দুরবস্থায় নির্বাচন কমিশন
jugantor
একাত্তরের ঝর্নাতলায়
দুরবস্থায় নির্বাচন কমিশন

  মহিউদ্দিন আহমদ  

০৫ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত মঙ্গলবার ২ মার্চ ভোটার দিবস উপলক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ভবন আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের কিছু বাস্তব পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্যে একই মঞ্চে উপবিষ্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা পরবর্তী বক্তা হিসাবে তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাহবুব তালুকদারকে টার্গেট এবং উদ্দেশ করে কিছু কঠোর মন্তব্য করেছেন।

মঙ্গলবার দুপুর থেকে টিভির খবরে এবং স্ক্রলে এ ‘বাহাস’ বিশেষ গুরুত্ব পায়। আর পরদিন বুধবারের প্রায় সব দৈনিক পত্রিকায়ও এ খবরটি প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান করে নেয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিবিসি বাংলা অধিবেশনেও খবরটি শুনেছি।

আমাদের নির্বাচন কমিশনগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতার কৃতিত্ব দিতেই হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ঠিকই বুঝলেন, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য একটি যুগোপযোগী সংবিধান অতি জরুরি।

তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় তিনি দেখলেন, যেখানে ভারত স্বাধীনতার দুই বছরের মধ্যে তাদের সংবিধান প্রণয়ন করে ফেলে, তার বিপরীতে পাকিস্তান খোঁড়া জাতের একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে সাত-আট বছর সময় নিল। সে সংবিধানও টিকল মাত্র ৩ বছর! আইয়ুব খান সেই সংবিধানটি ছুড়ে ফেলে দিলেন ১৯৫৮-এর অক্টোবরে ক্ষমতা দখল করেই।

বঙ্গবন্ধু সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দিলেন তার একান্তই স্নেহভাজন এবং যোগ্যতম ব্যক্তিদের একজন, ড. কামাল হোসেনকে। ড. কামাল হোসেনও দ্রুততম সময়ে সংবিধান প্রণয়নের কাজটি শেষ করে ফেললেন এবং ১৯৭২-এর ৪ নভেম্বর আমাদের গণপরিষদে এ সংবিধান গৃহীতও হলো।

এই ক্ষেত্রে ভারতের চেয়েও কম সময় নিলেন ড. কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক পরামর্শ এবং তদারকি ড. কামাল হোসেনের জন্য বড় এক প্রাপ্তি ছিল।

বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে যে সংবিধানটি বাংলাদেশকে উপহার দিলেন, সেজন্য তাকে তার জন্মশতবার্ষিকীতে বিশেষভাবে স্মরণ করা আমাদের একটি দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। আধুনিক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য যা যা দরকার, তার সবকিছুই আমি এ সংবিধানে দেখতে পেয়েছিলাম। পরে এ সংবিধানে এত কাটাছেঁড়া হলো যে, সেই মূল সংবিধানকে পরে চেনাটাই কঠিন হয়ে পড়ল।

তবে নির্বাচন কমিশন, তার গঠন, কার্যক্রম, দায়দায়িত্ব এবং ক্ষমতা ১৯৭২ সালে যেমন ছিল তা এখনো তেমনই আছে বলে আমার ধারণা। নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশন কেমন গুরুত্বপূর্ণ তা একটি উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে মনে করি।

সৌদি আরব এবং তার আশপাশের অনেক দেশ অনেক উন্নত, মাথাপিছু আয় আমেরিকা-ইউরোপ দেশগুলোর মতো। কিন্তু এসব দেশে কোনো নির্বাচন নেই, নির্বাচন কমিশনও নেই। সৌদি আরবে তো কোনো সংবিধানই নেই!! এসব দেশে রাজা-বাদশাহ্রা যা বলেন, তাই আইন! তারা আইন জারি করেন। ‘ফরমান’ জারি করেন।

বাংলাদেশ গরিব, অনুন্নত একটি দেশ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ শুরু থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কতগুলো পদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকল। তার মধ্যে একটি হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বাংলাদেশ বিশ্বাস করল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বদলে।

বাংলাদেশের শুরু থেকে বলি কেন, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের ফলাফলে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করল, ভারত-পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো। তারপর ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আমরা দেখি, ৪০-এর দশকে যে মুসলিম লীগ পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই মুসলিম লীগ কবরে ঢুকে গেছে!!

কবরে এমনভাবে ঢুকে গেল যে, প্রাদেশিক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনও তখনকার এক ছাত্র-খালেক নওয়াজ খানের কাছে পরাজিত হয়ে গেছেন! তার এমন আছাড় খাওয়ার কারণ এ নির্বাচনের মাত্র দু’বছর আগে, ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর গুলিবর্ষণের সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন তিনি।

আমরা শিশুরা তখন এমনও শুনেছিলাম, মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন পূর্ব বাংলার মানুষকে দুই আনা সেরের লবণ ১৬ টাকায় খাইয়েছিলেন!! সুতরাং তাকে মাফ করা যায় না। মাফ পেলেন না নূরুল আমিন। তিনি উচ্ছেদ হয়ে গেলেন তার দলসহ।

নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহিতা আদায়ের শান্তিপূর্ণ উপায় ক্ষমতা হস্তান্তরের এক উৎকৃষ্ট এবং অনুসরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি হলো তখন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলাকে ক্ষমতায় থাকতে দিল না পাকিস্তানের এক বাঙালি প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলী এবং তার সঙ্গের করাচির ষড়যন্ত্রকারীরা। সে আর এক ভিন্ন কাহিনি।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু যথার্থই গুরুত্ব দিলেন সাধারণ নির্বাচনকে। নতুন দেশে তিনি ম্যান্ডেট চাইলেন। ১৯৭৩-এর মার্চের ৭ তারিখে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল-বিশাল ম্যান্ডেট পেলেনও। যেমন আশা করা হয়েছিল।

মোট ৩০০ আসনের মধ্যে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পেল ২৯৩ আসন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার তখন বিচারপতি মো. ইদ্রিস। তার সঙ্গে শুধু আর একজন নির্বাচন কমিশনারের নাম দেখতে পাচ্ছি, নূর মোহাম্মদ খান। মানে, দুজনের নির্বাচন কমিশন, হাল আমলের ৪ জনের নয়।

২.

বাংলাদেশ-ভারত পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের তিনজনকে আমি বন্দনা করি। বিচারপতি সাত্তার ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনটি পরিচালনা করেছিলেন। এ নির্বাচনেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সারা পাকিস্তানের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬২টি আসনে বিজয়ী হয়ে সারা পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন তিনি।

১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। এ নির্বাচনগুলো সম্পর্কে বড় দলগুলোর পক্ষ থেকে সিরিয়াস অনিয়মের কোনো অভিযোগ ছিল না।

ভারতের এক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার টিএন সেসান সারা দুনিয়াতেই নন্দিত। ১৯৫৫ সালের ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাডারের এক কর্মকর্তা ১৯৮৯ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কেবিনেট সেক্রেটারি ছিলেন।

১৯৯০-এর ডিসেম্বরে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করে নির্বাচন পদ্ধতিতে এমন সব সংস্কার চালু করলেন এবং নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া ক্ষমতা এমন নির্মোহ এবং পক্ষপাতহীনভাবে প্রয়োগ করতে থাকলেন যে, সব রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থী তাকে সমীহ এবং ভয়ও করতে থাকল। ২০১৯ সালে তার মৃত্যুর পর টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরের শিরোনাম ছিল- T.N. Seshan, former CEC who tamed politicians.

তার বিরুদ্ধে তখন আনীত একটি কঠোর সমালোচনা ছিল-He is a snake। জবাবে তিনি বললেন, আমি snake হতে যাব কেন? সাপের কি মেরুদণ্ড আছে? কিন্তু আমার তো মেরুদণ্ড আছে। সাপ বুক এবং পেটের ওপর নির্ভর করে চলাফেরা করে। আমি তো খাড়া হয়েই হাঁটাহাঁটি, দৌড়াদৌড়ি করি।

বাংলাদেশের যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নাম মনে পড়লে শ্রদ্ধায় মাথানত হয়ে আসে, তিনি আবু হেনা। ১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের ৮ মে পর্যন্ত তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন।

পাকিস্তান জমানায় ১৯৬৩ ব্যাচের সিএসপি, কতগুলো মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ফিলিপিনসে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। অমায়িক এবং হাসিখুশি স্বভাবের এ প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার বছরখানেক আগেই পদত্যাগ করে বসলেন!!

এ বিষয়ে তার সঙ্গে আমার কয়েকবার কথা হয়। তিনি বলেছিলেন তখন, বিএনপি যখন তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল, তখন তিনি তার আত্মসম্মানের কথা বিবেচনা করে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন, কারও সঙ্গে পরামর্শ না করেই, কাউকে আগে না জানিয়েই।

১৫ মিনিট আগে তিনি তার পিএকে ডেকে পদত্যাগপত্রের ডিক্টেশন দিলেন এবং সেই পদত্যাগপত্রে তক্ষুনি সই করে বেরিয়ে আসেন। তারপর গত ২১ বছরে আমাদের নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন নিয়ে এত কথাবার্তা চলছে, কিন্তু তিনি চুপ এবং নীরবই থাকছেন।

৩.

বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনার মতো এমন কিছু করবেন, তা প্রত্যাশা করি না। যে দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের দু-দুটি চিঠির একটিও মহামান্য রাষ্ট্রপতির অফিস প্রাপ্তি স্বীকার পর্যন্ত করল না, সেখানে নূরুল হুদার শক্তির উৎস স্পষ্ট।

মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার যে কথাগুলো বলেছেন, তা তো আমার কাছে যৌক্তিকই মনে হয়েছে। তিনি রাউজান পৌরসভা এবং উপজেলা নির্বাচনে সব প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ের উদাহরণ দিয়েছেন, তা তো কঠোর সত্য ও বাস্তবতা।

নূরুল হুদা তো এ তথ্য খণ্ডন করতে চেষ্টাও করলেন না। তার নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার অনাগ্রহ তো সংখ্যায় শত শত। এ দেশের অনেকেই তো মনে করেন, হাল আমলে দেখছি মনোনয়নই বড় কথা।

সঠিক শাসক দলের মনোনয়ন পেলেই বিজয় প্রায় নিশ্চিত। এই যদি আমাদের নির্বাচনের চেহারা-চরিত্র হয়, তাহলে নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের দরকারই বা কী? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কতগুলো পশ্চিমা দেশ যে আমাদের গত কয়েকটি নির্বাচনকে ‘ঋষধবিফ’ নির্বাচন হিসাবে বর্ণনা করে আসছে, তো নূরুল হুদা তাদের উদ্দেশে কী বলবেন?

তারপর নূরুল হুদার নাম উল্লেখ তো মাহবুব তালুকদার একবারও করেননি। কিন্তু নূরুল হুদা তো প্রকাশ্যে, তার পদ-পদবি ভুলে গিয়ে মাহবুব তালুকদারকে আক্রমণ করলেন নোংরাভাবে। মাহবুব তালুকদার পকেট থেকে বক্তৃতা বের করে পড়ে থাকেন, এটি কোনো অভিযোগ হতে পারে?

তারপর মাহবুব তালুকদার ডাস্টবিন থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকেন, এমন একজনকেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে নিয়োগ দিলেন! নূরুল হুদা গত চার বছর ধরে ‘মিছা’ বলে আসছেন, গত মঙ্গলবারও তার সেই রুচি তিনি দেখালেন। আর তিনি তার এক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ আজিজের গোত্র হিসাবে নিজেকে জাহির করলেন।

‘শিউলী তলা’

বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, উত্তরা

মহিউদ্দিন আহমদ : সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

একাত্তরের ঝর্নাতলায়

দুরবস্থায় নির্বাচন কমিশন

 মহিউদ্দিন আহমদ 
০৫ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত মঙ্গলবার ২ মার্চ ভোটার দিবস উপলক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ভবন আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের কিছু বাস্তব পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্যে একই মঞ্চে উপবিষ্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা পরবর্তী বক্তা হিসাবে তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাহবুব তালুকদারকে টার্গেট এবং উদ্দেশ করে কিছু কঠোর মন্তব্য করেছেন।

মঙ্গলবার দুপুর থেকে টিভির খবরে এবং স্ক্রলে এ ‘বাহাস’ বিশেষ গুরুত্ব পায়। আর পরদিন বুধবারের প্রায় সব দৈনিক পত্রিকায়ও এ খবরটি প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান করে নেয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিবিসি বাংলা অধিবেশনেও খবরটি শুনেছি।

আমাদের নির্বাচন কমিশনগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতার কৃতিত্ব দিতেই হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ঠিকই বুঝলেন, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য একটি যুগোপযোগী সংবিধান অতি জরুরি।

তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় তিনি দেখলেন, যেখানে ভারত স্বাধীনতার দুই বছরের মধ্যে তাদের সংবিধান প্রণয়ন করে ফেলে, তার বিপরীতে পাকিস্তান খোঁড়া জাতের একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে সাত-আট বছর সময় নিল। সে সংবিধানও টিকল মাত্র ৩ বছর! আইয়ুব খান সেই সংবিধানটি ছুড়ে ফেলে দিলেন ১৯৫৮-এর অক্টোবরে ক্ষমতা দখল করেই।

বঙ্গবন্ধু সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দিলেন তার একান্তই স্নেহভাজন এবং যোগ্যতম ব্যক্তিদের একজন, ড. কামাল হোসেনকে। ড. কামাল হোসেনও দ্রুততম সময়ে সংবিধান প্রণয়নের কাজটি শেষ করে ফেললেন এবং ১৯৭২-এর ৪ নভেম্বর আমাদের গণপরিষদে এ সংবিধান গৃহীতও হলো।

এই ক্ষেত্রে ভারতের চেয়েও কম সময় নিলেন ড. কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক পরামর্শ এবং তদারকি ড. কামাল হোসেনের জন্য বড় এক প্রাপ্তি ছিল।

বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে যে সংবিধানটি বাংলাদেশকে উপহার দিলেন, সেজন্য তাকে তার জন্মশতবার্ষিকীতে বিশেষভাবে স্মরণ করা আমাদের একটি দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। আধুনিক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য যা যা দরকার, তার সবকিছুই আমি এ সংবিধানে দেখতে পেয়েছিলাম। পরে এ সংবিধানে এত কাটাছেঁড়া হলো যে, সেই মূল সংবিধানকে পরে চেনাটাই কঠিন হয়ে পড়ল।

তবে নির্বাচন কমিশন, তার গঠন, কার্যক্রম, দায়দায়িত্ব এবং ক্ষমতা ১৯৭২ সালে যেমন ছিল তা এখনো তেমনই আছে বলে আমার ধারণা। নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশন কেমন গুরুত্বপূর্ণ তা একটি উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে মনে করি।

সৌদি আরব এবং তার আশপাশের অনেক দেশ অনেক উন্নত, মাথাপিছু আয় আমেরিকা-ইউরোপ দেশগুলোর মতো। কিন্তু এসব দেশে কোনো নির্বাচন নেই, নির্বাচন কমিশনও নেই। সৌদি আরবে তো কোনো সংবিধানই নেই!! এসব দেশে রাজা-বাদশাহ্রা যা বলেন, তাই আইন! তারা আইন জারি করেন। ‘ফরমান’ জারি করেন।

বাংলাদেশ গরিব, অনুন্নত একটি দেশ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ শুরু থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কতগুলো পদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকল। তার মধ্যে একটি হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বাংলাদেশ বিশ্বাস করল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বদলে।

বাংলাদেশের শুরু থেকে বলি কেন, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের ফলাফলে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করল, ভারত-পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো। তারপর ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আমরা দেখি, ৪০-এর দশকে যে মুসলিম লীগ পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই মুসলিম লীগ কবরে ঢুকে গেছে!!

কবরে এমনভাবে ঢুকে গেল যে, প্রাদেশিক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনও তখনকার এক ছাত্র-খালেক নওয়াজ খানের কাছে পরাজিত হয়ে গেছেন! তার এমন আছাড় খাওয়ার কারণ এ নির্বাচনের মাত্র দু’বছর আগে, ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর গুলিবর্ষণের সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন তিনি।

আমরা শিশুরা তখন এমনও শুনেছিলাম, মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন পূর্ব বাংলার মানুষকে দুই আনা সেরের লবণ ১৬ টাকায় খাইয়েছিলেন!! সুতরাং তাকে মাফ করা যায় না। মাফ পেলেন না নূরুল আমিন। তিনি উচ্ছেদ হয়ে গেলেন তার দলসহ।

নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহিতা আদায়ের শান্তিপূর্ণ উপায় ক্ষমতা হস্তান্তরের এক উৎকৃষ্ট এবং অনুসরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি হলো তখন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলাকে ক্ষমতায় থাকতে দিল না পাকিস্তানের এক বাঙালি প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলী এবং তার সঙ্গের করাচির ষড়যন্ত্রকারীরা। সে আর এক ভিন্ন কাহিনি।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু যথার্থই গুরুত্ব দিলেন সাধারণ নির্বাচনকে। নতুন দেশে তিনি ম্যান্ডেট চাইলেন। ১৯৭৩-এর মার্চের ৭ তারিখে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল-বিশাল ম্যান্ডেট পেলেনও। যেমন আশা করা হয়েছিল।

মোট ৩০০ আসনের মধ্যে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পেল ২৯৩ আসন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার তখন বিচারপতি মো. ইদ্রিস। তার সঙ্গে শুধু আর একজন নির্বাচন কমিশনারের নাম দেখতে পাচ্ছি, নূর মোহাম্মদ খান। মানে, দুজনের নির্বাচন কমিশন, হাল আমলের ৪ জনের নয়।

২.

বাংলাদেশ-ভারত পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের তিনজনকে আমি বন্দনা করি। বিচারপতি সাত্তার ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনটি পরিচালনা করেছিলেন। এ নির্বাচনেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সারা পাকিস্তানের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬২টি আসনে বিজয়ী হয়ে সারা পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন তিনি।

১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। এ নির্বাচনগুলো সম্পর্কে বড় দলগুলোর পক্ষ থেকে সিরিয়াস অনিয়মের কোনো অভিযোগ ছিল না।

ভারতের এক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার টিএন সেসান সারা দুনিয়াতেই নন্দিত। ১৯৫৫ সালের ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাডারের এক কর্মকর্তা ১৯৮৯ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কেবিনেট সেক্রেটারি ছিলেন।

১৯৯০-এর ডিসেম্বরে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করে নির্বাচন পদ্ধতিতে এমন সব সংস্কার চালু করলেন এবং নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া ক্ষমতা এমন নির্মোহ এবং পক্ষপাতহীনভাবে প্রয়োগ করতে থাকলেন যে, সব রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থী তাকে সমীহ এবং ভয়ও করতে থাকল। ২০১৯ সালে তার মৃত্যুর পর টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরের শিরোনাম ছিল- T.N. Seshan, former CEC who tamed politicians.

তার বিরুদ্ধে তখন আনীত একটি কঠোর সমালোচনা ছিল-He is a snake। জবাবে তিনি বললেন, আমি snake হতে যাব কেন? সাপের কি মেরুদণ্ড আছে? কিন্তু আমার তো মেরুদণ্ড আছে। সাপ বুক এবং পেটের ওপর নির্ভর করে চলাফেরা করে। আমি তো খাড়া হয়েই হাঁটাহাঁটি, দৌড়াদৌড়ি করি।

বাংলাদেশের যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নাম মনে পড়লে শ্রদ্ধায় মাথানত হয়ে আসে, তিনি আবু হেনা। ১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের ৮ মে পর্যন্ত তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন।

পাকিস্তান জমানায় ১৯৬৩ ব্যাচের সিএসপি, কতগুলো মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ফিলিপিনসে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। অমায়িক এবং হাসিখুশি স্বভাবের এ প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার বছরখানেক আগেই পদত্যাগ করে বসলেন!!

এ বিষয়ে তার সঙ্গে আমার কয়েকবার কথা হয়। তিনি বলেছিলেন তখন, বিএনপি যখন তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল, তখন তিনি তার আত্মসম্মানের কথা বিবেচনা করে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন, কারও সঙ্গে পরামর্শ না করেই, কাউকে আগে না জানিয়েই।

১৫ মিনিট আগে তিনি তার পিএকে ডেকে পদত্যাগপত্রের ডিক্টেশন দিলেন এবং সেই পদত্যাগপত্রে তক্ষুনি সই করে বেরিয়ে আসেন। তারপর গত ২১ বছরে আমাদের নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন নিয়ে এত কথাবার্তা চলছে, কিন্তু তিনি চুপ এবং নীরবই থাকছেন।

৩.

বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনার মতো এমন কিছু করবেন, তা প্রত্যাশা করি না। যে দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের দু-দুটি চিঠির একটিও মহামান্য রাষ্ট্রপতির অফিস প্রাপ্তি স্বীকার পর্যন্ত করল না, সেখানে নূরুল হুদার শক্তির উৎস স্পষ্ট।

মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার যে কথাগুলো বলেছেন, তা তো আমার কাছে যৌক্তিকই মনে হয়েছে। তিনি রাউজান পৌরসভা এবং উপজেলা নির্বাচনে সব প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ের উদাহরণ দিয়েছেন, তা তো কঠোর সত্য ও বাস্তবতা।

নূরুল হুদা তো এ তথ্য খণ্ডন করতে চেষ্টাও করলেন না। তার নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার অনাগ্রহ তো সংখ্যায় শত শত। এ দেশের অনেকেই তো মনে করেন, হাল আমলে দেখছি মনোনয়নই বড় কথা।

সঠিক শাসক দলের মনোনয়ন পেলেই বিজয় প্রায় নিশ্চিত। এই যদি আমাদের নির্বাচনের চেহারা-চরিত্র হয়, তাহলে নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের দরকারই বা কী? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কতগুলো পশ্চিমা দেশ যে আমাদের গত কয়েকটি নির্বাচনকে ‘ঋষধবিফ’ নির্বাচন হিসাবে বর্ণনা করে আসছে, তো নূরুল হুদা তাদের উদ্দেশে কী বলবেন?

তারপর নূরুল হুদার নাম উল্লেখ তো মাহবুব তালুকদার একবারও করেননি। কিন্তু নূরুল হুদা তো প্রকাশ্যে, তার পদ-পদবি ভুলে গিয়ে মাহবুব তালুকদারকে আক্রমণ করলেন নোংরাভাবে। মাহবুব তালুকদার পকেট থেকে বক্তৃতা বের করে পড়ে থাকেন, এটি কোনো অভিযোগ হতে পারে?

তারপর মাহবুব তালুকদার ডাস্টবিন থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকেন, এমন একজনকেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে নিয়োগ দিলেন! নূরুল হুদা গত চার বছর ধরে ‘মিছা’ বলে আসছেন, গত মঙ্গলবারও তার সেই রুচি তিনি দেখালেন। আর তিনি তার এক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ আজিজের গোত্র হিসাবে নিজেকে জাহির করলেন।

‘শিউলী তলা’

বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, উত্তরা

মহিউদ্দিন আহমদ : সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন