স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বারবার কেন নির্বাহী কর্তৃত্বের কাছে পরাজিত
Advertisement
আবু হেনা রাজ্জাকী
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ দিবস হিসাবে পালিত হয়। নিঃসন্দেহে দিনটি বিচার বিভাগের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি-২০০৭ সালের ১ নভেম্বর প্রকৃত অর্থে বিচার বিভাগ পৃথক হয়েছিল, নাকি নির্বাহী বিভাগ থেকে মূলত বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেসিকে পৃথক করা হয়েছিল? বাস্তবতা হলো, সেদিন জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেসির পৃথকীকরণ কার্যকর হয়েছিল; বিচার বিভাগের পূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই দিনটিকে পূর্ণাঙ্গ বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ দিবসের পরিবর্তে ‘জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি পৃথকীকরণ দিবস’ বলা ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক বিচারে অধিক যথার্থ।
দীর্ঘ আন্দোলন, আইনি লড়াই এবং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বহু বছরের প্রত্যাশার পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার পর নির্বাচিত সরকারগুলো বারবার বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অঙ্গীকার করলেও ক্ষমতায় গিয়ে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত আন্তরিকতা দেখাতে পারেনি। এখানেই আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক গভীর স্ববিরোধিতা।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিমকোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল। এর অন্তর্নিহিত দর্শন ছিল সুস্পষ্ট-বিচারকের পেশাগত ভবিষ্যৎ যেন নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান যুক্ত হলেও মূল সংবিধানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার দর্শন আর পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
প্রশ্ন হলো, যে স্বাধীন বিচার বিভাগকে বিরোধী দলে থাকাকালে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত বলে দাবি করা হয়, ক্ষমতায় গিয়ে সেই একই প্রতিষ্ঠানকে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় কেন? বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কি কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার বিষয়, নাকি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার?
ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর ম্যাজিস্ট্রেসি নির্বাহী প্রশাসন থেকে প্রত্যাহার করে বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয়। স্বতন্ত্র বিচার বিভাগীয় সার্ভিস ও নিয়োগব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় দ্বৈত কর্তৃত্বের ব্যবস্থা চলমান থাকায় পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যায়। অর্থাৎ বিচারিক কার্যক্রমের পৃথকীকরণ ঘটলেও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতার প্রশ্নটি অমীমাংসিত রয়ে যায়।
২০০৭ সালের পর দীর্ঘ প্রায় সতের বছর নির্বাচিত সরকারের হাতে এ অসমাপ্ত সংস্কার সম্পন্ন করার সুযোগ ছিল। কিন্তু বাস্তবে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগ ও আশঙ্কা দূর হয়নি। বিচারকদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটি নতুন গুরুত্ব লাভ করে। জনমনে এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিন্যাসের আকাঙ্ক্ষা জাগে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুপ্রিমকোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনিক স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি, আইন উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের উদ্যোগও নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। সংশ্লিষ্ট অংশীজনরাও এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই আশাকে আবার অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পাশাপাশি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেন। সেই রায়ে স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সাংবিধানিক প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা হয়। অথচ সরকার সেই রায় বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর না হয়ে আপিল করে। পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ফলে বিচার বিভাগের দীর্ঘ প্রত্যাশিত প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার অগ্রযাত্রা আবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
এখানে সরকারের অবস্থানের পাশাপাশি সর্বোচ্চ আদালতের ভূমিকাও নির্মোহ মূল্যায়নের দাবি রাখে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এমন একটি মৌলিক বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় বিচারিক ভূমিকা-Judicial Activism-প্রদর্শন করতে পেরেছেন কিনা, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিচারাধীন বিষয়ে আপিল ও স্থগিতাদেশের আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও বলা যায়, বিচার বিভাগের সাংবিধানিক মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা রক্ষায় বিচারিক নেতৃত্বের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দায়িত্ব পালনের কার্যকারিতা ইতিহাসের নির্মোহ বিচারের বিষয় হয়ে থাকবে।
তবে বিচারিক সক্রিয়তার অর্থ আইনগত সীমা অতিক্রম করা নয়; বরং সাংবিধানিক ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে মৌলিক অধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। নির্বাহী বিভাগ যেমন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়াতে পারে না, তেমনি বিচার বিভাগের নিজস্ব সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না।
একটি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন-বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিচারকদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা বা কোনো পেশাগত গোষ্ঠীর বিশেষ দাবি নয়। এটি বিচারপ্রার্থী মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন সাধারণ নাগরিক যখন রাষ্ট্রের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন, তখন তার শেষ আশ্রয় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা। বিচারকের বদলি, পদোন্নতি কিংবা শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ যদি এমন কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে, যার সিদ্ধান্তের বৈধতা তাকে বিচার করতে হতে পারে, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যায়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে মূল সংবিধানের দর্শনের আলোকে ১১৬ অনুচ্ছেদের প্রশ্নটির স্থায়ী সাংবিধানিক নিষ্পত্তি, কার্যকর স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয়, স্বচ্ছ বদলি-পদোন্নতি ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি, দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও বিচারপ্রার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীনতা কখনো জবাবদিহির বিকল্প নয়; বরং প্রকৃত স্বাধীনতার অপরিহার্য শর্তই হলো স্বচ্ছ ও কার্যকর জবাবদিহি।
ইতিহাসের একটি অস্বস্তিকর সত্য হলো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে অনির্বাচিত বা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। অথচ নির্বাচিত সরকারগুলোর দীর্ঘ শাসনকালেও পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকেছে। এর অর্থ অনির্বাচিত শাসনব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব নয়; বরং গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার ঘাটতি নিয়ে গভীর আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা। গণতন্ত্রের সার্থকতা কেবল নির্বাচনে জয়লাভে নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায়। যে সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, সে নিজের ক্ষমতা দুর্বল করে না; বরং রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বারবার একই প্রতিশ্রুতি শুনতে হওয়া জাতির জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি নয়, প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ এবং বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা।
১ নভেম্বর তাই শুধু অতীতের একটি অর্জন উদযাপনের দিন নয়; বরং অসমাপ্ত সাংবিধানিক অঙ্গীকারের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দিন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির পৃথকীকরণকে পূর্ণ বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা হিসাবে উপস্থাপন করে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
ইতিহাস একদিন নিশ্চয়ই বিচার করবে-কারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলেছেন, কারা তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছেন এবং কারা ক্ষমতার স্বার্থে সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছেন।
রাষ্ট্র ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের বিন্যাস নিয়ত আবর্তিত হয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর চালনাক্রিয়ায়। স্বাধীন বিচার বিভাগ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের শুধু অলঙ্কার মাত্র নয়, এটি একদিকে যেমন জনগণকে সুরক্ষা দেয়, তেমনি একটি রাষ্ট্রকে অধিকতর জনমুখী ও কল্যাণকামী করে তোলে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে আমাদের কিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সেই যাত্রা শুরু হোক-১ নভেম্বরের এই আমাদের প্রত্যাশা।
আবু হেনা রাজ্জাকী : সিনিয়র আইনজীবী, সুপ্রিমকোর্ট
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
