‘সোনার বাংলা’ কে করবে?
Advertisement
পবিত্র সরকার
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি রাজনৈতিক দল, বিজেপি, যারা কেন্দ্রে বছরসাতেক শাসন করছে, এবার পশ্চিম বাংলার নির্বাচনে যাকে বলে ‘অল্ আউট’-সেভাবে কাছা খুলে, আবার কোমর বেঁধে নেমে গেছে। বাংলাকে তারা এবার সোনার বাংলা করেই ছাড়বে। না হলে কী করবে, কেদারনাথে গুহায় গিয়ে তপস্যায় বসবে, না বনবাসে চলে যাবে, তা অবশ্য বলেনি।
ভারতের মানুষ দেখেছে যে, তারা এরই মধ্যে সোনার গুজরাট, সোনার উত্তরপ্রদেশ করেছে, সোনার মধ্যপ্রদেশ করেছে, সোনার ত্রিপুরা, সোনার আসাম ইত্যাদি করে ফেলেছে। তাদের শাসিত প্রদেশগুলোর মধ্যে তামা, দস্তা বা রুপার প্রদেশ একটাও নেই, সবই চব্বিশ ক্যারাট সোনার। কোথাও রোজ একাধিক ধর্ষণ আর খুন হচ্ছে, অহিন্দু আর দলিতদের পেটানো আর হত্যা করা হচ্ছে, কোথাও সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া শিক্ষকদের আত্মহত্যার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে, আমন্ত্রণে সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে।
পরিযায়ী শ্রমিকদের কী হলো, কেন ক্ষুধা সূচকে ভারত নেপাল, পাকিস্তান, বাংলাদেশেরও নিচে নেমে গেল, কেন ভারতের গণতন্ত্র সম্বন্ধে সারা পৃথিবী ক্রমেই বাঁকা হাসি হাসছে, কেন যুক্তিবাদীরা পরপর খুন হয়ে চলেছে, কেন দেশে বেকারি গত পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে রেকর্ড করল, কেন কৃষক বসে আছে মাসের পর মাস দিল্লি আসার রাজপথে, সে সম্বন্ধে এ দল বা সরকার পরম জ্ঞানীদের মতো গভীর এক নৈঃশব্দ্যের কম্বল মুড়ে বসে আছে, যাকে ভালো বাংলায় বলে তূষ্ণীম্ভাব। সেসব চেপে গিয়ে বলছে ‘হ্যান্ করেঙ্গা ত্যান্ করেঙ্গা, অব ইয়ে বঙ্গালকো সোনেমে মুড় দেঙ্গা’! আরে করেঙ্গা তো এই সাত বছরে করতে কী হয়েছিল বাপু! এ দল বলে না কেন গত দশ বছরে (২০১১-২০২০) সাক্ষরতার হার মাত্র তিন শতাংশ বাড়ল ৭৪.৪ থেকে ৭৭.৭), যেখানে তার আগের দশকের ৬৪.৫ থেকে বেড়েছিল প্রায় দশ শতাংশ? গুগল খুঁজলেই এসব তথ্য পাওয়া যাবে।
হ্যাঁ, এরা হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবস্থা করবে বলেছে! এ প্রতিশ্রুতি প্রতারণাও হতে পারে, কারণ কাজে যে এরা তেমন করবে তা মনে হয় না। ধরা যাক এই বিষয়টি। গত বছর এরা একটা শিক্ষানীতি প্রচার করল, তা নিশ্চয়ই অনেকে পড়েছেন। তিন বছরের শিশুকে মায়ের কোল থেকে ছাড়িয়ে স্কুলে আনতে হবে, শিশুশিক্ষা কেন্দ্র, প্রাথমিক স্কুল, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক সব এক জায়গায় আনতে হবে, হায়ার এডুকেশন কমিশন হবে, শহরে শহরে হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউট হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সেটিও আর-এক ‘হ্যান্ করেঙ্গা ত্যান্ করেঙ্গা’র হাউইবাজি। তাতেও হাজার হাজার কোটি টাকা লাগার কথা। কিন্তু কাজে কী করলেন তারা? তারা চট করে গত বছরের শিক্ষার বাজেট থেকে এ বছর ছয় হাজার কোটি টাকা কমিয়ে দিলেন, ৯৯, ৩১২ কোটি থেকে নেমে এলো ৯৩, ২২৪ কোটিতে। এতে কার উপকার হলো? একদিকে ‘হ্যান্ করেঙ্গা’, আর-এক দিকে বাজেট কাটা।
অন্যদিকে তো হাজার হাজার কোটির খেলা চলছে দেখতে বা শুনতে পাই। বিকিকিনির হাট বসে গেছে, কোটি কোটি টাকায় এমএলএ সংসদ সদস্য কেনাবেচা হচ্ছ গরু-ছাগলের মতো, এদেরই বন্ধু-বান্ধবরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা ধার নিয়ে লন্ডন-আমেরিকায় পগার পার হচ্ছে। নোটবন্দিতে এদেরই দলের কারও নাকি হাজার হাজার কোটি টাকা আয় হচ্ছে। বিক্রির হরির লুট বসে গেছে যাকে বলে। সরকারি চাকরি তুলে দিচ্ছে, অথচ বলছে বেকারদের চাকরি দেবে।
চৈত্র মাসে যেমন কলকাতার রাস্তায় ‘সেল’ বসে যায়, উদ্বাস্তু হকার ভাইরা ‘ছেল্ ছেল্ ছেল্ ছেল্’ বলে হাঁকতে থাকেন, এখন মাথা আর মেরুদণ্ডও সেইভাবে বিক্রি হচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। বিজেপি-তৃণমূলের মধ্যে যেন ফ্রেন্ডলি ম্যাচ চলছে আজ এ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাচ্ছে, তো কাল সে ফিরে আসছে, আর তৃণমূল নেত্রী নিজেই বলছেন যে, তার দলে সব গাদ্দার বাসা বেঁধেছে। তবে দু-দলই গাদ্দারদের জন্য দরজা খুলে রেখেছে, ‘এসো আমার ঘরে’ বলে ডেকে নিচ্ছে।
বিকিকিনির হাটে শুধু মানুষের মাথা, শিরদাঁড়া তথা বিবেক নয়, বিক্রিও হচ্ছে আরও কত কিছু। এয়ার ইন্ডিয়া নামক সরকারি বিমান কোম্পানি, সরকারি রেল (অল্প পয়সায় গরিবের যাতায়াতের পথ বন্ধ হলো বলে), এয়ারপোর্ট, রেলের স্টেশন, ব্যাংক, বীমা সব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এসব অর্থনীতির ব্যাপার আমরা বুঝি না। ব্যাংকে সুদ কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে, আমরা পেনশনভোগীরা মাথার চুল ছিঁড়ছি টিকে থাকার কসরতে।
ভাবছি, এরপর টাকা রাখতে গিয়ে ব্যাংকে টাকা দিতে হবে না তো? তা হলেই তো গেছি! সম্বল এক ভিক্ষের ঝুলি, তা-ও সরকার ফুটো করে দিচ্ছে গো! ওদিকে ডিজেলের দাম বাড়ছে, পেট্রলের দাম বাড়ছে, রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ছে, কেরোসিনের দাম বাড়ছে। গরিবের উনুন ধরাতে ফের কাঠকুটোর খোঁজ পড়ছে। আর যদি বা উনুন ধরায় তাতে রাঁধবেই বা কী? এসবের দাম বাড়লেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ে তা কে না জানে, কাজেই উনুন ধরিয়ে গালে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই।
দেখলাম, বাঙালিদের খুশি করতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর সত্যজিৎ রায়ের নামে দুটো পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। নিশ্চয়ই তার অর্থমূল্য বিশ-তিরিশ লাখ টাকা হবে। আহা, আহা! বাংলাকে সোনার বাংলা করার এ সহজ পদ্ধতিটা এতদিন কেউ ভাবেনি কেন? দেশ-বিদেশের লোক এসে পুরস্কার নিয়ে যাবে, আর তাতেই সব বাঙালির থালায় ভাত বা রুটি আর মাছ, মাংস, ডাল, তরকারিতে উপচে পড়বে, আর আলুচাষি বা চা-শ্রমিক আত্মহত্যা করবে না। ভারতের চাষিরা আর পরিযায়ীরাও সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থালা আর ঘণ্টা বাজিয়ে নাচবে।
ওদিকে গায়ত্রী মন্ত্রে আর যোগব্যায়ামে করোনা সারে কিনা তাই নিয়ে গবেষণায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালা হচ্ছে দিল্লির এইমসে এবং নিশ্চয়ই গরুর দুধে সোনা কতটা আছে, গোমূত্রে ক্যানসার সারে কিনা, গোবরে যক্ষ্মা, আর গঙ্গাজলে গেঁটেবাত এসবের গবেষণাতেও টাকা আসবে, গবেষণার ওপর ফাউন্ডেশন তো সেই কারণেই হচ্ছে। ময়ূররা চোখের জল দিয়ে ময়ূরীর গর্ভে ডিম উৎপাদন করে কিনা, রাবণের বিমানঘাঁটিতে চৌত্রিশ রকমের বিমান ছিল কিনা, মহাভারতে সঞ্জয়ের ঘরে টেলিভিশন বা ইন্টারনেট বসানো ছিল কিনা-এসব নিয়েও গবেষণা হবে, লাখ লাখ টাকার ছেরাদ্দ হবে। গরিব ভারতের পেট খালি থাকবে না আর। ভাত-রুটিতে না হোক, জ্ঞানের গোবর-গ্যাসে পেট ঢাউস হয়ে ফুলবে, খাবারের আর দরকারই হবে না।
রবীন্দ্রনাথের নামে নোবেল প্রাইজের মতো পুরস্কার হবে, কিন্তু কেন্দ্রীয় আর রাজ্য নেতারা কেউ বলবে শান্তিনিকেতনে জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কেউ তার ‘সহজ পাঠ’ রচনার কৃতিত্ব দেবেন বিদ্যাসাগর মশাইকে। আর অন্যদিকে একজন উপাচার্য রেগে গিয়ে বলবেন (নিশ্চয়ই তার রাগের কারণ আছে, সব আমরা বুঝিও না) তিনি বিশ্বভারতী বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে যাবেন। বাপ্ রে, পৃথিবীর ইতিহাসে যা কখনো হয়নি, একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে শেষ করে দেওয়া, তার ওপর রবীন্দ্রনাথের তৈরি এ বিশ্ববিদ্যালয়-তা এ মহাশক্তিধর উপাচার্য করবেন বলেছেন।
ওদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘বন্দে মাতরম্’ গানটিতে ভারতের বন্দনা খুঁজে পাবেন, কিন্তু তিনি জানবেন না যে ওই গানটা প্রথমে ভারতকে নিয়ে রচিত হয়নি, হয়েছিল বাংলাকে নিয়ে, তাতে ত্রিশ কোটির কথা ছিল না, ছিল সপ্ত কোটির কথা।
এসব উন্মাদ পাঠক্রম চলছে। তৃণমূলের ঘর ভাঙছে দুড়দাড় করে। বামপন্থি আর কংগ্রেসের সংযুক্ত মোর্চা এবার একটা নয়, দুটো ভেলকি দেখিয়েছে। এক. ফুরফুরা শরিফের ইমাম আব্বাস সিদ্দিকীর আইএসএফ বা ইন্ডিয়ান সিকিউলার ফ্রন্টকে সঙ্গে নিয়ে। এ নিয়ে তৃণমূল-বিজেপি এবং ‘আস্লি’ ঘিয়ে ভাজা বামপন্থিরা তাদের তুলোধোনা করছে; কিন্তু পশ্চিম বাংলার মুসলিম ভোটারদের মধ্যে যে একটা সাড়া পড়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।
সিদ্দিকীও গরিবের আর আদিবাসীদের অধিকার আর ছেলেমেয়েদের চাকরির কথাই বলছেন বেশি করে। আর দুই. মোর্চার অনেক দল এক দঙ্গল বাচ্চা ছেলেমেয়েকে লড়াইয়ের ময়দানে নামিয়ে দিয়েছে। তারা হারুক-জিতুক, মহাফুর্তিতে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে-দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
পশ্চিম বাংলার স্বঘোষিত কিছু বুদ্ধিজীবী স্লোগান তুলেছিলেন, তৃণমূল দিয়ে বিজেপিকে আটকাতে হবে। এখন তারা দেখছেন, গোটা তৃণমূলটাই বিজেপি প্রায় গিলে নিতে বসেছে। তৃণমূল যে ক’টা সিট জিতবে তা-ও বিজেপি কিনে নেবে। তাই পশ্চিম বাংলার মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য হলেও সংযুক্ত মোর্চা ক্রমেই একটা সম্ভাব্য বিকল্পের চেহারা নিচ্ছে। যে তিন দফা ভোট হলো, তাতে অনেকদিন পরে মানুষ আবার ভোট দিতে পারছে, ভোট লুট হতে দিচ্ছে না।
বাজি কোন্ দিকে ঘুরবে, এখন বলা খুব মুশকিল।
পবিত্র সরকার : ভারতের খ্যাতনামা লেখক; সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা
