ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!
Advertisement
ফরিদ হাফেজ
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত সপ্তাহের শেষদিকে ফ্রান্সে যখন বিক্ষোভগুলো সহিংস রূপ নেয়, তখন ফরাসি উগ্র-ডানপন্থিরা দ্রুতই বর্ণবাদী ভাষা ব্যবহার করে এ সহিংসতার জন্য মুসলিম তরুণদের দায়ী করতে শুরু করে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে যখন হাজার হাজার অভিবাসী প্রতিবেশী মরক্কো থেকে স্প্যানিশ অঞ্চল সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল, তখনও স্পেনের উগ্র-ডানপন্থিরা একে মরক্কোবাসীদের একটি সুসংগঠিত ‘আক্রমণ’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেন, এটি মূলত ‘ইসলামের আধিপত্য বিস্তারের চক্রান্ত’।
উগ্র-ডানপন্থিরা তাদের ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি বাড়ানোর জন্য যে কোনো সংকটকে কাজে লাগাবে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। তবে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান সমস্যার জন্য ইসলাম ও মুসলমানদের দায়ী করার এ ধারণাটি এখন আর শুধু ইউরোপীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের সেই উগ্রগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত সপ্তাহে ফ্রান্সে যখন ছাত্র বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করছিল, তখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নীরবে একটি প্রস্তাব পাশ করে। প্রস্তাবটি ছিল-‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ এবং মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের প্রভাব মোকাবিলার জন্য একটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন কৌশলের প্রয়োজনীয়তা।’ এ প্রস্তাবটি এনেছিল মধ্য-ডানপন্থি ‘ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি’ (ইপিপি), যা পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন এ দলেরই প্রতিনিধি।
প্রস্তাবটি ৩৮১-১৬৭ ভোটে পাশ হয়, আর ১৫ জন ভোটদানে বিরত ছিলেন। ইপিপির পাশাপাশি আরও চারটি রাজনৈতিক দল প্রায় সর্বসম্মতভাবে এতে সমর্থন দেয় : উগ্র-ডানপন্থি ‘প্যাট্রিয়টস ফর ইউরোপ’ ও ‘ইউরোপ অজ সভরেন নেশনস’, লিবারেল দল ‘রিনিউ ইউরোপ’ এবং ‘ইউরোপিয়ান কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফর্মিস্টস’। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, দ্য লেফট (বামপন্থি) এবং গ্রিনস (সবুজ দল) মূলত এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু তারা এটি থামাতে পারেনি।
ফ্রান্স সরকারের ‘রাজনৈতিক ইসলামবাদ’ সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বেশকিছু ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ দাবি করা হয়েছে, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ প্রস্তাবে ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশকে’ ‘প্রভাব বিস্তার, ধীরে ধীরে ভিত্তি তৈরি, প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ এবং আদর্শগত বৈধতা অর্জনের একটি রাজনৈতিক কৌশল’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, ‘ইসলামপন্থিদের প্রভাব বিভিন্ন সমিতি, ফাউন্ডেশন, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, ধর্মীয়, জনকল্যাণমূলক, বিশ্ববিদ্যালয়, যুব, বৈষম্যবিরোধী বা সামাজিক পদক্ষেপমূলক কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করে।’
আরও নির্দিষ্টভাবে এতে বলা হয়েছে, ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য পরিচালিত বৈধ আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক ধর্মীয় পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। এভাবে বৈচিত্র্য, সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং বৈষম্যবিরোধী অবকাঠামোগুলোকে ব্যবহার করে এসব সংস্থা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা আদায় করছে।’ অন্য কথায়, মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো নেটওয়ার্কগুলো ইসলামফোবিয়া-বিরোধী উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে ইউরোপীয় সমাজে ‘অনুপ্রবেশ’ করছে।
এ প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক নয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এটি বাস্তবায়ন করতেই হবে-এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাছাড়া, সহিংসতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে বর্জন করায় মুসলিম ব্রাদারহুড ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা সত্তাগুলোকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা ইউরোপজুড়ে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তা সত্ত্বেও প্রস্তাবটি এমন একটি ভাবধারাকে বৈধতা দেয়, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য গুরুতর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। এটি স্বাধীনভাবে পরিচালিত মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে সন্দেহের তালিকায় ফেলে দেয় এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে মুসলিম নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণকে এক ধরনের ‘অনুপ্রবেশ’ হিসাবে তুলে ধরে।
প্রস্তাবে ব্রাসেলসভিত্তিক ‘ইউরোপিয়ান নেটওয়ার্ক এগেইনস্ট রেসিজম’সহ বেশ কয়েকটি সংস্থার নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, তারা এ ধরনের ‘ইসলামপন্থি’ আচরণ লালন করে। একইসঙ্গে তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল ব্যবহার বন্ধ করা এবং ইইউ-অর্থায়নে পরিচালিত যে কোনো সত্তাকে তাদের সঙ্গে কাজ করা থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের মতো অস্পষ্ট ধারণার কারণে যে কোনো সাধারণ মানুষকেও এর সঙ্গে জড়িয়ে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হতে পারে।
বাহ্যিক নানা পক্ষ সহজেই এটিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে পারে এবং ইতোমধ্যেই তা করছেও। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউরোপ ও অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সহযোগী হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের মানহানি করার জন্য একটি ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ প্রস্তাবটি পেশ করার কয়েক মাস আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ‘মুসলিম ব্রাদারহুড : ইউরোপের জন্য একটি আসল হুমকি’ শীর্ষক এক সম্মেলনে একজন প্রবীণ আমিরাতি রাষ্ট্রদূত অংশ নিয়েছিলেন। যদিও এখানে আমিরাতের প্রভাব স্পষ্টভাবে রয়েছে, তবুও এ প্রস্তাবে কাতার বা তুরস্কের তথাকথিত ‘বৈদেশিক তহবিল’, যা ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশে’ সহায়তা করে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে-যা পর্দার পেছনের ভূরাজনীতির আরেক নির্দেশক।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ প্রস্তাবের মাধ্যমে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের রক্ষা করার পদক্ষেপকে ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশের চক্রান্ত হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি ইউরোপীয় সমাজে ইসলামভীতি মোকাবিলার উদ্যোগ ও উন্মুক্ত বিতর্কগুলোকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
প্রতীকীভাবে, এ প্রস্তাবটি ইউরোপের ডানপন্থি ইসলামবিরোধী শক্তির জন্য একটি বড় বিজয়। এটি দেখায়, মধ্য-ডানপন্থি দলগুলো উগ্র-ডানপন্থিদের যত কাছাকাছি আসছে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টও উগ্র-ডানপন্থিদের প্রতিরোধ করার অবস্থান ততটাই ত্যাগ করতে শুরু করেছে। ইপিপি উগ্র-ডানপন্থিদের এজেন্ডা প্রায় পুরোপুরি আপন করে নিয়েছে, তবে তারা জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সেটিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।
এ প্রস্তাবটি ইউরোপীয় ইসলামফোবিয়া কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তাও স্পষ্ট করে। এখনকার ভয় আর সেই অভিবাসীদের নিয়ে নয়, যারা ‘মিশে যেতে’ ব্যর্থ হওয়া কোনো অপরিচিত মানুষ ছিল; বরং এখনকার ভয় সেই মুসলমানদের নিয়ে, যারা নিজেদের অধিকারের কথা বলতে পারে এবং নিজেদের নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম। মধ্য-ডানপন্থিদের জন্য এ ইসলামফোবিক কাঠামো রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসে। তারা কেবল মুসলিমবিরোধী ভয় দেখিয়ে নির্বাচনি সুবিধা লাভ করে না, বরং যারা বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ায়-সেই বামপন্থিদের ওপরও আঘাত হানতে পারে।
ফরাসি রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ইসলামি-বামপন্থা’ ধারণার প্রচার করা যে আকস্মিক কিছু নয়, তা স্পষ্ট। বামপন্থি দল ‘লা ফ্রান্স ইনসোমিসে’র জ্যাঁ-লুক মেলঁশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রেসিডেন্ট পদের একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। তাকে এখন এ অভিযোগ এনে অভিযুক্ত করা হচ্ছে যে, তিনি ‘বিক্ষোভকারীদের’ উৎসাহিত করছেন; ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, এর পেছনে যারা রয়েছে, তারা মুসলিম।
বামপন্থি এবং মুসলিমদের ওপর এই দ্বিমুখী আক্রমণ মূলত সেই পুরোনো ‘জুডিও-বলশেভিক’ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতিচ্ছায়া, যেখানে পশ্চিমা সভ্যতা ধ্বংসের লক্ষ্যে কমিউনিজম ছড়ানোর জন্য ইহুদিদের দায়ী করা হতো। আজ ‘ইসলামি-বামপন্থা’ ধারণাটি রক্ষণশীল, লিবারেল এবং উগ্র-ডানপন্থি-সবার কাছেই একটি বলির পাঁঠা হিসাবে কাজ করছে। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে বর্ণবাদ ও বৈষম্য মোকাবিলার ক্ষেত্রে পশ্চিমারা যে সামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তা নস্যাৎ করার এই এক বিপরীতমুখী চেষ্টা। তাদের উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে-মুসলমানদের বাদ দিয়ে এক ‘দুর্গসদৃশ ইউরোপ’ গড়ে তোলা।
‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ’ সংক্রান্ত এ প্রস্তাবের ভিত্তি যতই দুর্বল হোক না কেন, ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে মুসলিমদের নাগরিক অধিকার রক্ষাকারী স্বাধীন সংস্থায় বাধা দিতে রক্ষণশীল জোটগুলোর পক্ষ থেকে আরও আইনি পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাব। ইতোমধ্যে ভয় দেখানোর দলগুলো সামাজিক সমস্যা এবং কৃচ্ছ্রসাধনের বিরুদ্ধে হওয়া বৈধ আন্দোলনগুলোর জন্য ইসলামকে দায়ী করতে থাকবে, আর রাজনীতিকরা নিজেদের শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা থেকে জনগণের চোখ ফেরাতে মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে আঙুল তুলতে থাকবে।
এ মুহূর্তে যা প্রয়োজন তা হলো-সবার নাগরিক স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে রক্ষার মাধ্যমে এ রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়াশীলতার একটি উপযুক্ত ও জোরালো জবাব দেওয়া।
আল জাজিরা থেকে ভাষান্তরিত
ফরিদ হাফেজ : যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ‘দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভের একজন সিনিয়র গবেষক
