রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু
Advertisement
আকতারী মমতাজ
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২০ সালে। তার আগেই ১৯১৭ সালে শোষিতের পক্ষে সংঘটিত হয়ে গেছে রুশ বিপ্লব।
পৃথিবীর রাজনীতি দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে শোষিত আর শোষকের পক্ষে। আর সেই সময়ে এ উপমহাদেশের রাজনীতিতে সূচিত হয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নানা সক্রিয় ধারা। রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধু উজ্জীবিত হয়েছিলেন রুশ বিপ্লবের মূলমন্ত্রে-শোষিতের পক্ষে, ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের দেশপ্রেম আলোড়িত করেছিল তাকে।
একইসঙ্গে গান্ধী-নেহেরুর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি অন্তরে গভীরভাবে গ্রহণ করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ। নেতাজি সুভাষ বসুর স্বদেশি আন্দোলনেও তরুণ শেখ মুজিব উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন প্রবলভাবে।
তিনি নিজের আত্মপরিচয়, আপন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অবিভক্ত ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসকে ধারণ করেছিলেন হৃদয়ের গভীরে। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম (সিপাহি বিদ্রোহ), সাঁওতাল বিদ্রোহ, গারো-হাজং বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহসহ অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সব আন্দোলন-সংগ্রামকে অন্তরে ধারণ করেছিলেন তিনি।
অবিভক্ত ভারতে শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও দারিদ্র্য থেকে বাংলার দুঃখী মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। তবে তিনি বরাবর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিলেন। সে কারণেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন গান্ধী-জিন্নাহ-নেহেরুর ব্রিটিশবিরোধী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে।
শোষিত, বঞ্চিত, দরিদ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় তখন সমর্থন দিয়েছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে।
কিন্তু ’৪৭-এর পর যখন মাতৃভাষা বাংলার ওপর আঘাত এলো, মুখোশ উন্মোচিত হলো পাকিস্তানি শাসকদের, তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হোলেন, যুক্ত হলেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনে।
১৯৪৮ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান সংবিধান সভার (কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) বৈঠকে মুসলিম লীগ নেতারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অভিমত ব্যক্ত করে, তখন কুমিল্লার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুর ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন; কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো মুসলিম লীগ সদস্য কিংবা পূর্ব বাংলার কোনো মুসলিম লীগ সদস্যই তার প্রস্তাব সমর্থন করেননি।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর ক্রমেই এ দেশের মানুষও সংগঠিত হতে থাকে স্বাধিকার ও জাতীয়তাবাদের চেতনায়। আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে থাকে শোষণ-নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
শাসনতন্ত্রের জন্য আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন সবই সেই সংগ্রামের মাইলফলক।
বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের এসব আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পরীক্ষিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী করে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন, সে ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। ঊনসত্তর সালের প্রবল গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করে সামরিক বাহিনীর এক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করেন।
তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন ১৯৫৮ সালে। ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা দিলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন নির্বাচনী হাওয়ায় সরগরম হয়ে ওঠে। সত্তরের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী স্বতন্ত্রসহ পাকিস্তানের অন্যান্য নয়টি দল পেয়েছিল অবশিষ্ট ১৪০টি আসন।
নির্বাচনে ১৬০টি আসনে জয়ী হওয়া ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের জন্য সংরক্ষিত নয়টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৭টি আসন। সর্বমোট আসন সংখ্যা ছিল ১৬৭। সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনের ৩০০ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৮৮টি আসন।
অর্জিত হয় বাঙালির বিপুল বিজয়। ভূমিধস বিজয় যাকে বলে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে নানা টালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করছিল।
এলো একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ! মার্চ মাসের শুরু থেকেই সারা দেশ অসহযোগ আন্দোলন, বিক্ষোভ-সংগ্রামে টালমাটাল। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বঙ্গবন্ধু কবিতায় ধরা দিয়েছে একাত্তরের উত্তাল সেই সময়-মুজিবুর রহমান।/ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান।/বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে,/জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞ্ঝা-অশনি বেয়ে। বাংলাদেশ তখন চলছিল শেখ মুজিবের নির্দেশে।
রাজনীতির কবি প্রতিদিন রচনা করছিলেন বাংলাদেশ নামক মহাকাব্যের নতুন নতুন স্তবক! প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করলে সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢাকা হয়ে ওঠে, প্রতিবাদে, ক্ষোভে উত্তাল মিছিলের শহর। একাত্তরের ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অকস্মাৎ ঢাকায় এলেন। ইতোমধ্যে ৭ মার্চে রেসকোর্সের জনসভায় রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে সেই ঐতিহাসিক ভাষণ।
স্বাধীনতার অমোঘ আহ্বান। ভাষণ নয়, যেন বাংলার মানুষের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য কবিতা! ঢাকায় এসে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনার নামে সাজানো নাটকের অন্তরালে করলেন গভীর গোপন ষড়যন্ত্র। ১৬-২৪ মার্চ পর্যন্ত মুজিব-ইয়াহিয়া বেশক’টি বৈঠক চলার পর আলোচনা অমীমাংসিত রেখেই কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ ঢাকা ত্যাগ করেন ইয়াহিয়া।
আর ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংস গণহত্যা। ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালির ওপর রাতের গভীরে চালায় অতর্কিত হামলা। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে।
জানা যায়, গ্রেফতার হওয়ার আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পূর্বপ্রস্তুতি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্টের (ইপিআর) ওয়্যারলেস সেটের মাধ্যমে পুরান ঢাকার বলধা গার্ডেন থেকে গোপন ট্রান্সমিটার সেটের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বাধীনতার ঘোষণাবার্তা পাঠান। সেই রাতে বঙ্গবন্ধু তার সব সহকর্মী নেতাকে নিরাপদ অবস্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন; কিন্তু তিনি থেকে যান ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের নিজ বাড়িতেই। গ্রেফতার বরণ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অকুতোভয় এক মহান সংগ্রামী বীর। শত্রুর মুখোমুখি হতে কখনো পিছপা হননি। রাজনৈতিক জীবনে বহুবার গ্রেফতার হয়েছেন; কিন্তু কখনো আত্মগোপন করেননি। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ২৫ মার্চের সেই ভয়াবহ রাতে বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাননি।
দেশ ও মানুষের প্রতি অসীম ভালোবাসা, মানবিকতা ও অসম সাহসিকতার অসামান্য ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জয় করেছিলেন বাংলার ধনী-গরিব, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের হৃদয়।
তাই তো তিনি আমাদের মহান নেতা। তারই নেতৃত্বে স্বাধিকারের জন্য দীর্ঘ ২৩ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি আমরা। তারই আহ্বানে ১৯৭১ সালে বাংলার মুক্তিকামী মানুষ, শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলেরা অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছে। শত্রুর কাছে থেকে ছিনিয়ে এনেছে বিজয়। এনেছে লাল-সবুজের পতাকার স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ তাই অবিচ্ছেদ্য।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। এসব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যত ষড়যন্ত্র, অপচেষ্টাই হোক না কেন, তাকে কখনো বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
তিনি ছিলেন আমাদের অবিসংবাদিত নেতা। তাই তো তিনি আমাদের জাতির পিতা। বাঙালির অন্তরের অন্তস্থলে রয়েছে তার অটল আসন পাতা। বাংলাদেশের সব্যসাচী লেখক কবি সৈয়দ শামসুল হক তার ‘আমার পরিচয়’ কবিতায় সে কথাই প্রকাশ করেছেন-
এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?/যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;/তাঁর ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি-/চোখে নীল আকাশ, বুকে বিশ্বাস, পায়ে উর্বর পলি।
আকতারী মমতাজ : সাবেক সচিব
