নগরের সংকট : সঠিক পরিকল্পনাই মূল চাবিকাঠি
তৌফিক মহিউদ্দীন
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের নগরসংকটের মূল কারণ টাকার অভাব নয়, পরিকল্পনার কোনো আইনি ও আর্থিক বাধ্যবাধকতা না থাকা। যতদিন পৌরসভার বাজেট আর উন্নয়ন অনুদান গেজেটভুক্ত, নাগরিকের অংশগ্রহণে তৈরি পরিকল্পনার সঙ্গে বাঁধা না হবে, ততদিন প্রতিটি নতুন রাস্তা, বাজার আর ড্রেন আগামীর সংকটই তৈরি করবে। তাই পরিকল্পনাকে ‘কাগজের মাস্টার প্ল্যান’ থেকে বাজেট-বাঁধা, বাধ্যতামূলক স্থানীয় চুক্তিতে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিনিয়োগ।
সকাল সাড়ে ৭টা। মাদারীপুর বা নওগাঁর কোনো এক পৌরসভার গলিতে এক মা হাঁটুসমান পানি ভেঙে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন। গত বছর নতুন পাকা রাস্তা হয়েছে, কিন্তু পানি নামার পথ রাখা হয়নি; পাশের খালটি এখন মার্কেট। এ ছবি কোনো নির্দিষ্ট একটি শহরের নয়, বাংলাদেশের শতাধিক পৌরসভার দৈনন্দিন সত্য। ৮ নভেম্বর বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস; এবারের প্রতিপাদ্য ‘গ্রেট কমিউনিটিজ আর বিল্ট অন প্ল্যানিং’, অর্থাৎ ভালো জনপদ গড়ে ওঠে পরিকল্পনার ওপর। ১৯৪৯ সালে আর্জেন্টিনার অধ্যাপক কারলোস মারিআ দেলা পাওলেরার হাতে শুরু হওয়া এ দিবস আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় : আমরা কি শহর গড়ছি, নাকি শুধু অবকাঠামো জমাচ্ছি?
অপরিকল্পিত নগরায়ণের দাম দিচ্ছে সাধারণ মানুষ
জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটিরও বেশি, এখন শহরে থাকেন। অথচ দেশের প্রায় ৩৩০টি পৌরসভার বেশির ভাগের হয় কোনো গেজেটভুক্ত মাস্টারপ্ল্যান নেই, নয়তো তা এলজিইডির আলমারিতে পড়ে আছে। পৌরসভাগুলোয় নগর পরিকল্পনাবিদের পদ হয় নেই, নয়তো ফাঁকা। ফলে রাস্তা হয় কাউন্সিলরের পছন্দে, ড্রেন হয় ঠিকাদারের সুবিধায়, আর খাল ভরাট হয় নিঃশব্দে।
এ উদাসীনতার অর্থনৈতিক মাশুল বিশাল। বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের ‘টুওয়ার্ড গ্রেট ঢাকা’ প্রতিবেদনের হিসাবে, ১০ বছরে ঢাকার গাড়ির গড় গতি ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমেছে, আর যানজটে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পরিকল্পনার ব্যর্থতা শুধু সময় কেড়ে নেয় না, জীবনও নেয়। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে ১,১০০-এর বেশি শ্রমিক মারা যান; ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেইলি রোডে একটি ভবনের আগুনে প্রায় ৪৬ জন নিহত হন। দুটি ঘটনাতেই ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার আর প্রকৃত ব্যবহারের ফাঁক প্রধান কারণ হিসাবে উঠে এসেছে।
আমাদের পরিকল্পনা দলিলের অভাব নেই। রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ ২০১৬-২০৩৫, ২০২২ সালে গেজেটভুক্ত), বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ কোড (বিএনবিসি) ২০২০, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০, সবই আছে। অভাব সেই সেতুর, যা পরিকল্পনাকে পৌরসভার বাজেট আর নাগরিকের উঠানে পৌঁছে দেয়। একটি পূর্ণাঙ্গ নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন বহু বছর ধরে খসড়া অবস্থাতেই আটকে আছে।
অথচ পাশের দেশগুলো দেখিয়েছে, পরিকল্পনা তখনই কাজ করে, যখন তা টাকা আর মানুষের সঙ্গে বাঁধা। কেরালার ১৯৯৬ সালের ‘গণপরিকল্পনা অভিযানে’ রাজ্যের পরিকল্পনা বাজেটের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ সরাসরি স্থানীয় সরকারকে দেওয়া হয়, শর্ত ছিল গ্রামসভায় আলোচিত পরিকল্পনা। গুজরাটের আহমেদাবাদ ‘টাউন প্ল্যানিং স্কিম’ বা ভূমি পুনর্বিন্যাস পদ্ধতিতে জমির মালিকদের উচ্ছেদ না করেই জমির একটি অংশ নিয়ে রাস্তা, পার্ক ও স্বল্পমূল্যের আবাসনের জমি বের করেছে। ভারতের ইন্দোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিক অংশগ্রহণ আর বাজেট-শৃঙ্খলা মিলিয়ে টানা কয়েক বছর দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহরের স্বীকৃতি পেয়েছে। তিন ক্ষেত্রেই সাফল্যের রসায়ন এক : স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা, আইনি বাধ্যবাধকতা আর নাগরিকের নজরদারি।
‘গরিব দেশে পরিকল্পনা বিলাসিতা’-এই যুক্তি কতটা ঠিক?
পালটা যুক্তিটি হালকা নয়। পরিকল্পনার প্রস্তুতিতে বছরের পর বছর কাটে, অথচ শহর অপেক্ষা করে না। অনেক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়েও কাজে লাগেনি, আর কঠোর জোনিং অনেক সময় জমির দাম বাড়িয়ে গরিবকে শহরের কিনারায় ঠেলে দেয়। নগরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির প্রাণবন্ততা অনেকটাই এ ‘অপরিকল্পিত’ মিশ্র ব্যবহারের ফসল। তাই অনেকে বলেন, আগে প্রবৃদ্ধি আর অবকাঠামো, পরিকল্পনা পরে।
কিন্তু এ যুক্তি দুটি জিনিস গুলিয়ে ফেলে : খারাপ পরিকল্পনা আর পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। মাস্টারপ্ল্যান ব্যর্থ হয়েছে বাস্তবায়নের অভাবে, পরিকল্পনার দোষে নয়; আর অপরিকল্পিত বৃদ্ধির বিল আসে পরে এবং অনেক বেশি দামে : ভরাট খাল খনন, ভাঙা ভবন সরানো, জলাবদ্ধতার ক্ষতি। সবচেয়ে বড় কথা, গরিবই এ বিলের সবচেয়ে বড় অংশ দেয়, কারণ জলাবদ্ধ নিচু জমি, দূরের কর্মস্থ আর অনিরাপদ কারখানায় তারাই থাকে। আহমেদাবাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, পরিকল্পনা গরিববান্ধবও হতে পারে, যদি তাতে স্বল্পমূল্যের আবাসনের জমি আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকে। পরিকল্পনা বিলাসিতা নয়; সীমিত টাকার দেশে অপচয় ঠেকানোর সবচেয়ে সস্তা উপায়।
কী করতে হবে : পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ
১. পরিকল্পনায় নেই, তো বরাদ্দও নেই। আগামী দুই অর্থবছরের মধ্যে সব পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদ করে গেজেট করা হোক। এরপর যে প্রকল্প গেজেটভুক্ত পরিকল্পনায় নেই, তাতে সরকারি উন্নয়ন অনুদান বা এলজিইডির অর্থ দেওয়া হবে না।
২. প্রতিটি পৌরসভায় অন্তত একজন নগর পরিকল্পনাবিদ। পদ সৃজন ও পূরণের খরচ প্রথম তিন বছর স্থানীয় সরকার বিভাগ বহন করুক; ছোট পৌরসভাগুলো জেলাভিত্তিক গ্রুপে একজন পরিকল্পনাবিদ ভাগাভাগি করতে পারে।
৩. নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন ও ভূমি পুনর্বিন্যাস বিধি। খসড়া আইনটি সংসদে তুলুন, সঙ্গে আহমেদাবাদের আদলে জমি পুনর্বিন্যাসের বিধি, যাতে উচ্ছেদ ছাড়াই রাস্তা, ড্রেন ও খেলার মাঠের জমি মেলে। স্কিমের একটি নির্দিষ্ট অংশ স্বল্পমূল্যের আবাসনের জন্য সংরক্ষিত রাখা হোক।
৪. ওয়ার্ড সভায় পরিকল্পনা, অনলাইনে নকশা। বছরে দুবার ওয়ার্ডভিত্তিক উন্মুক্ত পরিকল্পনা সভা বাধ্যতামূলক করা হোক, যেখানে নারী, প্রতিবন্ধী মানুষ ও নিম্ন-আয়ের পরিবারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। ভবনের নকশা অনুমোদন অনলাইনে হোক, ফি ও সময়সীমা প্রকাশিত থাকুক, আর অনুমোদিত নকশা পৌরসভার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হোক।
৫. খাল, জলাশয় ও খোলা জায়গার ‘লাল দাগ’ মানচিত্র। প্রতিটি পৌরসভা এক বছরের মধ্যে সব খাল, জলাশয় ও খেলার মাঠের ডিজিটাল মানচিত্র প্রকাশ করুক এবং সেগুলোকে ‘নির্মাণনিষিদ্ধ এলাকা’ ঘোষণা করুক। প্রতিটি শিশুর বাড়ি থেকে দশ মিনিটের হাঁটাপথে একটি খোলা মাঠ থাকাকে লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারণ করা হোক।
শেষ কথা
কোনো শহর রাতারাতি ভালো হয় না, আবার রাতারাতি খারাপও হয় না। প্রতিটি ভরাট করা খাল, প্রতিটি অনুমোদনহীন তলা, প্রতিটি পরিকল্পনাহীন রাস্তা একেকটি ছোট সিদ্ধান্ত, যার যোগফল আজকের জলাবদ্ধ গলি। তাই এবারের বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবসে প্রশ্নটা আর ‘পরিকল্পনা দরকার কি না’ নয়, বরং ‘পরিকল্পনা কে মানবে, কার টাকায়, কার কাছে জবাবদিহি করবে’। পরিকল্পনাকে বাজেট, আইন আর ওয়ার্ড সভার সঙ্গে বাঁধতে পারলেই সেই মায়ের গলিতে একদিন পানি নামবে আর খালটি ফিরবে। ভালো জনপদ স্বপ্নে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে পরিকল্পনায়, আর সেই পরিকল্পনার মালিক হতে হবে নাগরিককেই।
তৌফিক মহিউদ্দীন : নগর পরিকল্পনাবিদ ও নীতি বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ভিশন এইড ফাউন্ডেশন
