকে অবস্থান নেয়। কিন্তু দালালচক্র টের পেয়ে কৌশলে পালিয়ে যায়। তবে ওইদিন চক্রটির ১৭ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। দুদকের হস্তক্ষেপে ওইদিন ভূমি মালিক নূরে আলম ঘুষ ছাড়াই ক্ষতিপূরণের এক কোটি ৭০ লাখ টাকা উত্তোলন করতে সক্ষম হন। অপরদিকে একই চক্র আরেক ভূমি মালিক আলমগীরের কাছে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ওপর ১০ পার্সেন্ট হারে ১৩ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে।
তিনি তাদের চাহিদামাফিক ১৩ লাখ টাকার অ্যাকাউন্ট পে চেক প্রস্তুত করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে চক্রটি দুদকের তৎপরতা টের পেয়ে তাদের অবস্থান থেকে সরে যায়। এ অবস্থায় দুদক মহাপরিচালক মুনীর চৌধুরীর নির্দেশে দুদকের অপর একটি এনফোর্সমেন্ট টিম সহকারী পরিচালক খায়রুল হকের নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার ভূমি মালিক মো. আলমগীরকে নিয়ে ঢাকার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চেক পরিশোধ এবং চক্রটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। পরে ভূমি মালিক আলমগীর ১৩ লাখ টাকা ঘুষ ছাড়াই ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বৃহস্পতিবারই হাতে পান। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমকে ঘিরে দুর্নীতিমুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে দুদক টিম।
এ প্রসঙ্গে দুদক মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী জানান, সরকারি অফিসে সুশাসন নিশ্চিত এবং দুর্নীতি বন্ধ করার পূর্বশর্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘন ঘন পরিদর্শন এবং সার্ভেইলেন্স নিশ্চিত করা। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন আনতে হলে প্রতিটি অফিস প্রধানকে তার অফিসের প্রতিটি কার্যক্রম কঠোর মনিটরিং, বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং সিসিটিভি’র ব্যবহার চালু করা উচিত। দুদক সব পাবলিক অফিসে কঠোর অনুশাসন নিশ্চিত করতে চায়। এ লক্ষ্যে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুই দালাল গ্রেফতার : দুদক অভিযোগ কেন্দ্রে আসা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়েছে দুদক। সহকারী পরিচালক সুমিত্রা সেন ও উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ শিহাব সালামের নেতৃত্বে একটি টিম অভিযানে অংশ নেয়। অভিযানকালে দেখা যায়, দালালরা সাবরেজিস্ট্রি অফিস নিয়ন্ত্রণ করছে।
টিমের উপস্থিতি টের পেয়ে দালালরা পালানোর সময় দুজনকে হাতেনাতে ধরে দুদক টিম। এরপরই ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাদের হস্তাস্তর করা হয়। দুজনকেই এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ অভিযান পরিচালনা প্রসঙ্গে এনফোর্সমেন্ট অভিযানের প্রধান সমন্বয়ক দুদক মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মাদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, রেজিস্ট্রেশনকে ঘিরে দুর্নীতি চক্রের বলয় ভেঙে দিতে দুদক নিয়মিত অভিযান চালাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও সচেতন হতে হবে।
