Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কিছুমিছু

আমিও ‘কেচিনুরের’ ব্যবসা করবাম

Advertisement

Icon

মোকাম্মেল হোসেন

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আমিও ‘কেচিনুরের’ ব্যবসা করবাম

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক। তবে এর হর্ন বিপজ্জনক। ময়মনসিংহ শহরে গমনাগমনকালে সুযোগ পেলেই অটোরিকশার চালকের পাশে বসি; হর্নের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে তাকে সচেতন করার প্রয়াস চালাই এভাবে- ভাই রে!

এই যে মনের আনন্দে একটু পরে পরে হর্ন বাজাইতেছেন; এর পরিণতি কী জানেন? মানুষের কানের পর্দা অতি সূক্ষ্ম। কটকইট্যা হর্নের শব্দ বারবার কানের সূক্ষ্ম পর্দায় আঘাত করার ফলে সেখানে চিড় ধরে।

পরে এই ফাটল আস্তে আস্তে বড় হইলে মানুষ আর কোনোকিছু শুনতে পায় না; বধির হইয়া যায়। আপনে যে তালে হর্ন বাজাইতে বাজাইতে ড্রাইভারি করতেছেন, তিন-চাইর বছর বাদে আপনের বৌ যখন বলবে-

: সুমনের বাপ, ঘরে চাউল নাই।

আপনে চেইত্যা উইঠা তখন তারে বলবেন-

: আজাইরা আলাপ কম করবা; তুমি আমার কাছে কিসের টাকা পাও?

দেখেন, কোন লাইনের গাড়ি কোন লাইনে উঠতেছে! বাস্তব কন্ডিশন কিন্তু ঠিক এইরকম হবে। কথা শুনে কেউ হাসে, কেউ সংযত হয়; আবার কেউ আরও ঘনঘন হর্ন বাজায়।

তা বাজাক- আমার মূল্যায়নটা হল, এর ফলে মাসে অন্তত একজন চালকও যদি হর্নের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন হয়; তাহলে বছরে ১২ জন। কম কী?

সারা দেশের সড়ক-মহাসড়ক ও রাস্তাঘাটে ঘটে চলা এই ভেঁপু সন্ত্রাস যাদের রোধ করার কথা, তারা এবং তাদের পরিবার-পরিজনরা এসি গাড়িতে দরজা-জানালা বন্ধ করে রাস্তায় চলাচল করেন; ফলে শব্দ-যন্ত্রণার ভয়াবহতা তারা বুঝতে পারেন না।

এটা বুঝতে পারে ফুটপাত ও উন্মুক্ত যানবাহনে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ। শিশু-কিশোরসহ লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও অন্য পেশার সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সড়কে আহত ও মৃত্যুবরণের পাশাপাশি শব্দ-বিভীষিকার মুখোমুখি হয়ে মারাত্মক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; অথচ কী দুর্ভাগ্য আমাদের- রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা এটাকে কোনো সমস্যাই মনে করছেন না!

‘ডেঙ্গু মওসুমের’ শুরুতে কী ধুন্ধুমার কাণ্ড! এডিস মশার উড়াউড়ি বন্ধ করতে কেউ বিদেশ ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে বগলের ঘাম মুছতে মুছতে দেশে ফেরত এসেছেন, কেউ এডিস গোষ্ঠীর পুরুষত্ব হরণকল্পে গবেষণার পাশাপাশি তাদের নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন।

আবার দৌড়ঝাঁপ করতে করতে কারও কাছার কাপড় খুলে মাটিতে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। মোট কথা, ডেঙ্গু আতঙ্কে সরকারের বিভিন্ন স্থানীয় বিভাগসহ দফতর, অধিদফতর, মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। আর ভেঁপু সন্ত্রাসীরা পুরো জাতিকে প্রতিবন্ধী বানানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেও কর্তৃপক্ষ নির্লিপ্ততার সরোবরে সাঁতার কাটছেন- কী আচানক কারবার!

ময়মনসিংহ শহর কর্তৃপক্ষের একটি পদক্ষেপ খুবই প্রশংসনীয়। সুযোগ পেলেই আমি অন্যের কাছে এটাকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকি। শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চাপ বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ এগুলোর লাইসেন্স প্রদান সাপেক্ষে লাল ও সবুজ এই দুই রঙে চিহ্নিত করে দিয়েছে এবং বলেছে- শহরে পালাক্রমে একদিন ‘লাল’ চলবে, একদিন চলবে ‘সবুজ’।

পদক্ষেপটি ছোট্ট; কিন্তু এর ফলে এ শহরে মানুষের নিত্যচলাচল অনেকটাই নির্বিঘ্ন হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এই শহরে ভেঁপু সন্ত্রাস রোধেও একটি উদ্যোগ নিতে পারে আর তা হল- ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রিকশাসহ পাবলিক যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্নসহ প্রচলিত সব ধরনের হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করে সবাইকে রাবারের তৈরি বিশেষ ধরনের ভেঁপু ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া।

হাত উঠিয়ে ইশারা করার পর সবুজ রঙের অটোরিকশা পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। তার মানে ময়মনসিংহ শহরে আজ সবুজের ‘রাজত্ব’ চলছে। চালকের পাশের আসন আগেই দখল হয়ে গেছে। কাজেই ওখানে বসা যাচ্ছে না।

পেছনের সিট থেকে এক যাত্রী নেমে যাওয়ার পর সেখানে বসতে যাব- এক যুবক জায়গা বদলিয়ে টুপ করে সেখানে বসে পড়ল। নিয়ম অনুায়ী খালি হওয়া এ আসন আমার প্রাপ্য; যুবক সেটা আমলেই নিল না। বসার পর যুবকের উদ্দেশে বললাম-

: ভাই কি লজ্জিত হইছেন?

প্রশ্ন শুনে যুবক আকাশ থেকে পড়ল। বলল-

: লজ্জা পাইতাম কেরে!

যাত্রীরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। জোরে দম নিয়ে বললাম-

: আগে সামান্য কোনো অন্যায়- এই যেমন ধরেন, কারও গাছের একটা ডাল কাটার পরও মানুষ লজ্জা পাইত; অনুশোচনায় ভুগত। বর্তমানে এই রকম খুব একটা ঘটে না। ছোট-বড় কোনো অন্যায় কাজেই বাঙালি এখন আর লজ্জা পায় না; বরং নানাভাবে নিজের বাহাদুরি জাহির করে। খুব বড় ধরনের অন্যায় না করলেও আপনে আমার প্রাপ্য আসন দখল কইরা ছোটখাটো একটা অন্যায় কিন্তু ঠিকই করছুইন।

এই জন্য আপনে যদি তিল পরিমাণ লজ্জাও পাইতেন; মনে ভরসা পাইতাম এই ভাইবা যে এখনও আশা আছে। কিন্তু আপনে তো লজ্জা পাইলেন না! তার মানে বাঙালি জাতির ক্রান্তিকাল চলতেছে- এইটা পরিষ্কার।

লেকচার শুনে যুবকের চোয়াল ঝুলে পড়েছে দেখে পুনরায় বললাম-

: ভাই! মনে কষ্ট নিবেন না। এই ঘটনা শুধু আপনের-আমার বেলায় ঘটতেছে না; প্রায় সবার ক্ষেত্রেই ঘটতেছে। বর্তমানে দেশের মানুষ কেউই তার বর্তমান অবস্থা লইয়া সুখী নয়। তাই সুযোগ পাইলেই তারা ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না কইরা বাউলি মারে।

স্টেশনে পৌঁছে দেখি, টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন। লাইনে দাঁড়ানোর পর অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়েছে; ভ্যাপসা গরমে সিদ্ধ হওয়ার জোগাড়। কুলাতে না পেরে কাউন্টারের ওপাশে বসা বুকিং ক্লার্কের উদ্দেশে বললাম-

: ভাইসাহেব! জানি, ট্রেন আসার আগমুহূর্তে জনস্বার্থে আপনে অতিশয় ব্যস্ত। যে টাইম লইয়া একজনরে টিকিট দিতেছেন; ওই টাইমে অন্তত পাঁচজনরে টিকিট দেয়া সম্ভব। তারপরও আমরা ভুলেও মনের মধ্যে এই কু-ভাবনা ঠাঁই দিব না- আপনে ব্যস্ত নন। আপনের এই কঠিন ব্যস্ততার মধ্যেও আমার একটা সবিনয় জিজ্ঞাসা আছে।

দূর থেকে তেরছা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বুকিং ক্লার্ক বললেন-

: বলেন।

: আমরা এইখানে বিভিন্ন গন্তব্যের টিকিট প্রত্যাশী কয়েকশ’ যাত্রী। সবার মাথার ওপরে একটা মাত্র ফ্যান। জনাব, ফ্যানটা ঘুরতেছে না কী জন্য?

: অইটা নষ্ট।

: আপনের মাথার ওপরের ফ্যানটা তো নষ্ট না; অইটা দেখি ঠিকই ঘুরতেছে।

বুকিং ক্লার্ক কটমট দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তার দৃষ্টি-আগুনে পুড়তে পুড়তে বললাম-

: ভাই! গোসা হবেন না। কয়েকটা ন্যায্য কথা বলতেছি; মন দিয়া শুনেন। এইখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়াইয়া, গরমে-ঘামে সিদ্ধ হইয়া পাবলিক যে টাকা-পয়সা আপনের হাতে তুইলা দিতেছে- ওইটা দিয়াই কিন্তু আপনের বেতন হয়।

পাবলিকের দেয়া বেতন খাবেন, পাবলিকের টাকায় কেনা ফ্যানের বাতাস খাবেন; অথচ আমরা জনসাধারণ আপনের সামনে দাঁড়াইয়া শরীরের ঘামাচি গলাইবাম- এইটা কি যুক্তিসঙ্গত কারবার হইল?

লাইনে আমার সামনে যে ছেলেটি দাঁড়ানো, তার নাম হেলাল। বাড়ি জামালপুর। হেলাল আকতার ফার্নিশার্সে চাকরি করে। আগে ঢাকায় পোস্টিং ছিল। সম্প্রতি ময়মনসিংহে বদলি হয়েছে। তবে তার ফ্যামিলি ঢাকায় রয়ে গেছে আর তাই বৃহস্পতিবারের এই বিকেলে সে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশে স্টেশনে এসেছে। হেলালকে বললাম-

: এই গরমে এক লগে দুইজনের কষ্ট করার কোনো মানে হয় না। আমি লাইনে দাঁড়াই, আপনে বাইরে থেইকা একটু আলো-বাতাস খাইয়া আসেন; আর সেই সঙ্গে একটা বিষয় সম্পর্কেও জাইনা আসেন।

: কী বিষয়?

রেলস্টেশনের পাশেই কৃষ্ণচূড়া চত্বর। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বিভাগীয় সম্মেলন উপলক্ষে চত্বরে নির্মিত মঞ্চে বসে আছেন। হেলালকে বললাম-

: পাশেই বিনএনপির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হইতেছে। মঞ্চে বড় বড় নেতারা বইসা রইছেন। তাদের সাক্ষী মাইন্যা স্থানীয় বক্তারা আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি-অপকর্মের ফিরিস্তি দিতেছে। আপনে ওইখানে যাইয়া মহাসচিবের কানে কানে বলবেন, স্যার! এই স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনের একমাত্র বৈদ্যুতিক পাখাটা ঘুরতেছে না। আপনের দল ক্ষমতায় গেলে এইটা ঠিকমতো ঘুরবে তো! কী, বলতে পারবেন না?

হেলাল রাজি হল না। প্রবলবেগে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল-

: আমি এই কাজ করতে পারব না। আপনে যান, আমি লাইনে দাঁড়াই।

লাইন ছেড়ে বাইরে চলে এলাম। কারে কী জিজ্ঞেস করব? সব তরমুজের বিচিই কালো। চোখের সামনে বিমানবন্দর রেলস্টেশনের চিত্র ভেসে উঠল। ওই স্টেশনে অগ্রিম টিকিট কাউন্টার নির্মাণের সময় লোকসমাগমের কথা ভেবে ফ্যানের পাশাপাশি এসি ফিট করা হয়েছিল। সেগুলো একদিনও চলেনি। কিছুদিন পরে দেখি, এসির বাইরের খোলটা কেবল পড়ে আছে; ভেতরের জিনিসপত্র সব উধাও।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এসির পাশাপাশি যাত্রীদের বসার জন্য সুন্দর ডিজাইনের চেয়ারও সরবরাহ করা হয়েছিল সেখানে। সেগুলোর পরিণতিও একইরকম হয়েছিল। একদিন দেখলাম, স্টিলের চেয়ারগুলো কোনোটা তিন ঠ্যাইঙ্গা, আবার কোনোটা দুই ঠ্যাইঙ্গা হয়ে এক কোণায় পড়ে আছে।

জনগণের কষ্টার্জিত টাকা সরকার প্রকল্পে ঢেলেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে; পরে ফল কী হল- সে ব্যাপারে কারও কোনো নজরদারি বা দায়দায়িত্ব নেই। আর এভাবেই দেশে হাজার হাজার জি কে শামীমের জন্ম হয়েছে। এখন তাদের দুই-চারজনকে নিয়ে খুব মাতামাতি হচ্ছে। এতে কতটা সুফল মিলবে কে জানে!

প্রত্যাবর্তনের পর দেখলাম, টিকিট কাটা হয়ে গেছে। হেলাল বলল-

: চলেন, প্লাটফরমের সামনের দিকে যাই।

: সামনের দিকে কেন?

: ট্রেনের সামনের দিকে এসি কোচ আছে। এসি কোচে চড়লে এই গরমে একটু শান্তিমতন যাওয়া যাবে।

হেলালের কথা শেষ হতে না হতেই স্টেশনের মাইকে ঘোষণা ভেসে এলো-

: প্লাটফরমে অবস্থানরত যাত্রীরা খেয়াল করুন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিস্তা এক্সপ্রেস এক নম্বর প্লাটফরমের এক নম্বর লাইনে প্রবেশ করবে। আপনারা যারা আসনবিহীন টিকিট কেটেছেন, তারা এসি কোচে উঠবেন না; ট্রেনের পেছনের বগিগুলোয় উঠবেন। ধন্যবাদ...

ঘোষণা শুনে হেলালের উদ্দেশে হাসতে হাসতে বললাম-

: কপালে আছে ডিসি; কেমনে পাইবাম এসি! চলেন, পেছনের দিকে যাই।

ট্রেনে প্রচণ্ডরকম ভিড়। ভিড়ের ঠেলা কুলাতে না পেরে এখানকার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এক ছাত্রী ট্রেন থেকে নেমে গেলেন। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও ট্রেন ছাড়ছে না দেখে কৌতূহল হল। অনুসন্ধানে নামতেই সিটে বসে থাকা মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন-

: এই ট্রেন স্টেশনে ঢোকার আগে অনেকক্ষণ সানকিপাড়া বাজারে দাঁড়াইয়াছিল; সামনের একটা বগির কী জানি খুইলা গেছে।

জানতে চাইলাম-

: কী খুইলা গেছে! চাক্কা?

: বলতে পারতেছি না।

খানিকক্ষণ বাদে ট্রেনের টিকিট চেকাররা সদলবলে কামরায় হাজির হলেন। দলের মধ্যমণি হচ্ছেন কমলাপুর স্টেশনের ভূতপূর্ব স্টেশন ম্যানাজার। স্টেশন ম্যানাজার থাকাকালীন প্রায়ই টেলিভিশনের পর্দায় তার মুখ দেখার সুবাদে চেহারাটা পরিচিত। তাকে বললাম-

: স্যার, আমার নাম নৈমদ্দিন। আপনের কাছে আমার একটা দরবার আছে। এই যে দেখেন মাথার উপরে ফ্যান, এইটারে কলম দিয়া অনেকক্ষণ খোঁচাখুঁচি করছি; চেতে নাই।

আপনে ইস্টিশনের ঠাণ্ডারুম ছাইড়া বর্তমানে ফিল্ডে নামছেন; সাধারণ পাবলিকের পক্ষ হইয়া সরকার বাহাদুরের কাছে যদি এই সুপারিশটা করতেন- আপারক্লাসের সাহেব-সুবাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শোয়া-বসার কামরাগুলা ঠিক রাইখা কেবলমাত্র সাধারণ ক্লাসের বগিগুলারে যেন লঞ্চের মতন ‘ডেক সিস্টেম’ কইরা দেওয়া হয়।

এর ফলে হাঁসের বাচ্চার মতন গাদাগাদি কইরা হইলেও আমরা পাটি বিছাইয়া বইসা যাইতে পারব। যাত্রীরা পাটি লওয়ায় জানালায়ও কোনো ভিড় থাকবে না; ফলে বাইরের ফুরফুরা হাওয়া ভিতরে প্রবেশ করবে। তখন মাথার ওপরের ফ্যান ঘুরল, কী ঘুরল না; সেইটা দেখার প্রয়োজন পড়বে না। বেয়াদবি না নিলে আরেকটা প্রাইভেট কথা আপনের কানে কানে বলতে চাই।

কথাটা হইল- সিটিং প্যাসেঞ্জারের পাশাপাশি প্রতিদিন দেশের প্রতিটা ট্রেনে প্রচুর মানুষ টিকিট কাইটা এইভাবে চিড়াচেপ্টা হইয়া যাতায়াত করে। তাই যাত্রীদের মাঝে বিড়াল না খুঁইজা জায়গামতো বিড়াল খুঁজেন।

এখানেও জনগণের শ্রম ও ঘামে উপার্জিত অর্থের প্রশ্ন। বছরখানেক হয়েছে ইন্দোনেশিয়া থেকে সরকার এসব দামি ও আধুনিক কোচ আমদানি করেছে। এরই মধ্যে এর ফ্যান ভেঙে গেছে, সুইচ বুইট্যা পড়ছে, ইত্যাদি। আমদানি করা মাল দুই নম্বর, নাকি দেশের পাবলিক দুই নম্বর; বুঝতে পারছি না।

হঠাৎ পেছনেই তাকাতেই দেখি, পাশের খাবার গাড়ির কামরা থেকে মইরাজ বের হচ্ছে। আমাকে দেখে সে ময়না পাখির মতো মামা-মামা করতে লাগল। জানতে চাইলাম-

: কিরে! তুই কই যাস?

: ঢাকা যাইতেছি মামা।

: ম্যা-ম্যা বন্ধ কর। আমি তর কোনকালের মামা রে! তর মতন একটা ৪২০-এর মুখে মামা ডাক শুইন্যা লোকজন সত্যি সত্যিই তরে আমার ভাইগ্না মনে করলে বিপদ। অহন ক’, কী জন্য ঢাকা যাইতেছস?

: মামা! নিয়ত কইরা ফেলছি, আমিও কেচিনুরের ব্যবসা করবাম। ব্যবসার বাও বোঝার জন্য তাই ওস্তাদ ধরতে ঢাকা যাইতেছি।

: হাসাইলি। আরে পাগলা; সবাই ওস্তাদ ধরতে চায়; কিন্তু কয়জনে তার নাগাল পায়? এর চাইতে তুই বরং অন্য কাম কর।

: কী কাম?

: দেশের ডিসি স্যার ও ভিসি স্যারদের কেউ কেউ তাদের খাসকামরায় আমকাঠের চৌকি বিছানো শুরু করায় বাজারে এই জিনিসের চাহিদা বাইড়া গেছে। তুই চৌকি সাপ্লাইয়ের ব্যবসা শুরু কর।

: না মামা; আমি কেচিনুরের ব্যবসাই করবাম। আমি চাই রাতারাতি কোটিপতি হইতে; আর সেইজন্য কেচিনুর ছাড়া গত্যন্তর নাই।

: কী কেচিনুর-কেচিনুর করতেছস! এইটা হইল ক্যাসিনো। এই দেশে ক্যাসিনো ব্যবসা করতে গেলে আগে দেশপ্রেমের পরীক্ষা দেওন লাগবে। পরীক্ষায় পাস করতে না পারলে তুই ক্যাসিনো ব্যবসার পারমিশন পাবি না।

: কী পরীক্ষা?

: জাতীয় সঙ্গীত পুরাটা সুর কইরা গাইতে হবে। পারবি?

মইরাজকে আমতা-আমতা করতে দেখে বললাম-

: জাতীয় সঙ্গীত মুখস্থ না কইরাই ক্যাসিনো ব্যবসা করার নিয়ত কইরা ফেলছস! তর সাহস তো কম না? শোন, দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মীদের খাতায় নাম লেখানোর জন্য আগে জাতীয় সঙ্গীত পুরাটা মুখস্থ করবি। এরপর সুর কইরা গাইতে শিখবি- আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় অত্যধিক ভালোবাসি...

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

[email protected]

 

Advertisement

ক্যাসিনো

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বারবার কেন নির্বাহী কর্তৃত্বের কাছে পরাজিত

স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বারবার কেন নির্বাহী কর্তৃত্বের কাছে পরাজিত

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুতি ছাড়া এআই : লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুতি ছাড়া এআই : লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম