Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

৭ নভেম্বরের অনুপ্রেরণায় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে

Icon

চিন্ময় মুৎসুদ্দী

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সকালে আবার শোনা গেল জিয়ার কণ্ঠস্বর। এর প্রায় চার বছর আগে স্বাধীনতার ঘোষণায় তিনি ছিলেন মেজর জিয়া। এবার মেজর জেনারেল জিয়া। তিন নভেম্বর থেকে প্রায় চারদিন গৃহবন্দি থাকার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিকরা তাকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছেন শাহবাগে বাংলাদেশ বেতার ভবনে। সেখানে দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি : বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং অন্যদের অনুরোধে আমাকে সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও সেনাবাহিনী প্রধান হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে। এ দায়িত্ব ইনশাআল্লাহ আমি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আপনারা সবাই শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুন। দেশের সর্বস্থানে-অফিস-আদালত, যানবাহন, বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও কল-কারখানাগুলো পূর্ণভাবে চালু থাকবে। আল্লাহ আমাদের সবার সহায় হোন। খোদা হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’ ৭ নভেম্বর আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষ আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সংহত করেছেন। সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণ নভেম্বরের জাগরণকে অভিনন্দিত করেছেন এবং জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় ৭ নভেম্বরের স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণকে বিশেষ রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করে দেশপ্রেমিক সৈনিক ও জনগণের ভেতর বিভেদ সৃষ্টি করে দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার এক অশুভ তৎপরতায় লিপ্ত হয়। সেই পরিস্থিতিতে এ দেশের সব দেশপ্রেমিক মানুষের কাছে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।

দেশের এ পরিস্থিতিতে সেদিন সকাল-সকাল অফিসে যাওয়ার পথে শাহবাগের মোড়ে দেখলাম সেনাবাহিনীর কয়েকটি পিকআপ দাঁড়ানো আর সৈনিকরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। কোনো কোনো সৈনিক স্ন্যাক্সের দোকান থেকে কোমল পানীয়ের বোতল নিচ্ছেন। আমি রিকশা থামিয়ে স্ন্যাক্সের দোকানের সামনে গেলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বুঝলাম সৈনিকরা পানীয়ের দাম পরিশোধ না করে চলে যাচ্ছেন। দোকানের কর্মীরা কিছুটা মন খারাপ করেছেন। সৈনিকদের হাতে অস্ত্র, আমিও সৈনিকদের সঙ্গে কোনো কথা বললাম না। আমার মনে আছে আমাদের এক বন্ধু সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরামর্শ দিয়েছিলেন সৈনিকদের সঙ্গে যেন কোনো তর্কে না জড়াই। প্রয়োজন মনে করলে অফিসারের খোঁজ করি। কিন্তু এখানে কোনো অফিসার ছিলেন না। এখান থেকে আমি দ্রুত অফিসের দিকে যাই। অফিসে তখন অনেকেই এসেছেন। শাহাদত ভাইকে (শাহাদত চৌধুরী) ব্যাপারটা বললাম। আমরা মনে করলাম এ ঘটনার কথা ক্যান্টনমেন্টে পদস্থ কাউকে বললে ভালো হয়। অনেক চেষ্টার পর এক বন্ধু সেনা অফিসারকে ফোনে এ ঘটনার কথা জানানো হলো। ঘণ্টাখানেক পর রেডিওতে ঘোষণা শুনলাম সৈনিকদের ব্যারাকে ফেরার এবং স্ব স্ব ইউনিটে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষ করলাম সড়কে সেনাদের ট্রাক ও পিকআপ প্রায় নেই বললেই চলে। অবশ্য সেনা সদরের আনুষ্ঠানিক নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সন্ধ্যার কিছু পর থেকেই অফিসারদের নেতৃত্বে শহরে সেনা টহল শুরু হয়। ঢাকার ১৩টি থানায় রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত জারি করা হয় সান্ধ্য আইন। ৭ নভেম্বরের বাংলাদেশ। আমাদের ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ দিন। এইদিন ঢাকার রাজপথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী আমাদের বীর সৈনিকরা। কণ্ঠে তাদের স্বাধীনতা রক্ষার প্রত্যয়ধ্বনী। সৈনিকদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে কাতারবন্দি হয় সব মানুষ। সিপাই-জনতার সেই মিলিত মিছিল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে দেখা দেয়। ২০০ বছরের পরাধীনতার শিকল প্রথম ভাঙে ৪৭ সালে। ৭১ সালের জনযুদ্ধে সেই আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার ঘটে পূর্ণতা। তবু থেকে যায় আধিপত্যের কালোছায়া। তাই তো ৭৫ সালের ৭ নভেম্বর প্রত্যুষে বেতার তরঙ্গে ধ্বনিত হয় : ‘জিয়া বলছি’-নতুন আহ্বান, নতুন ডাক। আরও একবার আরও এক প্রেক্ষাপট রচনা করলেন এ সমরনায়ক। এ প্রেক্ষাপটে তিনি শামিল হলেন জনগণের কাতারে। আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের নায়ক হিসাবে এসে দাঁড়ালেন সমগ্র জাতির সঙ্গে, জড়িত হলেন রাষ্ট্রপরিচালনায়’।

আমরা সাপ্তাহিক বিচিত্রার পরবর্তি সংখ্যার জন্য প্রস্তুতি শুরু করি। সেটি প্রকাশের তারিখ ১৪ নভেম্বর। দুপুরেই আলোচনা হলো পুরো ব্যাপারটি নিয়ে। জিয়ার নেতৃত্বে ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লব নিয়েই হবে প্রচ্ছদ কাহিনি। যেহেতু তিনদিন পর লেখা জমা দিতে হবে, ঘটনার পর্যবেক্ষণে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া হলো। ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে ৭ নভেম্বর-এ নিতান্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ অতিক্রম করে এসেছে ইতিহাসের দীর্ঘ পথ। বাংলাদেশে ইতিহাস দ্রুত বদলায়, জনগণের ইচ্ছাগুলো অজ্ঞাতভাবে জয়ী হয়ে ওঠে শত্রু-মিত্র নির্ভুলভাবে চিহ্নিত হয়ে যায়। সময়ের এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ দেশের মানুষ রাজনৈতিক সচেতনতার যে পরিচয় দিয়েছিলেন, তা তুলনাহীন। এ দেশের মানুষ কখনো ভুল করে না-আগস্টের এবং নভেম্বরের প্রবহমান ঘটনাস্রোত তা নতুনভাবে প্রমাণিত করেছিল। ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে সেদিন বাংলাদেশের মানুষ বলতে চেয়েছে, কারও আধিপত্য সে মানতে রাজি নয়, আপন সম্পদের ওপর সে সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, জগৎসভায় সে সক্রিয় জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণে সংকল্পবদ্ধ। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর এ সময়ের মধ্যে বাঙালি জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের সংগ্রাম উপনীত হয় গুণগতভাবে এক নতুন স্তরে। ৩ নভেম্বরের চক্রান্ত ব্যর্থ হলেও তাদের অপচেষ্টা অব্যাহত থাকে। এ জন্য জোর দেওয়া হয় জাতীয় ঐক্যের ওপর। ১১ নভেম্বর ১৯৭৫ তাই জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত এক ভাষণে সেনাবাহিনী প্রধান এবং উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বললেন, ‘আজ জাতির সামনে সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হচ্ছে জনগণের মধ্যে ঐকমত্য, সামরিক বাহিনীর মধ্যে একতা এবং প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী মহল ভুয়া পরিচয় দিয়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর নামে জনগণকে হয়রানি করারও চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা জনগণের মধ্যে নিরাপত্তার অভাব এবং হতাশা সৃষ্টির হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সমাজের সর্বস্তরের জনগণের কাছে আমার আজ বিশেষ অনুরোধ আপনারা এ ষড়যন্ত্রকারীদের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখবেন।

মনে রাখতে হবে, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরে জাতির আশা-আকাক্সক্ষা যেভাবে প্রকাশ পেয়েছিল এবং যে একতা ও সংহতির নজির স্থাপিত হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের সব অপচেষ্টাকে সামরিক বাহিনী ও দেশবাসী ধ্বংস করে দেবে, এটা আমার দৃঢ় সংকল্প’। বয়োবৃদ্ধ জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১২ নভেম্বর ১৯৭৫ এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি প্রদান করে বলেন, একটি প্রবল শক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশের স্বাধীনতার প্রতি বৈরীভাবাপন্ন শক্তিগুলো যখন তৎপর, তখন দেশবাসীকে তিনি নীরব দর্শক সেজে না থাকার আহ্বান জানান।

৫১ বছর পর আবার নতুন করে ৭ নভেম্বরের শপথে বলীয়ান হতে হবে সব দেশপ্রেমিক জনগণকে, কারণ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটলেও একটি প্রবল শক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। বিভিন্ন দাবিদাওয়ার নামে গত কয়েক মাসে কারও কারও নানাবিধ তৎপরতা সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। জিয়ার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সব দেশপ্রেমিক জনগণ তাই আবার বলছেন ‘আমাদের মাটিতে মীরজাফরদের কোনো স্থান নাই।’

চিন্ময় মুৎসুদ্দী : সিনিয়র সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও বিপদের যোগসূত্র

বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও বিপদের যোগসূত্র

৭ নভেম্বরের অনুপ্রেরণায় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে

৭ নভেম্বরের অনুপ্রেরণায় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে

নগরের সংকট : সঠিক পরিকল্পনাই মূল চাবিকাঠি

নগরের সংকট : সঠিক পরিকল্পনাই মূল চাবিকাঠি

অর্থ কি আসলেই অনর্থের মূল

অর্থ কি আসলেই অনর্থের মূল

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম