Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

Advertisement

Icon

ড. সুকোমল বড়ুয়া

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আজ। প্রবারণা বৌদ্ধধর্মীয় বিধানে বিনয়ভিত্তিক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্রতকর্ম ও অনুষ্ঠান। এর অপর নাম আশ্বিনী পূর্ণিমা। প্রবারণার এ আবেদন বৌদ্ধ ভিক্ষুজীবনে অধিক গুরুত্ব পেলেও বৌদ্ধ নর-নারী, উপাসক-উপাসিকাদের জীবনেও এর গুরুত্ব কম নয়। শুধু ধ্যানের দিক থেকে নয়, আত্মশুদ্ধিতা, রিপু সংযম এবং আত্মোপলব্ধিতে এর অর্থবহ দিক আমাদের পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশে অনেক অবদান রাখে। তাই বিশ্বের সব বৌদ্ধ আজ এই শুভ তিথিটি যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপন করবে।

প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসবে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান তো আছেই, এর সঙ্গে আছে আমাদের আত্মশাসন ও আত্মবোধের মূল শিক্ষা। এ যেন এক জীবনবোধ তৈরির সর্বোত্তম শিক্ষা। কারণ, শাস্ত্রে প্রবারণার অর্থ বলা হয়েছে, প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা এবং নিষেধ করা। বরণ করা অর্থ বিশুদ্ধ বিনয়াচারে জীবনকে পরিচালিত করার উত্তম আদর্শ গ্রহণ করা। আর নিষেধ করা অর্থ আদর্শবান ও ধর্মাচারের পরিপন্থি কর্মগুলো থেকে বিরত থাকা অথবা ওইসব কর্ম পরিহার করা। অতএব, অর্থের দিক থেকে প্রবারণার গুরুত্ব ও মর্যাদা অতীব মহান ও তাৎপর্যমণ্ডিত। তাই বৌদ্ধ প্রবারণা উদযাপনে বলা হয়, পাপ ও অশুভ কর্ম থেকে মুক্ত থাকার জন্যই সৎ এই ব্রতকর্মের সাধনা। সুন্দর জীবন গঠনের ক্ষেত্রে এবং সত্যনিষ্ঠ ধ্যান সমাধির ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস সমাপনান্তে ভিক্ষুসংঘ আপন আপন দোষত্রুটি স্বীকারপূর্বক অপর ভিক্ষুসংঘের কাছে প্রকাশ করে এবং তার প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহ্বান জানায়। অর্থাৎ, ভিক্ষুরা জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে যে কোনো অপরাধ করে থাকলে সেই অপরাধ স্বীকারপূর্বক প্রবারণা দিবসে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। কারণ, দৈনন্দিন জীবনাচারে চিত্ত নানারকম অকুশলে আবিষ্ট হয়। তাই প্রতিটি মুহূর্তে চিত্ত জাগ্রত রেখে গুণের প্রতি আকৃষ্ট থাকার জন্যই এ প্রবারণার প্রবর্তন করা হয়। বুদ্ধের জীবদ্দশায় শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থানকালে তিনি ভিক্ষুসংঘের পালনীয় কর্তব্য হিসাবে এ প্রবারণার প্রবর্তন করেন। বৌদ্ধধর্ম মতে, ভিক্ষু-শ্রমণ ও উপাসক-উপাসিকারা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা-এই তিন মাস শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা সাধনার অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন। এ তিন মাসে অষ্টমী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা এবং ধ্যান, উপবাস ও সংযম শিক্ষার মধ্য দিয়ে তারা তাদের ব্রত অধিষ্ঠান সমাপন করেন। তাই ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস ব্রত অধিষ্ঠানের শেষ দিবসটিকেই বলা হয় বৌদ্ধ আভিধানিক শব্দে ‘প্রবারণা’। এটিকে বৌদ্ধ পরিভাষায় আশার তৃপ্তি বা অভিলাষ পূরণও বলা হয়।

প্রবারণা দিবসে বৌদ্ধরা সব ভেদাভেদ ভুলে পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পারস্পরিক ঐক্য, মৈত্রী, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের ভাব নিয়ে একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গন করেন। হৃদয়কে অনেক বড় করে চিত্তকে বিলিয়ে দেন। এর মাধ্যমে মনের মলিনতা দূর হয়, ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত হয়। এতে চিত্তের সংকীর্ণতাও দূরীভূত হয়। বৌদ্ধরা সব মানুষের, বিশ্বের সব জীবের অখণ্ড সুখ, অখণ্ড কল্যাণ এবং সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করেন।

প্রবারণার দিন বৌদ্ধরা পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করেন, পূজা দেন এবং ধর্ম শ্রবণ করেন। দানের জন্য বিহারে কল্পতরু তৈরি করা হয়। সেদিনের এ কল্পতরু হয় ধর্মীয় আবেশের একটি বিশেষ আকর্ষণ। আবালবৃদ্ধবনিতা-সবাই তাদের সামর্থ্যানুযায়ী এ কল্পতরু বৃক্ষে নানা ধরনের দানীয় সামগ্রী বেঁধে দেন। এ কল্পতরু হচ্ছে জন্মচক্রের গতিধারায় উচ্চদিকে যাওয়ার চিত্তের একটি অবলম্বন। জীবের জীবনগতি যে বহু দীর্ঘ এবং বহু স্তরের মাধ্যমে এ জীবনচক্র অতিবাহিত বা প্রবাহিত হয়, তারই নিদর্শনস্বরূপ এ কল্পতরু। এটিকে কল্পবৃক্ষও বলা হয়।

প্রবারণা পূর্ণিমার আরেকটি উৎসবময় দিক হলো ফানুস উত্তোলন। বৌদ্ধশাস্ত্র মতে, বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর তার মাতৃদেবীকে ধর্মদেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। সেখানে তিনি তিন মাস মাতৃদেবীকে ধর্মদেশনা করেন। প্রবারণা দিবসেই তিনি ওই স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেন। এ কারণেই বৌদ্ধরা প্রবারণা পূর্ণিমা তিথিতে ওই প্রতীকীরূপে আকাশে প্রদীপ প্রজ্বালন করেন এবং ফানুস উত্তোলন করেন।

বৌদ্ধ ধর্ম হলো মূলত শীল-সমাধি-প্রজ্ঞানির্ভরশীল ধর্ম। তাই বৌদ্ধমতে, জীবনের সব ক্ষেত্রে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা অপরিহার্য। কারণ অজ্ঞানতা, মূর্খতা ও অসৎকর্ম মানবজীবনে কখনো সুখ আনতে পারে না, কখনো মানুষকে মহীয়ান করতে পারে না। দেশ ও সমাজকেও সমৃদ্ধ করতে পারে না। কারণ, অন্ধকার দিয়ে যেমন আলোকে আহ্বান করা যায় না, তেমনই অকুশল ও মন্দকর্ম দিয়ে কখনো সৎ, শুভ ও কল্যাণকে সম্ভাষণ করা যায় না। তাই বৌদ্ধরা তিন মাস প্রবারণা শিক্ষায় জীবনকে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেন এবং অন্তর্মুখী শিক্ষায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন। তারা সর্ববিধ মঙ্গল ও কল্যাণময়তাকে আহ্বান জানান। তারা অশুভ শক্তির বিনাশ করেন এবং শুভ শক্তির আরাধনা করেন। এটাই হলো প্রবারণার মূল শিক্ষা।

আমরা গতবারের মতো এ বছরও শুভ প্রবারণা উৎসব এবং কঠিনচীবর দান অনুষ্ঠান বৃহৎ আকারে, উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের প্রত্যাশা রাখি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রবারণার পর থেকে এক মাসব্যাপী তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের সর্বত্র বৌদ্ধ সম্প্রদায় যেন যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শুভ প্রবারণা ও কঠিনচীবর দানোৎসব উদযাপন করতে পারে।

দেশে এবারের প্রবারণা উৎসব অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশ এবং আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৩ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন বৌদ্ধ প্রবারণার জন্য। বৌদ্ধধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টও নতুনভাবে গঠিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। সাম্য, সম্প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে এবারের প্রবারণা উদযাপন করা হচ্ছে।

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন, সর্বকল্যাণকর। ধর্মীয় ও সামাজিক ঐক্য এবং সংঘশক্তি বৃদ্ধিতেও এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, সুখং সংঙ্ঘসম্মগ্ঘি সংঙ্ঘনং তপ সুখো। অর্থাৎ একত্রে বসবাস করা সুখকর, একত্রে মিলন সুখকর এবং একসঙ্গে তপস্যাজনিত সর্বত কল্যাণসাধনও সুখকর। অতএব, চলুন আমরা প্রবারণার এ শিক্ষায় নিজেদের গড়ে তুলি, শান্তিশৃঙ্খলায় এবং দেশ, সমাজ ও জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একত্রে কাজ করি, ঐক্যবদ্ধ হই। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু, জগতের সব জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক। প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে বিশ্বের সবার প্রতি রইল আমার শুভেচ্ছা।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া : শিক্ষাবিদ; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম