জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা
Advertisement
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষভাগে নিউইয়র্কের আকাশে শরতের প্রথম হাওয়া লাগে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পৃথিবীর সরকারপ্রধানরা একে একে এসে দাঁড়ান-যেন মানবসভ্যতার এক মহামঞ্চে তারা নিজেদের উপস্থিতি নিবন্ধন করছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও প্রতি বছর এ সম্মেলনে যোগ দেন। প্রশ্ন ওঠে-এ যাওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন? নাকি এটি শুধুই এক প্রথাগত যাত্রা?
রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি এক চলমান নদী। তার স্রোতে আছে মানুষের আশা, ইতিহাসের ক্ষত, ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ-যার জন্মই হয়েছে সংগ্রাম থেকে-সে রাষ্ট্রের যাত্রা কখনোই নিঃশব্দ নয়। কিন্তু পৃথিবীর কূটনৈতিক অঙ্গনে এ যাত্রা প্রকাশ পায় এক নীরব ভাষায়-হাত মেলানোয়, বৈঠকে, যৌথ বিবৃতিতে, কিংবা একটি বক্তৃতায়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সেই নীরব ভাষার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। এখানে কোনো দেশ ছোট নয়, বড় নয়; সবাই সমান। একটি ভোট, একটি পতাকা, একটি কণ্ঠ। এ সমতার ধারণা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এক অমূল্য সুযোগ। কারণ পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ভিড়ে ছোট দেশগুলোর কণ্ঠস্বর অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। জাতিসংঘের মঞ্চ সেই চাপা পড়া কণ্ঠকে উচ্চারণের সুযোগ দেয়। তাই প্রশ্ন-প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বছর যাওয়া কি প্রয়োজন?-আসলে রাষ্ট্রের এ নীরব যাত্রার প্রয়োজনীয়তা বোঝার প্রশ্ন।
কূটনীতি কখনোই শুধু চুক্তি বা বৈঠকের নাম নয়। কূটনীতি হলো সম্পর্কের অদৃশ্য সুতা। এ সুতা যত বেশি জোরালো, রাষ্ট্র তত বেশি নিরাপদ, তত বেশি শক্তিশালী। পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রই জানে-যে সম্পর্কগুলো কাগজে লেখা থাকে, সেগুলো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই সম্পর্কগুলো যা মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিকভাবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সবাই মিলে এক জটিল রাজনৈতিক জাল তৈরি করেছে। এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন। প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়। বাংলাদেশের জন্য এ বাস্তবতা আরও গভীর। কারণ-আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি; আমাদের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু এখনো বৈশ্বিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল; আমাদের শ্রমবাজার বিদেশে বিস্তৃত; আমাদের সামুদ্রিক সম্পদ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে; আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস জটিল এবং আন্তর্জাতিক মহলে স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়া জরুরি। এ সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয় থাকা অপরিহার্য। জাতিসংঘের সম্মেলন সেই সক্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম।
এখন প্রশ্নটি আবার সামনে আসে-প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বছর যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি? ধরুন, একটি নদী। নদীটি প্রতি বছর বর্ষায় ফুলে ওঠে, শুকনো মৌসুমে ক্ষীণ হয়। কিন্তু নদীটি কখনো থামে না। তার স্রোত চলতেই থাকে। রাষ্ট্রও ঠিক এমন। রাষ্ট্রের স্রোত কখনো থামে না। পৃথিবীর পরিবর্তনও থামে না। তাই রাষ্ট্রকে পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। জাতিসংঘের সম্মেলন সেই তাল মিলানোর জায়গা। পৃথিবীর রাষ্ট্রপ্রধানরা সেখানে এসে নিজেদের অবস্থান জানান, নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন, নিজেদের সম্পর্কগুলোকে নতুন করে সাজান। যদি বাংলাদেশ এ মঞ্চ থেকে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে পৃথিবীর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে যায়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন জাতিসংঘের সম্মেলনে যান, তখন তিনি শুধু একটি বিমানে চড়ে নিউইয়র্কে যান না। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে যান, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে বহন করেন, বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে-এ যাত্রার সঙ্গে যে লটবহর যায়, সেটি কি সত্যিই প্রয়োজন? নাকি এটি এক অদৃশ্য অপচয়, যা রাষ্ট্রের অর্থ, সময় ও শ্রমকে অকারণে ক্ষয় করে?
প্রধানমন্ত্রীর সফর মানেই একটি চলমান মিছিল-মন্ত্রী, সচিব, নিরাপত্তা বাহিনী, উপদেষ্টা, মিডিয়া প্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কখনো কখনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধি। তাদের সঙ্গে থাকে কাগজপত্রের পাহাড়, বৈঠকের খসড়া, নিরাপত্তার সরঞ্জাম এবং রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার নানা উপকরণ। এ লটবহর যখন বিমানবন্দরে নামে, তখন মনে হয় যেন একটি ছোট রাষ্ট্রই নিউইয়র্কে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ দৃশ্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে প্রশ্ন-এ মিছিল কি দরকারি, নাকি এটি রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ?
রাষ্ট্রের সম্পদ কোনো স্থির পুকুর নয়; এটি এক নদী। এই নদীর পানি সীমাহীন নয়। তাই যখন রাষ্ট্রনেতার বিদেশ সফরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে-এ ব্যয় কি সত্যিই প্রয়োজনীয়?
কিছু মানুষ মনে করেন-লটবহরের আকার যত বড়, রাষ্ট্রের মর্যাদা তত বেশি। যেন বড় দল নিয়ে গেলে পৃথিবী বুঝবে-এ রাষ্ট্র শক্তিশালী, এ রাষ্ট্রের গুরুত্ব আছে। কিন্তু পৃথিবী বদলে গেছে। এখন মর্যাদা আসে দক্ষতা থেকে, নীতি থেকে, কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা থেকে, অর্থনৈতিক শক্তি থেকে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থেকে। পাত্র-মিত্র-অমাত্যের বিশাল দল নিয়ে যাওয়া মানেই বড় মর্যাদা-এ ধারণা এখন পুরোনো। বরং অনেক নেতা খুব ছোট দল নিয়ে যান, কিন্তু তাদের বক্তব্য, তাদের নীতি, তাদের কূটনৈতিক দক্ষতা পৃথিবীকে প্রভাবিত করে। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৭২ সালে তার ডায়েরিতে লিখেছেন-আমি বিদেশে সর্বোচ্চ পাঁচজনকে নিয়ে যেতাম; এখন তো যায় ১০০ জনের বেশি।
যখন মানুষ দেখে-হাসপাতালের বেড কম, স্কুলে শিক্ষক কম, রাস্তায় গর্ত, কৃষক দাম পাচ্ছে না, শ্রমিকের মজুরি কম, বেকার যুবক চাকরি পাচ্ছে না-তখন রাষ্ট্রপ্রধানের বিদেশ সফরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় মানুষের মনে এক অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করে। মানুষ ভাবে-‘আমাদের টাকায় তারা বিদেশে যায়, কিন্তু আমাদের সমস্যার সমাধান হয় না।’ এ অনুভূতি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।
চৌ এন-লাই জাতিসংঘে না গিয়ে অন্য মঞ্চে বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে দক্ষ কূটনীতিকদের একজন। মাও সেতুংয়ের নেতৃত্ব ছিল আদর্শভিত্তিক, কূটনীতিনির্ভর নয়। তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতির চেয়ে চীনের অভ্যন্তরীণ রূপান্তরকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। চীনের শক্তি জাতিসংঘে উপস্থিতির ওপর নির্ভর করেনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন ভাষণ দেন, তখন অনেক সময় দেখা যায়-বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল ছাড়া অন্য দেশের প্রতিনিধিরা খুব কম উপস্থিত থাকেন। এটি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়; বহু দেশের ভাষণের সময়ই এমনটা ঘটে। কেন এমন হয়-এটি বোঝার জন্য জাতিসংঘের অধিবেশনের প্রকৃতি, সময়সূচি, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার এবং প্রতিনিধিদের আচরণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে অনেক দেশের প্রতিনিধি ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত থাকেন, কারণ-তারা নিজেদের দেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক বৈঠক, দ্বিপাক্ষিক মিটিং বা লবিংয়ে ব্যস্ত থাকেন; সব বক্তৃতা তাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়; দুর্বল বা ছোট রাষ্ট্রের বক্তৃতা অনেক সময় কূটনৈতিকভাবে কম জরুরি হিসাবে বিবেচিত হয়।
জাতিসংঘের করিডর আসলে এক ধরনের নাট্যশালা। এখানে প্রতিটি রাষ্ট্রনেতা জানেন-ক্যামেরা আছে, সাংবাদিক আছে, প্রচারের সুযোগ আছে এবং দেশের মানুষের চোখ আছে। তাই করিডরে দাঁড়িয়ে ছবি তোলায় অনেক সময় কূটনীতির চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রদর্শন। একটি ছবি-যেখানে দুই নেতা করিডরে দাঁড়িয়ে হাসছেন। এ ছবিগুলো হয় কয়েক সেকেন্ডের দেখা, আনুষ্ঠানিক সৌজন্য, বা শুধুই পাশ কাটানোর মুহূর্ত। কিন্তু দেশে ফিরে এগুলোকে দেখানো হয় যেন ‘বিশ্বনেতারা আমাদের সঙ্গে গভীর আলোচনা করেছেন। ‘এটাই মানুষের মনে প্রতারণার অনুভূতি তৈরি করে। বিশ্বনেতারা করিডরে ছবি তুললেও তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অবস্থানকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। কারণ ছবির উদ্দেশ্য অনেক সময় কূটনীতি নয়, বরং দেশের মানুষের কাছে ‘গুরুত্বের গল্প’ তৈরি করা। এটি প্রতারণা নয়, কিন্তু প্রতারণার মতো দেখায়। সেই ছবিগুলো সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, আর মানুষের মনে একটি বার্তা পাঠায়-দ্যাখো, আমরা গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের করিডরে তোলা একটি ছবি আলোয় ভরা, হাসিমুখে ভরা, মর্যাদার ভঙ্গিতে ভরা। কিন্তু রাষ্ট্রের বাস্তবতা সেই আলোয় ধরা পড়ে না। বাস্তবতা থাকে মানুষের জীবনে, অর্থনীতির শক্তিতে, নীতির গভীরতায় এবং কূটনীতির ফলাফলে। ছবি দেখাতে পারে গুরুত্বের ভঙ্গি, কিন্তু গুরুত্ব তৈরি করে কাজ।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
