Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুতি ছাড়া এআই : লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি

Advertisement

Icon

ড. সাবরিনা লুৎফা

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

এখন যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেই প্রায় সর্বত্র একটা শব্দ শোনা যায় : এআই। চ্যাটজিপিটি ওয়ার্কশপের সিট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভরে যায়। ডিপার্টমেন্টগুলো তাড়াহুড়া করে কোর্স আউটলাইনে এআই ইন্টিগ্রেট, আর শিক্ষার্থীরা বেশ গর্ব করেই দেখায় কীভাবে চ্যাটবট কয়েক মিনিটে তাদের অ্যাসাইনমেন্ট লিখে দিয়েছে, পোস্টার বানিয়ে দিয়েছে বা ভিডিও তৈরি করে দিয়েছে। এ উৎসাহের কিছুটা অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু ব্যাপারটা ধীরে ধীরে এক ধরনের অবসেশনে পরিণত হচ্ছে, আর অবসেশন সাধারণত একটা জরুরি প্রশ্ন করার সুযোগ দেয় না : আমরা কি আসলে প্রস্তুত? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশের ক্ষেত্রে উত্তরটা হলো, আমরা এখনো প্রস্তুত নয়। যে প্রতিষ্ঠানের ভিত একটা শক্তিশালী প্রযুক্তি সামলানোর মতো মজবুত নয়, সেখানে সেই প্রযুক্তি লাভের চেয়ে ক্ষতিই করতে পারে বেশি।

আমার একটা রিসার্চ প্রজেক্টে আমি পশ্চিম সুইডেনে হেলথকেয়ার ইনোভেশন নিয়ে কাজ করেছিলাম। সেখানে একটা স্টার্টআপ ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের সঙ্গে মিলে দুটি হাসপাতালের মধ্যে রক্ত আনা-নেওয়ার জন্য একটা ড্রোন বানিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে মনে হয়, এটা চালু করা সহজ হবে। কিন্তু হলো না। সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রমাণ চাইল-ড্রোনটা কখনোই কোনো গাড়ি বা মানুষের উপর পড়বে না। আর সেই অনুমতি পেতে দুই বছরের এক্সপেরিমেন্ট লাগল। এরপর দ্বিধায় পড়ল হাসপাতালগুলো। উঁচুতে ওড়ার সময় কি রক্তের মান খারাপ হবে? ল্যান্ড করার শব্দে কি রোগীদের সমস্যা হবে? যে ড্রাইভাররা এখন রক্ত আনা-নেওয়া করেন, তাদের চাকরির কী হবে? স্টাফরা কি ড্রোনটা মনিটর আর নিরাপদে ল্যান্ড করানো শিখতে পারবেন? শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটা তাদের ড্রোন নিয়ে গেল আফ্রিকার এমন এক দেশে, যেখানে নিয়মকানুনের এসব বাধা ছিল না। সেখানে খুব দ্রুতই ড্রোনটা চালু হয়ে গেল, আর কাগজে-কলমে সেটাকে সাফল্যই মনে হলো। কিন্তু দ্রুত চালু হওয়া বা দ্রুত একটা পণ্য বা একটা সার্ভিস ব্যবহার শুরু করা মানে এই নয় যে, আমরা ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত। সুইডেনের সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রশ্নগুলো ইনোভেশনের পথে বাধা ছিল না; বরং সেগুলোই ছিল দায়িত্বশীলভাবে কোনো প্রযুক্তি নেওয়ার অবকাঠামো : নিয়মকানুন, নিরাপত্তা, কোয়ালিটি নিশ্চিত করা, কর্মীদের দক্ষতা, আর যাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে তাদের জন্য একটা পরিকল্পনা।

বাংলাদেশের একাডেমিয়ায় এআইয়ের দিকে তাকালে আমি দ্বিতীয় ধরনটাই দেখি। আমরা প্রায় সবকিছুই খুব দ্রুত গ্রহণ করি; ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশে খুব অল্প একটা অংশ কিছু ব্যবহার শুরু করলেও সংখ্যাটা বিশাল দেখায়। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুত না হয়ে একটা প্রযুক্তি গ্রহণ করা হলে তা সুবিধার বদলে সমস্যা তৈরি করতে পারে। একটু ব্যাখ্যা করে বললে বোঝা যাবে বিষয়টা।

আমাদের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল কনফিডেন্সের কোনো অভাব নেই। বেশিরভাগই জানে, চ্যাটবটে কীভাবে প্রশ্ন লিখতে হয় বা ছবি-ভিডিও বানিয়ে নিতে হয়। কিন্তু অনেকেই এখনো এমনভাবে প্রম্প্ট করতে পারে না, যাতে কোনো বিষয় গভীরভাবে শেখা যায়। এটা কোনো টেকনিক্যাল স্কিল নয়; এটা চিন্তা করার স্কিল। ভালো প্রম্প্ট আসে ভালো প্রশ্ন থেকে, আর ভালো ভালো প্রশ্ন করতে একটা বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হয়। প্রশ্ন সেই করতে পারে, যে একটা সমস্যাকে ভেঙে দেখতে পারে, দুর্বল যুক্তি ধরতে পারে, আর বুঝতে পারে কখন একটা উত্তর শুনতে ঠিক মনে হলেও আসলে ভুল।

আমাদের ক্লাসরুম বহু বছর ধরে মুখস্থ করাকেই পুরস্কৃত করে এসেছে। প্রশ্ন করাকে আমাদের স্কুলগুলোতে বেয়াদবি হিসাবে দেখা হয়। সম্প্রতি আমার নিজের ক্লাসেই এটা দেখেছি। শিক্ষার্থীদের দুটি আর্টিকেল পড়ে সহপাঠীদের জন্য কিছু প্রশ্ন তৈরি করতে বলেছিলাম, যেগুলোর উত্তর দিতে হলে ক্রিটিক্যালি ভাবতে হবে। তাদের বলেছিলাম কিছু মুখস্থ না করতে, শুধু আর্টিকেলগুলো আসলে কী নিয়ে লেখা হয়েছে বা কোন বিষয়টাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটা বুঝে আসতে। ক্লাসে দেখা গেল বেশিরভাগই একই প্রশ্ন করছে, যেগুলো সম্ভবত এআই থেকে নেওয়া। সহপাঠীরা উত্তর দিতে না পারলে আমি প্রশ্নগুলো যারা করেছিল, তাদেরকেই উত্তর দিতে বললাম। অধিকাংশই নিজেদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। প্রশ্নগুলো এসেছিল চ্যাটবট থেকে, আর্টিকেল নিয়ে তাদের নিজেদের ধারণা থেকে নয়। তাদের কাছে ঠিকঠাক শব্দ ছিল, কিন্তু সেই শব্দের পেছনের চিন্তাটা ছিল না।

চ্যাটবট সাপ্লাই চেইন কীভাবে কাজ করে তা বুঝিয়ে দিতে পারে; কিন্তু দেরিতে আসা শিপমেন্ট, রেগে থাকা সাপ্লায়ার আর বিকালের মধ্যেই উত্তর চাওয়া একজন ম্যানেজারকে কীভাবে সামলাতে হয়, সেটা শেখাতে পারে না। বাস্তব জীবনের সমাধানের জন্য দরকার বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের দরকার হাতে-কলমে শেখা, মুখস্থ করে শেখা নয়, আর এআইয়ের কাছে উত্তর চেয়ে শেখা তো একেবারেই নয়। ওয়ার্ক-ইন্টিগ্রেটেড লার্নিংয়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যা নিয়ে হাতে-কলমে কাজ করে শেখে, আর শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান সেই কাজের দিকনির্দেশনা দেন ও মূল্যায়ন করেন। যে শিক্ষার্থী বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করেছে, সে জানে কোন প্রশ্নগুলো জরুরি, আর তাই সে ভালো প্রম্প্ট করতে পারে এবং আউটপুটও ভালোভাবে যাচাই করতে পারে।

কোনো প্রযুক্তি নেওয়ার আগে সেটা সাপোর্ট করার মতো কাঠামো আমাদের থাকা দরকার। ২০২২ সালের কারিকুলাম যখন অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখার দিকে যেতে চেয়েছিল, তখন এনসিটিবির এক সার্ভেতে দেখা যায়, মাত্র ৩৭.৬ শতাংশ শিক্ষক এর অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতি মোটামুটি বুঝতে পেরেছেন, আর ২০২৪ সালে সেই সংস্কার বাতিল করা হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে এমন অবস্থায় যে, তাদের কখনো কোনো সোর্স নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বা নিজের মতের পক্ষে যুক্তি দিতে বলা হয়নি। তাই বাস্তবে প্রথমে দরকার শিক্ষকদের ট্রেনিং, যাতে তারা অ্যাসাইনমেন্ট আর অ্যাসেসমেন্ট নতুন করে সাজাতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের ক্রিটিক্যালি এআই ব্যবহার করতে শেখাতে পারেন। স্কুল থেকেই ক্রিটিক্যাল থিংকিংকে শিক্ষার একটা মূল লক্ষ্য বানাতে হবে। প্রশ্ন করা, যুক্তি দেওয়া, বিভিন্ন সোর্স তুলনা করা আর সমস্যার সমাধান করা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার অনেক আগে থেকেই পরিষ্কারভাবে শেখাতে ও মূল্যায়ন করতে হবে। ২০২৭ সালের মাধ্যমিক কারিকুলাম এটা ঠিকভাবে করার একটা সুযোগ এসেছে। স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়ার্ক-ইন্টিগ্রেটেড লার্নিংকে উৎসাহ দিতে হবে, যেখানে ইন্টার্নশিপ, ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্ট আর কমিউনিটির সমস্যা সমাধানের কাজগুলো ঠিকভাবে পরিকল্পনা, তত্ত্বাবধান আর মূল্যায়ন করা হবে। এমন অ্যাসেসমেন্ট চালু করতে হবে, যেটা চিন্তাকে পুরস্কৃত করে, যেমন ভাইভা, অ্যাপ্লায়েড প্রজেক্ট আর ধাপে ধাপে জমা দেওয়া কাজ, যাতে শিক্ষার্থীর চিন্তার ধারাটা স্পষ্ট দেখা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটা পরিষ্কার এআই পলিসি থাকতে হবে, যেখানে বলা থাকবে কোথায় এআই ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হবে, কোথায় তা জানাতে হবে, আর কোথায় এটা ব্যবহার করা যাবে না।

আমাদের তরুণরা কৌতূহলী, আর খুব দ্রুত শিখতে পারে। ক্রিটিক্যাল থিংকিং, বাস্তব অভিজ্ঞতা আর প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট আগে তৈরি না করেই যদি আমরা এআই নিয়ে নিই, তাহলে এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরির ঝুঁকি থাকে, যারা উত্তর বানাতে পারবে, কিন্তু সেই উত্তর ঠিক কিনা, তা বিচার করতে পারবে না। শিক্ষায় প্রস্তুতি অগ্রগতিকে দেরি করিয়ে দেয় না; প্রস্তুতিই অগ্রগতিকে টেকসই করে।

ড. সাবরিনা লুৎফা : ইউল্যাব বিজনেস স্কুলের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং CERAL-এর ইনোভেশন অ্যাডভাইজার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বারবার কেন নির্বাহী কর্তৃত্বের কাছে পরাজিত

স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বারবার কেন নির্বাহী কর্তৃত্বের কাছে পরাজিত

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুতি ছাড়া এআই : লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুতি ছাড়া এআই : লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম