পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে

  বদরুদ্দীন উমর ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পেঁয়াজ
পেঁয়াজ। ফাইল ছবি

বাংলাদেশে এখন হাজার সমস্যার মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের, বিশেষত খাদ্যসামগ্রীর অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি। প্রতিটি জিনিসের মূল্যই বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সঙ্গে কমছে মানুষের জীবনের মূল্য। কতভাবে যে মানুষের জীবন যাচ্ছে তার ঠিক নেই।

তার মধ্যে পুষ্টির অভাবে মৃত্যু ঘটছে ব্যাপকভাবে। দুর্ভিক্ষ হলে সেটা বোঝা যায়। কিন্তু পুষ্টিহীনতায় মৃত্যু সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না, যদিও এই মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে ভয়াবহ ব্যাপার। বিক্রেতারা এখন অবাধে মূল্যবৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশ এখন পরিণত হয়েছে বিক্রেতার বাজারে।

এখানে ক্রেতার কিছু করার নেই। বিক্রেতা যা দাম চায় ক্রেতারা বিনা প্রতিবাদে সেই দামে জিনিসপত্র কেনে। বিক্রেতারা বেপরোয়া। নানা জিনিসপত্রের শত শত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে খাদ্যদ্রব্য, কৃষিপণ্য হল সব থেকে বিপজ্জনক। এসব সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করে নিজেরাই।

তাদের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ এসব সিন্ডিকেট সরকারের ও সরকারি দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তারা সরকারি দলের অর্থের জোগানদারও বটে। কাজেই তাদের অপরাধমূলক তৎপরতা বন্ধ করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা সরকারের দিক থেকে নেই। তাদের কোনো শাস্তি নেই। শাস্তির এই অভাবই মূল কারণ, যে জন্য মূল্যবৃদ্ধি রোধ হচ্ছে না, ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

এর ফলে দেশের সাধারণ লোকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। শ্রমিক থেকে নিয়ে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত, যাদের মাসিক আয় নির্দিষ্ট, তারাই এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সব থেকে বেশি বিপদের মধ্যে আছে। তাদের জীবনের মান দিন দিন কমছে। তাদের প্রাণশক্তিও কমে আসছে।

এর মধ্যে শ্রমিকদের অবস্থাই সব থেকে শোচনীয়। তাদের মজুরি বিশ্বের যে কোনো দেশের মজুরির তুলনায় কম। এই কম আয় মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের জীবনযাপনকে দিন দিন ভয়াবহ করছে।

গত কিছুদিন থেকে পেঁয়াজের মূল্য সব থেকে দ্রুত ও বেপরোয়াভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাজারে পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ২৫০ টাকার উপরে বিক্রি হয়েছে। বিক্রেতারা একদিনেই ৪০/৫০ টাকা মূল্যবৃদ্ধি করেছিল! এর কোনো নজির নেই। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে বিক্রেতা-ব্যবসায়ীরা কতখানি বেপরোয়া ও নিশ্চিন্ত।

তাদের গায়ে হাত দেয়ার কেউ নেই। অন্য সব জিনিসপত্রের মতো পেঁয়াজও সিন্ডিকেটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সংবাদপত্র রিপোর্ট থেকেই দেখা যায়, এই মূল্যবৃদ্ধি দেশে পেঁয়াজের অভাবের জন্য হচ্ছে না। জনগণের চাহিদা মেটানোর জন্য পেঁয়াজের যথেষ্ট মজুদ আছে।

কিন্তু ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ গুদামজাত করে বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পেঁয়াজের মূল্য ইচ্ছামতো বৃদ্ধি করছে। সংবাদপত্রের ছবিতেও দেখা যাচ্ছে কিভাবে গুদামজাতকরণের কারণে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে এবং অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই পেঁয়াজের চালান এসে পৌঁছাবে। এর জন্য বিমানে করে পেঁয়াজ আনার ব্যবস্থা হচ্ছে। তাছাড়া জাহাজ তো আছেই। মাটির পেঁয়াজ আকাশে উঠেছে।

১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘পেঁয়াজ বিমানে উঠেছে আর চিন্তা নেই।’ কিন্তু চিন্তা কি সত্যিই নেই? কারণ সিন্ডিকেট যেভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে তাতে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করলেও সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়।

এসব আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে আমদানি হওয়া মাত্র তা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই চলে যাবে। তারা যথারীতি পেঁয়াজ গুদামজাত করে লুকিয়ে ফেলবে এবং মূল্য সাময়িকভাবে কয়েকদিন কিছু কমলেও আবার চড়া মূল্যেই বিক্রি হতে থাকবে। কারণ যে কারণে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে সে কারণ থেকেই যাচ্ছে।

সিন্ডিকেটের তৎপরতা বন্ধ করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা সরকারের নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী জনগণকে পরামর্শ দিয়েছেন পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করতে। পেঁয়াজ ছাড়া যে রান্না করা যায় না তা নয়। এ দেশে হিন্দুরা আগে পেঁয়াজ খেতেন না। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে আছে, স্কুলে হিন্দু ছাত্রের পাশে বসা মুসলমান ছাত্রের মুখে পেঁয়াজের গন্ধের কথা।

ব্রিটিশ আমলের শেষদিক থেকে হিন্দুরা অনেকে পেঁয়াজ খাওয়া শুরু করেন এবং এখন অধিকাংশ হিন্দু বাড়িতেই পেঁয়াজের ব্যবহার আছে। কাজেই পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার কথা নতুন কিছু নয়। কিন্তু আগেকার দিনে যাই হোক, হিন্দুরাও এখন পেঁয়াজ খেতে অভ্যস্ত। আর মুসলমান বাড়ির রান্নার পেঁয়াজই হল মসলার প্রাণ।

পেঁয়াজ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না বা রান্না করতে পারে না এমন না হলেও এখন তা প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। মানুষ পেঁয়াজ খেতে অভ্যস্ত। এ কারণে ২০০ টাকা কেজিপ্রতি মূল্য হলেও মানুষ পেঁয়াজ কিনেছে এবং মাত্র অল্পদিনের মধ্যেই ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের অবাধ মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে।

এসব কথা সংবাদপত্রেই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অন্য প্রশ্ন আছে। পেঁয়াজ ছাড়া রান্না সম্ভব, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে কেন বলা হবে পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করতে? পেঁয়াজের মূল্য আয়ত্তের মধ্যে রাখা এবং তার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ সরকারের কাজ ও দায়িত্ব।

এর পরিবর্তে জনগণকে পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করার পরামর্শের অর্থ হল সিন্ডিকেটের দ্বারা পেঁয়াজের মূল্য অবাধ ও বেপরোয়া বৃদ্ধি বন্ধ করার ক্ষেত্রে অক্ষমতা। যেখানে সরকারের দায়িত্ব সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং ব্যবসায়ীদের শাস্তি দিয়ে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, সেখানে তার পরিবর্তে বলা হচ্ছে পেঁয়াজ আমদানি করার কথা!

তাদের ধারণা, পেঁয়াজ আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করলে পেঁয়াজের মূল্য কমবে। মনে রাখা দরকার, সাধারণ নিয়মে স্বাভাবিক অবস্থায় সেটাই হওয়ার কথা। কিন্তু যেখানে সিন্ডিকেটই প্রকৃতপক্ষে বাজার সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের নেই, সেখানে সরবরাহ বৃদ্ধি করে ফল লাভের বিশেষ কোনো সম্ভাবনা যে নেই, এটা সহজবোধ্য ব্যাপার।

বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাজার এখন এক উপদ্রুত এলাকা। এই উপদ্রব চলতে থাকা ও বন্ধ না হওয়ার দুই কারণ। প্রথমত, বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারের অক্ষমতা ও ব্যর্থতা। দ্বিতীয়ত, এর বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে প্রকাশ্য প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অভাব।

মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনগণ অনেক কষ্টের মধ্যে আছেন। কিন্তু তার জন্য জনগণের কোনো প্রকাশ্য বিক্ষোভ নেই। এ পরিস্থিতিতে যেখানে জনগণের সমাবেশ ও মিছিল হওয়া দরকার সেখানে কিছুই নেই। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোরও কোনো কর্মসূচি বা নড়াচড়া নেই! তারা নিশ্চুপই আছে!!

তাদের অবস্থা দেখে মনে হয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির এবং এই মুহূর্তের পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি কোনো উল্লেখযোগ্য সমস্যা নয়!! এ পরিস্থিতিতে শুধু পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি করেই যে লুটপাট হচ্ছে তাই নয়। লুটপাট অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই হচ্ছে।

এমনকি কোনো কোনো সরকারি অফিসের পিয়ন বা দারোয়ান পর্যন্ত হঠাৎ করে শুধু এক-দুই কোটি নয়, শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে! সংবাদপত্রে এ সম্পর্কিত রিপোর্ট মাঝে মাঝেই পাওয়া যায়। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের লুটপাট সর্বত্র তো আছেই। তার কোনো কূলকিনারা নেই।

১৬.১১.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

ঘটনাপ্রবাহ : পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×