Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শিক্ষকের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট

Advertisement

Icon

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষকের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট

Advertisement

প্রতি বছর ৫ অক্টোবর পৃথিবীজুড়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। এ দিনটি শিক্ষকদের অবদান এবং ভূমিকা স্বীকার করার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল; কিন্তু বাংলাদেশে গত দুই দশকে এ দিনটি একটি ভিন্ন তাৎপর্য লাভ করেছে। এখানে শিক্ষক দিবস শুধু উদ্যাপন নয়, বরং গভীর সংকট এবং নৈতিক প্রশ্নের একটি স্মারক হয়ে উঠেছে। শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থা, পেশাদার নৈতিকতা, রাজনৈতিক সংযুক্তি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন এবং উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষত প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষকদের আচরণ এবং মূল্যবোধের পরিবর্তন সমাজে একটি উল্লেখযোগ্য সংকট সৃষ্টি করেছে; যা আগামী প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষককে ঐতিহ্যগতভাবে ‘জাতি গড়ার কারিগর’ বলা হয়েছে। এ বর্ণনা শুধু একটি সম্মানজনক খেতাব নয়, এটি শিক্ষকের সামাজিক দায়িত্বের একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা। শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের শুধু জ্ঞান প্রদান করা নয়, বরং তাদের চিন্তাভাবনা এবং কর্মের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কল্যাণের পথ দেখানো। একজন শিক্ষকের নৈতিক অবস্থান, তার দূরদর্শিতা, সততা এবং অনুকরণীয় আচরণ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে অপরিসীম প্রভাব ফেলে।

কিন্তু গত তিন দশকে বাংলাদেশে শিক্ষকরা ক্রমশ এ মহৎ উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। তারা শিক্ষকতাকে এখন কেবল একটি চাকরি হিসাবে দেখতে শুরু করেছেন, যেখানে আর্থিক উপার্জন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। এ মানসিকতার পরিবর্তনই বর্তমান শিক্ষা সংকটের মূল উৎস। শিক্ষা এখন আর একটি সামাজিক মিশন নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক লেনদেনে পরিণত হয়েছে। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে আর্থিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন-এ সত্য অবশ্যই স্বীকৃত। অসংখ্য শিক্ষক প্রকৃতপক্ষে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হন। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের বেতন অত্যন্ত সীমিত, যা দেশের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে সমস্যা তখনই গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন শিক্ষকরা এ আর্থিক চাপকে অনৈতিক কাজের ন্যায্যতা হিসাবে ব্যবহার করেন এবং তাদের নৈতিক মূল্যবোধকে ত্যাগ করেন।

বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে একটি ব্যাপক সমস্যা দেখা যাচ্ছে: শিক্ষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লাসরুমে সীমিত পাঠদান করে এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত টিউশনের জন্য বাধ্য করে। এটি শুধু অনৈতিক নয়, এটি শিক্ষার অধিকার লঙ্ঘনের একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। এর ফলে সমাজে একটি দ্বিস্তরীয় শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়েছে-যারা অতিরিক্ত টিউশনের খরচ বহন করতে পারে, তারা ভালো শিক্ষা পায়; আর যারা পারে না, তারা অবহেলিত থাকে। এটি শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও গভীর করে না, বরং শিক্ষার সব নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নীতিকে সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করে।

এখানে একটি যুক্তিসংগত প্রশ্ন উঠবেই-যদি একজন শিক্ষক ক্লাসরুমে পাঠ্যবিষয় সঠিক এবং সম্পূর্ণভাবে শেখাতে না পারেন, তবে কীভাবে যুক্তিসংগতভাবে প্রত্যাশা করা যায়, একই শিক্ষক প্রাইভেট পাঠে শিক্ষার্থীকে আরও ভালো এবং গভীর জ্ঞান প্রদান করবেন? এ প্রশ্নের উত্তর সহজ, কিন্তু মর্মান্তিক-এখানে শিক্ষার গুণমান বৃদ্ধি বা শিক্ষার্থীদের সফলতা প্রধান লক্ষ্য নয়, বরং শিক্ষকের অতিরিক্ত আর্থিক লাভই প্রকৃত উদ্দেশ্য।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও জটিল ও উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের মূল দায়িত্ব অবহেলা করে বিভিন্ন পরামর্শদানকারী সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছেন। এ সংযুক্তি থেকে তারা উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা অর্জন করে থাকেন। একযোগে, এ শিক্ষকরা সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে তাদের প্রকৃত পেশাদার দায়িত্ব এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবেদন পরিত্যাগ করেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং গবেষণা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ সংকটের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা রয়েছে, যা সমান বিপজ্জনক এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। বর্তমানে সব শ্রেণির শিক্ষকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত হয়ে পড়েছেন। যখন একজন শিক্ষক একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের প্রকাশ্য প্রচার করেন, তখন তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি বিভাজন সৃষ্টি করেন, যা অপরিণামদর্শী এবং ক্ষতিকর। ভিন্ন মতাদর্শ বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থক শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানে অবহেলা এবং বৈষম্যের শিকার হন। তাদের নম্বর কৃত্রিমভাবে কমানো হয়, বৃত্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং অন্যান্য একাডেমিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়।

আরও গুরুতর বিষয় হলো, কিছু শিক্ষক তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য শিক্ষার্থীদের তোষামোদ করেন এবং তাদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অংশীদার এবং কর্মীতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেন। তারা সংবেদনশীল শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম এবং সংগঠনের মাধ্যমে তাদের আদর্শে নিয়োজিত করে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিণত হয় সংঘাতের ক্ষেত্রে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং মানসিক বিষাক্ততা এ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে প্রকৃত শিক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হয়।

একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা এখানে নজিরবিহীনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, তা হলো-শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব কী হওয়া উচিত। শিক্ষকদের অন্যতম নোবেল দায়িত্ব ছিল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য আর্থিক এবং সামাজিক বৈষম্য রয়েছে, তা ক্রমাগত হ্রাস করার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা। শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক গতিশীলতা নিশ্চিত করা, গরিব পরিবারের শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ পরিবারের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমান সুযোগ প্রদান করা এবং এ অসমতা দূর করার জন্য তাদের সচেতন এবং সংবেদনশীল করা শিক্ষকদের অবিচ্যুত কর্তব্য।

কিন্তু শিক্ষকরা যখন নিজেরাই অসংগতিপূর্ণ আচরণ, অনৈতিক কাজ এবং বৈষম্যমূলক অনুশীলনে লিপ্ত হন, তখন তারা এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু ব্যর্থ হন না, বরং সমাজের বিভাজনকেই আরও গভীর এবং স্থায়ী করে তোলেন। একটি সমাজ কখনো সত্যিকারের স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ এবং সুসংগত হতে পারে না, যদি তার জাতি-নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার এবং সচেতনতা বৃদ্ধিকারী শ্রেণি, যারা শিক্ষক-তাদের নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানবিক আদর্শ পরিত্যাগ করে। শিক্ষকদের অসততা শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে না, সমগ্র সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। এ সংকট থেকে বের হয়ে আসার জন্য একটি দ্বিমুখী এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন, যা শিক্ষক এবং রাষ্ট্র উভয় পক্ষের নৈতিক প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করে। প্রথমত, শিক্ষকদের নিজেদের গভীর পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে এবং বুঝতে হবে যে, তারা সমাজে একটি স্বতন্ত্র এবং দায়িত্বশীল অবস্থানে রয়েছেন। তাদের নৈতিকতার সঙ্গে আপস না করার জন্য একটি দৃঢ় এবং অটুট সংকল্প নিতে হবে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের একটি পবিত্র শপথ গ্রহণ করা উচিত যে, তারা অসংগতিপূর্ণ, অনৈতিক এবং বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড থেকে পুরোপুরিভাবে বিরত থাকবেন এবং শিক্ষকতার প্রকৃত চেতনা ও উদ্দেশ্য ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র এবং সরকারের দায়িত্ব হলো, শিক্ষকদের যথাযথ এবং ন্যায্য আর্থিক পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, যাতে তারা অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে অনৈতিক পথে না যান। বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের উদাহরণ এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে-তারা অত্যন্ত স্বল্প বেতনে কাজ করার পরও মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান করে থাকেন, অনেক ক্ষেত্রে এবং নৈতিকতার সঙ্গে আপস করেন না। এটি দেখায় যে, আর্থিক সংকট শিক্ষকদের অনৈতিক হওয়ার একটি অনিবার্য বা ন্যায্য কারণ নয়। রাষ্ট্রকে শিক্ষকদের অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সুরক্ষা দিতে হবে এবং তাদের কেবল শিক্ষা এবং সংস্কৃতি প্রচারে নিয়োজিত থাকতে উৎসাহিত ও বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে যে প্রকট বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রকৃত এবং গভীর অর্থ শুধু শিক্ষকদের প্রশংসা বা সম্মান প্রদর্শন করা নয়, বরং তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা, নৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং শিক্ষার মহৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। এ বছরের শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের এবং রাষ্ট্রের উচিত পারস্পরিক দায়িত্ব এবং প্রতিশ্রুতির একটি নতুন এবং শক্তিশালী চুক্তি স্থাপন করা। শিক্ষকরা তাদের পেশাদার নৈতিকতার প্রতি অটুট থাকার শপথ নেবেন এবং রাষ্ট্র তাদের যথাযথ সম্মান, সুরক্ষা এবং আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। এ পারস্পরিক এবং প্রামাণিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমই শুধু শিক্ষকতা পেশা তার হারানো সামাজিক মর্যাদা এবং আস্থা ফিরে পেতে পারে এবং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সত্যিকারের একটি মানবিক এবং প্রগতিশীল পুনর্জাগরণ অর্জন করতে পারে।

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন : সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা

জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা

শিক্ষকের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট

শিক্ষকের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট

সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন : বাস্তবতায় পৌঁছানোর পথ

সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন : বাস্তবতায় পৌঁছানোর পথ

হালফিল বয়ান সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম