মুক্তিসংগ্রামের দিনগুলো
Advertisement
সৈয়দ হাসান ইমাম
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে পাকিস্তান সরকার।
তখন ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সরকার গঠন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। একই সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালানোর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রও করতে থাকে।
‘বেলুচিস্তানের কসাই’ হিসাবে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করা হয়। কিন্তু কোনো বাঙালি বিচারপতি তাকে শপথবাক্য পাঠ করাতে রাজি হননি।
এ সময়ে পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আমন্ত্রণে ঢাকা সফরে এসেছিলেন। সফরে ভুট্টোর সঙ্গে এসেছিলেন তারেক আজিজ নামে পাকিস্তানের এক অভিনেতা। তার সঙ্গে আমি একটি চলচ্চিত্রে কাজও করেছিলাম।
ছবির নাম ছিল ‘কসম উস ওয়াক্ত কি’। সফরকালে তারেক আজিজ আমার বাড়ি এসেছিলেন। কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘ইয়ার, তুম লোগো কো সাথ হাম লোগ নেহি জায়েঙ্গে।’
তখনো কিন্তু আলোচনা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। তখনো আমরা ভাবছি সংকট নিরসন হবে। প্রেসিডেন্ট হাউসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মিটিং চলছে।
সে সময়েই তারেক আজিজ আমাকে কথাটি বলেছিলেন। তার মানে আলোচনার নামে তারা যে সময়ক্ষেপণ করছিল, এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। আমি সেদিনই ৩২ নম্বরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সব জানিয়ে এসেছিলাম।
দুই
১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন ঘোষণা দিলেন অসহযোগ আন্দোলনের, তখনই বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের পক্ষ থেকে আমরা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করি। কোনো শিল্পী রেডিও-টেলিভিশনে যান না। সংবাদপাঠকও যান না।
পাকিস্তান সরকার রেডিও-টেলিভিশন চালাতে পারছিল না। রেডিও তবুও কিছু কিছু চলছিল। কেননা রেকর্ডিং সুবিধা ছিল; কিন্তু টেলিভিশনে কোনো রেকর্ডিং সুবিধা ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালিদের অসহযোগিতার কারণে পাকিস্তানিদের পক্ষে টেলিভিশন আর চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। সিংহভাগ কলাকুশলী কাজে যোগ দেন না।
তখন ক্যান্টনমেন্ট থেকে আধা বাংলা, আধা উর্দু মেশানো লোকজন নিয়ে এসে তাদের দিয়ে ঘোষণা দেওয়াচ্ছিল পাকিস্তান সরকার। তাদের এই হাস্যকর কাজের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষ বুঝতে পারছিল, বাঙালিরা তাদের সঙ্গে আর নেই। আর বাঙালিরা না থাকলে টেলিভিশন ঘোষণাও হাস্যকর বস্তুতে পরিণত হয়।
এ অবস্থায় পাকিস্তান সরকার খুব বিপদে পড়ল। সাতই মার্চ বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বললেন- ‘বেতার চলবে, টেলিভিশন চলবে।’ ওইদিনই বিকালে আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম তার বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে।
আমি, ওয়াহিদুল হক, আতিকুল ইসলাম এবং গোলাম মুস্তাফা। আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তখন সবকিছুই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলছিল। তিনি যা বলেছেন, বাঙালি তা-ই করেছে। ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ কেউ শোনে না।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই চূড়ান্ত। আমাদের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘যদি তোদের কথামতো চলে তাহলে যোগ দিবি, না হলে যোগ দিবি না।’
এ কথা বলে তিনি ফোন করলেন জহুরুল হক সাহেবকে। তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। তাকে বললেন- ‘আমার ছেলেরা যাচ্ছে, তাদের কথামতো যদি বেতার-টেলিভিশন চালাতে সম্মত হন, তাহলে এগুলো অসহযোগের আওতামুক্ত থাকবে, না হলে অসহযোগ চলবে।’
আমরা বঙ্গবন্ধুর কথামতো ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর থেকে বিশ নম্বরে (যেখানে জহুরুল হক সাহেব থাকতেন) গেলাম। তিনি আমাদের কথা শুনে নিজের ঘরে গিয়ে রাওয়ালপিণ্ডির সঙ্গে কথা বললেন।
ফিরে এসে আমাদের জানালেন- ‘ঠিক আছে, আপনাদের হাতে বেতার-টেলিভিশনের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারি, যদি আপনারা দুটো শর্ত মানেন। এক. পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবেন না এবং দুই. পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবেন না।’
আমরা তখন তার টেলিফোন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে শর্তগুলোর কথা জানালাম। বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন, শর্ত দুটো মেনে যেন আমরা টেলিভিশন আর বেতার দখল করি।
এ ঘটনাটি আমাদের ইতিহাসে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। তবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। কারণ ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে তারা বেতার-টেলিভিশন আমাদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় জনতার আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের জোরে।
এরপর আমরা বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের পক্ষ থেকে টেলিভিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে একটি কমিটি করে দিই মুস্তাফা মনোয়ারকে প্রধান করে। অন্যদিকে রেডিওতে আশরাফুজ্জামান সাহেবকে প্রধান করে আরেকটি কমিটি করে দেওয়া হয়।
এ দুই কমিটি ৮ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অসাধারণ সব অনুষ্ঠান করেছে। সেই অনুষ্ঠানগুলোর কথা সে সময়ের মানুষের হয়তো মনে আছে।
তিন
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ক্র্যাকডাউন হলো। ২৭ মার্চ কারফিউ ছাড়ল। গোলাম মুস্তাফা তখন তার মেয়ে সুবর্ণা মুস্তাফা, ক্যামেলিয়া মুস্তাফা, ছেলে সুমিত ও ভাবিকে নিয়ে গাড়িতে করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমার বাড়ির গেটে গাড়ি থামিয়ে বলেছিল, ‘তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ছেড়ে চলে যাও, পাকিস্তান আর্মি তোমাকে খুঁজছে।’
পাকিস্তান আর্মি তখনো আমার ঠিকানা জোগাড় করতে পারেনি। এক বাঙালি আর্মির ছেলে গোলাম মুস্তাফাকে এসে বলেছিল, তাড়াতাড়ি যেন আমাকে খবরটি দেয়।
আমি তখন বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে গিয়ে শান্তিনগরে আমার ফুপুর বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। সেখান থেকে দেখছি বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে পাকিস্তান আর্মি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন ২৫ মার্চ রাতেই। সেটা রেডিওতে প্রচারও হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটিই বারবার অনেকে পড়েছেন, যেন মানুষ জানতে পারে।
আমাকে তখন পাকিস্তান আর্মি খুঁজছে শুনে অনেকেই আমার খোঁজখবর নিলেন। তখন গোলাম রব্বানী খোঁজ নিতে এসেছিল। আমার বড় ভাই ও রব্বানী দুজনে মিলে রাস্তাটা পরিষ্কার আছে কিনা সেটা দেখার জন্য আমার গাড়ি নিয়ে মিরপুরের দিকে গেল।
আমরা তখন শুনছিলাম, মিরপুরের অবাঙালিরা বাঙালিদের হত্যা করছে। তখন আমার একমাত্র মেয়ে সঙ্গীতার বয়স আড়াই বছর। ওকে নিয়ে আমি, আমার মা, আমার স্ত্রী, আমার বড় ভাই ও রব্বানী- আমরা বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে গেলাম সাভারের ফুলবাড়িয়ায়।
সেখানে আমাদের নানির বাড়ি (আবুল হাশিম সাহেবের বোন)। তখনই রব্বানীর মাধ্যমে ওয়াহিদুল হক সাহেব খোঁজ পেলেন, আমি ওখানে আছি। তখন তারা সাভারের ফুলবাড়িয়ায় এলেন। তারা আসার পর আমরা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে গেলাম।
আমার স্ত্রী, কন্যা ও মা সেখানে রইলেন। আমার কাছে পঞ্চাশ টাকা ছিল। পঁয়ত্রিশ টাকা আমার স্ত্রীকে দিয়ে পনেরো টাকা আমার পকেটে নিয়ে আমি রওনা দিলাম মুক্তিযুদ্ধে। একটি লুঙ্গি, গেঞ্জি আর এক সেট পাজামা-পাঞ্জাবি নিয়ে চলে গেলাম। আরিচা ঘাটে গিয়ে দেখলাম কোনো নৌকা নেই।
শুধু একটি লঞ্চ আছে। লঞ্চে করেই নদী পার হলাম। ওপারে গিয়ে দেখি বাংলাদেশ স্বাধীন। সব ছেলে দোনলা বন্দুক কাঁধে নিয়ে ঘাট পাহারা দিচ্ছে। যেহেতু আমি চলচ্চিত্রের নায়ক ছিলাম, তাই আমাকে সবাই চিনতেন।
আমরা মাগুরা যাব বলে ঠিক করেছিলাম। মাগুরায় তখন তরুণ সিএসপি অফিসাররা মিলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একটি সংগঠন করেছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানি উপদেষ্টা), নড়াইলের এসডিও কামাল সিদ্দিকী (এক সময় খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ছিলেন), আরেকজন এসডিও ছিলেন ওয়ালিউর রহমান (সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনীতিক), ঝিনাইদহ পুলিশের প্রধান এসপি মাহবুবসহ (স্বাধীন দেশে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবে ভূষিত) আরও অনেকে।
তাদের এই সংগঠনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। তাই আমরা মাগুরা যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম। মাগুরা পৌঁছে ওদের সঙ্গে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হলাম।
চার
এরপর গেলাম কলকাতায়। কলকাতায় এসে আমরা মোট পাঁচজন গিয়ে উঠেছিলাম পার্ক সার্কাসের চার নম্বর পুলের কাছে আমার মেজ মামা মনসুর হবীবুল্লাহর বাড়িতে। পরবর্তী সময়ে চারতলা বাড়ির চতুর্থ তলাটি তিনি আমাদের জন্য ছেড়ে দেন।
সেখানে আমি মুক্তিযুদ্ধের একটি ট্রানজিট ক্যাম্প করেছিলাম। তখন বাংলাদেশ থেকে আমার পরিচিত বা অপরিচিত যারা যেতেন, তাদের মধ্যে অনেকেই প্রথমে এই ক্যাম্পে এসে দু-তিন দিন থাকতেন। পরে তারা নিজেদের মতো কোনো একটি ব্যবস্থা করে নিতেন। এই ট্রানজিট ক্যাম্পে প্রাথমিকভাবে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।
বিমানবাহিনীর একে খোন্দকার, সেনাবাহিনীর খালেদ মোশাররফ ও শাফায়েত জামিল, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের জহির রায়হান, মুস্তাফা মনোয়ার, আলমগীর কবীর, ওয়াপদার কিছু প্রকৌশলী- এরকম অনেক মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
একাত্তর সালের অক্টোবর পর্যন্ত এটি ট্রানজিট ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। পরে ওয়াপদার যে প্রকৌশলীরা উঠেছিলেন, শুধু তারাই থাকতেন।
মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর আমরা তাজউদ্দীন সাহেবকে জানালাম, আমাদের একটি বেতার দরকার। তিনিও সেটি উপলব্ধি করলেন। তখন একটি ট্রান্সমিটার দেওয়া হলো, যেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
সেটি বর্ডার এলাকায় বা অন্য কোনো জায়গায় হয়তো ছিল; কিন্তু আমরা জানতাম না। তবে এটি অনেক শক্তিশালী ট্রান্সমিটার ছিল। ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েবের এই ট্রান্সমিটারটি দিয়েই আমরা সম্প্রচার করেছিলাম অসাধারণ সব অনুষ্ঠান।
আমাদের শুধু একটি ঘর দেওয়া হলো বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। সুচিত্রা সেনের বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িটা। এ বাড়িতেই আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলাম।
২৫ মে (বাংলা ১১ জ্যৈষ্ঠ) কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনটিকেই প্রথম অনুষ্ঠান সম্প্রচারের দিন হিসাবে ধার্য করা হয়েছিল। ওইদিন থেকেই আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করলাম।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করা ছাড়াও আমাকে নাটকের দায়িত্ব দেওয়া হলো। প্রথম ২৪ বা ২৬ জনকে তাজউদ্দীন সাহেব একটি নিয়োগপত্র দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমি, কামাল লোহানী, আশরাফুর রহমান, বেলাল মোহাম্মদসহ কয়েকজন নিয়োগপত্র পেয়েছিলাম। আমাকে প্রথমে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সংবাদ ও নাট্য বিভাগের।
পরে যখন সাংবাদিকরা যোগ দিলেন, তখন সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হলো কামাল লোহানীকে। আমি নাটক ও কথিকা বিভাগের দায়িত্ব পালন করলাম।
আমার নাম ছিল ‘সালেহ আহাম্মেদ’। এ নামেই আমি খবর পড়তাম। আর কলকাতায় যে কাজগুলো করতাম, সেগুলো হাসান ইমাম নামেই করতাম। এভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়টা কেটেছে।
এ সময় আমরা একটি সংগঠন করলাম, যার নাম ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী ও কলাকুশলী সমিতি’। এর সভাপতি ছিলেন জহির রায়হান এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলাম আমি। এ সংগঠনের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের অনেক বড় একটি কাজ করা হয়েছিল। জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ (১৯৭১) প্রামাণ্যচিত্রটি এ সংগঠনের পক্ষ থেকেই প্রযোজনা করা হয়েছিল।
আমি তখন ইস্টার্ন ইন্ডিয়ান মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ইম্ফা) সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি বরাদ্দ পাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ প্রতিষ্ঠানটি আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছিল। ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্রটি যখন করা হলো, তখন তারা ১৬ হাজার টাকা দিয়েছিল।
এ টাকা দিয়েই আমরা ছবিটি বানিয়েছিলাম। জহির রায়হান পরিচালনা করেছিলেন। এর জন্য বিনা পয়সায় আমাদের একটি ক্যামেরা দিয়েছিলেন ভারতের বিখ্যাত প্রামাণ্য চিত্রনির্মাতা হরিসাধন দাশগুপ্ত। সম্পর্কে তিনি ছিলেন অপর্ণা সেনের মামাশ্বশুর।
‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটির ইংরেজি ন্যারেশন লিখেছিলেন আলমগীর কবির, পাঠও করেছিলেন তিনি। আর বাংলা ন্যারেশনটি পাঠ করেছিলেন আলী যাকের। এতে আমি একটি চরিত্রের ডাবিং করেছিলাম। আওয়ামী লীগের একজন এমপির একটি বক্তৃতা ছিল। তার বাংলাটুকু আমি ডাবিং করেছিলাম।
পাঁচ
তখন শেরপুরের এক সিনেমা হলের মালিক জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটি কলকাতা নিয়ে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে আগে তার হলে ছবিটি চলছিল। খবর পেয়ে আমরা খোঁজ নিয়ে ছবিটি উদ্ধার করলাম। উদ্ধার করে জহির রায়হান তখন ছবিটি বাংলাদেশ সরকারকে দান করলেন। তখন জহিরেরও টানাটানি, আমাদেরও টানাটানি; কিন্তু জহির এসব ভাবলেন না।
ছবিটি মুজিবনগর সরকারকে দান করলেন। কারণ, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতবর্ষে ছবিটি মুক্তি দিয়ে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য সরকারকে দেওয়া হবে।
এ সময় কলকাতার একটি মিনি সিনেমা হলে ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটির প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। সেখানে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়সহ আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
ওয়াহিদুল হক সাহেব, সন্জীদা খাতুন, মুস্তাফা মনোয়ার ও আমি মিলে আরেকটি ইউনিট করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সময়, যার নাম ছিল ‘মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’। এ ইউনিটের চিত্রায়ণই হচ্ছে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫) প্রামাণ্যচিত্রটি। এটি তখন ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন মার্কিন প্রামাণ্য চিত্রনির্মাতা লিয়ার লেভিন।
এ সময় আমাদের একটি গীতি-আলেখ্য অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল- ‘রূপান্তরের গান’। এটি লিখেছিলেন শাহরিয়ার কবির। মঞ্চ পরিকল্পনা, পোশাক পরিকল্পনা ও আলোকসম্পাতের কাজটি করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। বিভিন্ন শিবির ঘুরে ঘুরে আমরা এটি করতাম।
এর মূল বক্তব্য ছিল- আমাদের ওপর পাকিস্তানিরা যে বীভৎস অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে তার একটি ধারাবাহিক বর্ণনা। ধারাবর্ণনাটি করতাম আমি আর গানগুলো গাইতেন শিল্পীরা।
ছয়
২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ দেশে ফিরে এলাম। ২৩ ডিসেম্বর প্রেস ক্লাবে বসে আমরা একটি কমিটি গঠন করেছিলাম, যার নাম ছিল ‘বুদ্ধিজীবী-নিধন তথ্যানুসন্ধান কমিটি’। জহির রায়হান ছিলেন এ কমিটির আহ্বায়ক। আমি ছিলাম সদস্য।
সদস্য হিসাবে আরও ছিলেন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, এনায়েতুল্লাহ খান, সাহিত্যিক আলাউদ্দীন আল আজাদ ও ড. সিরাজুল ইসলাম। কমিটির প্রথম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৎকালীন খবরের কাগজে আমরা একটি ঘোষণা দিয়েছিলাম।
ঘোষণায় বলা হয়েছিল- ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বন্দিশিবিরে যারা উদ্ধার তৎপরতা করছেন, তারা যেসব দলিল-দস্তাবেজ বা কাগজপত্র পাবেন, তা আমাদের কাছে এনে জমা দিন।’
তখন কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়াটা খুব শঙ্কার ছিল। কারণ তখনো অনেকের হাতে অস্ত্র ছিল। রাজাকার, আলবদররা অনেকেই তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। বিজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হওয়ার পর বহু কাগজপত্র আমাদের কাছে জমা পড়েছিল।
এ কাজ করতে করতেই জহির রায়হান হারিয়ে গেলেন। মিরপুরে অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই তিনি অবাঙালি রাজাকারদের হাতে নিহত হন।
কমিটির আহ্বানে যেসব কাগজপত্র পাওয়া গিয়েছিল, তার একটি তালিকা তৈরি করলাম আমরা। এ তালিকাসহ দুই ট্রাঙ্কভর্তি কাগজপত্র আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন নূরুল মোমেন চৌধুরী ছিলেন এনএসআইয়ের প্রধান। তার ডাকনাম ছিল মিহির।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জেলে ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বরে জেল ভেঙে যখন বন্দিদের বের করা হয়েছিল, তখন তিনিও বেরিয়ে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু কাগজপত্র মিহিরের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমির উল্টো দিকে যে অফিসটি, ওখানে এসেই আমরা মিহিরের কাছে দুই ট্রাঙ্কভর্তি কাগজপত্র জমা দিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরই তাকে লন্ডনে বদলি করে দেওয়া হলো।
কারণ লন্ডনে গোলাম আযম এবং মুসলিম লীগের অনেকে মিলে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ করে ইংল্যান্ডে ও মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানাবিধ মিথ্যা প্রচার শুরু করেছিল। মিহির চলে যাওয়ার পর এটা আর আমরা পাইনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিলাম; কিন্তু ওই ট্রাঙ্কের কোনো হদিস আর পাইনি।
আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস কেবল নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধই নয়, এর সঙ্গে বাংলার মানুষের দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাসও সম্পৃক্ত।
তাই মুক্তিযুদ্ধকে জানতে হলে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস জানতে হলে নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে কীভাবে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এই মুক্তিসংগ্রামের সূচনা করেছিল। এই ইতিহাসই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রক্ষাকবচ।
সৈয়দ হাসান ইমাম : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
