করোনা কি আমাদের জন্য ‘ডুমস ডে’ ডেকে আনবে?
jugantor
তৃতীয় মত
করোনা কি আমাদের জন্য ‘ডুমস ডে’ ডেকে আনবে?

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী  

১৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেশ থেকে মৃত্যুর খবর পাই। প্রতিদিন করোনায় এ মৃতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। বুদ্ধিজীবী নিধনও চলছে সমানে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হানাদাররা বুদ্ধিজীবী নিধনের যে কাজটি শেষ করে যেতে পারেনি, সম্ভবত সেই কাজটি শেষ করতে চলেছে করোনা মহামারি। শনিবার (১৭ এপ্রিল) ঘুম থেকে উঠে খবর পেয়েছি, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং কলামিস্ট তারেক শামসুর রেহমান আর নেই।

তিনি সম্ভবত হৃদ্রোগে মারা গেছেন, করোনায় নয়। তবু গত কয়েকদিনে করোনার বুদ্ধিজীবী নিধনের সংখ্যাও কম নয়।

শোক যেন মহাশোক হয়ে গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে। গত কয়েকদিনে আমরা পরপর অথবা প্রায় একসঙ্গে হারিয়েছি প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক, বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুকে। এ শোকের ধাক্কা না কাটতেই মৃত্যুর খবর এসেছে প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও রাজনীতিবিদ কবরী সারোয়ারের।

এখন ঢাকা থেকে টেলিফোন এলেই ভয় পাই। না জানি কার প্রয়াণের খবর নিয়ে টেলিফোনটি এসেছে। কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি সর্বত্রই চলছে করোনার আরও বড় তাণ্ডব। এ তাণ্ডবের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে চলছে রাজ্যের নির্বাচন। প্রাণবাজি রেখে গদির লড়াইয়ে নেমেছেন বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস।

বামফ্রন্ট, ইন্দিরা কংগ্রেসও আছে নির্বাচনে। তবে তাদের অবস্থা পথের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকটা দর্শক সাজার মতো, ক্রীড়ায় মাতামাতি করার ক্ষমতা তাদের নেই।

ঢাকার মতো বুদ্ধিজীবী নিধনের এত বড় তাণ্ডব আর কোথাও করোনা চালিয়েছে কি না আমার জানা নেই। দেড় বছর ধরে করোনা প্রচণ্ড দাপটে তাণ্ডব চালাচ্ছে প্রতিটি দেশে। ফলে ভাবতেও কষ্ট হয়, বিশ্ব কখনো করোনামুক্ত হবে কি না। এ সম্পর্কে করোনা-বিশেষজ্ঞদের অনেক ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হয়েছে। যেসব বিজ্ঞানী গত বছর বলেছিলেন, উইন্টারের পর সামারে ভালো দিন আসছে, তাদের প্রোফেসি অসত্য প্রমাণিত হয়েছে।

অটাম ও সামারে করোনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের ঢেউ এসেছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এসেছে তা আরও মারাত্মক ব্যাধিরূপে। বাংলাদেশ এ মহামারির প্রথম ধাক্কা সাফল্যের সঙ্গে কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার দেশটিতে বিপুল অংশের মধ্যে আপৎকালে সচেতন মন নিয়ে সরকারের এবং ডাক্তারদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শিক্ষা এবং সুযোগ নেই। ফলে সরকারের পক্ষে এ উন্নয়নশীল দেশটিতে করোনার হামলা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের করোনার ধাক্কাটাই বাংলাদেশে ভয়াবহ।

একদিকে অধিকাংশ দেশই তাদের সাধ্যমতো করোনার টিকা বা ভ্যাকসিন জনসাধারণকে দিয়ে চলেছে। অন্যদিকে করোনা তার ছোবল বাড়িয়ে চলেছে। এ অবস্থায় করোনা-পরবর্তী মানবসমাজের কথা কেউ ভাবতেই পারছেন না। ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন নিয়ে তারা কী কথাই আর বলবেন। শুধু কেউ কেউ বলছেন, করোনার পরে যদি মানবসমাজ টিকে থাকে তার চরিত্র ও প্রকৃতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

করোনা আমাদের অনেক অভ্যাস ও স্বভাব বদলে দিয়েছে এবং কিছু নতুন অভ্যাস ও স্বভাব তৈরি করে দিয়েছে। ভবিষ্যতের মানবসমাজ এ পরিবর্তিত স্বভাব ও অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে চলবে। কেউ বলছেন, তাতে মানবসভ্যতার অগ্রগতি হবে। কেউ বলছেন, তাতে সভ্যতা সামনের দিকে এগোবে না। কী হবে তা ভবিষ্যতে যারা বেঁচে থাকবেন, তারা হয়তো জানতে পারবেন।

করোনা মহামারি যে সংকট এনেছে, তা একটি দেশের সংকট নয়, সারা বিশ্বের সংকট। করোনা যেভাবে দ্রুত ভ্যারাইটি বদলাচ্ছে, টিকা দিয়ে তাকে দমন করা যাবে তা কেউ আশা করছেন না। টিকা দীর্ঘস্থায়ী নয় এবং তা মানবদেহে কার্যকর হতে না হতেই নতুন ভ্যারাইটির করোনা আবির্ভূত হতে পারে। তাহলে মানবসভ্যতার টিকে থাকার উপায় কী?

অতি আশাবাদীরা মনে করেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আরও উন্নত টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সক্ষম হবেন। করোনা স্থায়ীভাবে যাবে না বটে, তবে কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়ার মতো মৌসুমি রোগে পরিণত হবে। ফলে বিশ্বের মানুষকেও যক্ষ্মা ও বসন্তের টিকার মতো প্রতিবছর টিকা নিয়ে রোগের হামলা থেকে নিজেদের বাঁচাতে হবে।

এ বিশ্বাসে অনেকেই বিশ্বাসী। বিশ্বে করোনার হামলা শুরু হওয়ার এক বছরের মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা তার প্রাথমিক প্রতিষেধক উদ্ভাবনে সক্ষম হওয়ায় নিকট ভবিষ্যতে তারা বর্তমান ভ্যাকসিনের চেয়ে আরও উন্নত ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সক্ষম হবেন বলে এ বিশ্বাসীরা মনে করেন। তবে এটা সত্য, বিশ্বের মানুষ আর কোনো শতকে বিশ্বব্যাপী এত বড় সংকট ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি।

প্রাচীনকালে নূহের বিশ্বব্যাপী প্লাবনের কথা জানা যায়। সেই প্লাবনও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিল কি না তা জানা যায়নি। বাংলার ১৩৫০ বঙ্গাব্দের ‘গ্রেট ফেমিন’ সারা বিশ্বকে দূরে থাক, সারা উপমহাদেশকেই স্পর্শ করেনি।

গত শতকের (বিশ শতক) বিশ্ব অনেক বড় বড় সংকট পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু করোনা মহামারির কাছে সেগুলো কিছুই নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ইউরোপেই বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলোতে তার প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিন্তু ইউরোপের মতো মহাবিপর্যয় তা নয়। আমেরিকা মহাদেশ অনেকটা মুক্ত ছিল বলা চলে।

গত শতকে আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এ দুই পরাশক্তির মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ, কিউবা সংকট, পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের পতন, আফগান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান ও বিপর্যয়, বাংলাদেশে বাঙালি জতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান ও বিপর্যয়, ইসলামি টেররিস্টদের বিশ্বের বহু দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, মধ্যপ্রাচ্যে তালেবান শক্তির অভ্যুদয় ও পতন, আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা, ইরানের ইসলামি বিপ্লব, সালমান রুশদীর ইসলামবিরোধী বই নিয়ে বিতর্কে ইরানের খোমেনির ফতোয়া ইত্যাদি সারা বিশ্বকে ধ্বংস করবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা হয়নি। গত শতকের এসব বিপদ ও বিপর্যয় সারা বিশ্বকে স্পর্শ করেনি। যেভাবে করেছে করোনা মহামারি বা কোভিড-১৯।

খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থে ‘ডুমস ডে’র কথা আছে। ইসলামে বলা হয়েছে রোজ কেয়ামতের কথা। যেদিন ইসরাফিল ফেরেশতা শিঙা ফুঁকবে, সেদিন সারা বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। অনেক ভীতিগ্রস্ত মানুষ ভাবতে শুরু করেছিলেন, সেই ডুমস ডে অথবা রোজ কেয়ামত হয়তো এসে গেছে। করোনা মহামারি তারই অশনিসংকেত। নইলে সারা বিশ্বে অতীতে আর কখনো এমন মৃত্যুর তাণ্ডব তো শুরু হয়নি।

এমন ভীতি অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আরও কারণ হলো, অনেক অর্থনীতিবিদ বিশ্ববাসীকে এ বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, করোনা মহামারি থেকে যদি তারা বাঁচতেও পারে, তার পরেই আসবে অর্থনৈতিক মন্দার মহাধাক্কা। করোনায় বহু উন্নত দেশেরও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। এ অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে যে সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে তা থেকে হিটলারের চরম দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দলের মতো রাজনৈতিক দল গড়ে উঠে বিশ্বের বহু দেশে ক্ষমতা দখল করতে পারে।

জার্মানিতে আবার এ ফ্যাসিস্ট দলের আবির্ভাবের খবর পাওয়া গেছে। লন্ডনের ডেইলি মেট্রো গত বুধবার খবর দিয়েছে-‘Far right gang plotted to start civil war in Germany’-উগ্র ডানপন্থিরা জার্মানিতে গৃহযুদ্ধ বাধানোর ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। একই ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে ফ্রান্সে এবং ইতালিতে নব্য নাৎসিরা। ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতা দখল করেছে। বাংলাদেশে ধর্মান্ধ রাজনীতি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। অনেকে বলেন, বিশ শতক ছিল বামপন্থাপ্রবণ শতক। কিন্তু বর্তমান একুশ শতক সম্পূর্ণভাবেই উগ্র ডানপন্থি ও স্বৈরাচারীদের যুগ। গত শতকে হয়েছিল কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম ও সুপার পাওয়ারে পরিণত হওয়া এবং ৭০ বছর পর তার পতন। এ শতক দেখছে আমেরিকায় নব্য ফ্যাসিবাদ ও ট্রাম্পইজমের উত্থান।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের মানুষ আশা হারাতে বসেছিল। এ দুঃসময়ে মানুষের বুকে আশা জাগিয়েছেন ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তিনি তার এবারের নববর্ষের বাণীতে বলেছেন- We will meet again- আমরা আবার মিলিত হব। তার এ বাণী লুফে নিয়ে বিশ্বের কবি-সাহিত্যিকরা করোনা জর্জরিত মানুষের মনে আশা, বিশ্বাস, সাহস ফিরিয়ে আনার জন্য কবিতা, গান রচনা করেছেন। বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকরাও তা করেছেন।

ফলে করোনার হামলায় প্রথম যুগে তাকে মোকাবিলার জন্য মানুষের মনে সাহস ও বিশ্বাস ফিরে এসেছিল। বর্তমানে করোনার আরও ভয়াবহ হামলার সময়ে প্রতিটি দেশের কবি-সাহিত্যিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষের মনে সাহস ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে তাদের জীবনে ‘ডুমস ডে’ আসন্ন নয়।

করোনা মানবতার জন্য সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বড় অস্ত্র আর কিছু নেই। সরকার টিকাদানসহ সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষের জীবন বাঁচাবে। করোনার পর যে ভয়ানক অর্থনৈতিক মন্দা ধেয়ে আসছে, তাকে রোখার পরিকল্পনা নেবে (পশ্চিমা দেশগুলো তা করছে), সামাজিক অরাজকতা রোখার জন্য জনগণের শক্তিকে সংহত করে ডানপন্থা ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সরকার নিজেরা প্রস্তুত হবে, জনগণকে প্রস্তুত করবে। মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে সর্বকালের সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য লড়াই করা ছাড়া বাঁচার বিকল্প কোনো পথ নেই।

এজন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এ কাজটি করবে রাজনৈতিক দলগুলো। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য জনগণকে অনুপ্রাণিত করবেন শিল্পী, সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্য ও শিল্পকর্ম দ্বারা। বাংলাদেশে অতীতে দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো ছোট ছোট বিপদ মোকাবিলায় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের এ লড়াকু ভূমিকা আমরা দেখেছি। আজ মানবতার সর্ববৃহৎ ও ভয়ংকর বিপদ রোধে, মানুষের মনে আশা ও সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত করার কাজে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদেরও সেই ভূমিকা নিতে হবে।

১৯৫০ সালে বাংলাদেশে (তখন পূর্ব পাকিস্তান) সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে বাম প্রগতিশীল লেখক সংঘের ভূমিকা আমরা দেখেছি। ’৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধে মুক্তির গান কণ্ঠে ধারণ করে অনেককে আমরা দেখেছি সারা দেশ ভ্রমণ করতে। আজ গোটা মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে তাদের সেই ভূমিকা আমরা দেখতে চাই। হিটলারের কারাগারে বসে মনীষী রোমারোলা লিখেছিলেন-‘বিপদ যত গভীর হোক, মানবতার জয় হবেই।’ আমরাও বিশ্বাস করি, করোনা যতই অকরুণ হোক, মানবতা তার সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হবেই।

লন্ডন ১৮ এপ্রিল, রবিবার

তৃতীয় মত

করোনা কি আমাদের জন্য ‘ডুমস ডে’ ডেকে আনবে?

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
১৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেশ থেকে মৃত্যুর খবর পাই। প্রতিদিন করোনায় এ মৃতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। বুদ্ধিজীবী নিধনও চলছে সমানে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হানাদাররা বুদ্ধিজীবী নিধনের যে কাজটি শেষ করে যেতে পারেনি, সম্ভবত সেই কাজটি শেষ করতে চলেছে করোনা মহামারি। শনিবার (১৭ এপ্রিল) ঘুম থেকে উঠে খবর পেয়েছি, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং কলামিস্ট তারেক শামসুর রেহমান আর নেই।

তিনি সম্ভবত হৃদ্রোগে মারা গেছেন, করোনায় নয়। তবু গত কয়েকদিনে করোনার বুদ্ধিজীবী নিধনের সংখ্যাও কম নয়।

শোক যেন মহাশোক হয়ে গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে। গত কয়েকদিনে আমরা পরপর অথবা প্রায় একসঙ্গে হারিয়েছি প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক, বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুকে। এ শোকের ধাক্কা না কাটতেই মৃত্যুর খবর এসেছে প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও রাজনীতিবিদ কবরী সারোয়ারের।

এখন ঢাকা থেকে টেলিফোন এলেই ভয় পাই। না জানি কার প্রয়াণের খবর নিয়ে টেলিফোনটি এসেছে। কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি সর্বত্রই চলছে করোনার আরও বড় তাণ্ডব। এ তাণ্ডবের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে চলছে রাজ্যের নির্বাচন। প্রাণবাজি রেখে গদির লড়াইয়ে নেমেছেন বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস।

বামফ্রন্ট, ইন্দিরা কংগ্রেসও আছে নির্বাচনে। তবে তাদের অবস্থা পথের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকটা দর্শক সাজার মতো, ক্রীড়ায় মাতামাতি করার ক্ষমতা তাদের নেই।

ঢাকার মতো বুদ্ধিজীবী নিধনের এত বড় তাণ্ডব আর কোথাও করোনা চালিয়েছে কি না আমার জানা নেই। দেড় বছর ধরে করোনা প্রচণ্ড দাপটে তাণ্ডব চালাচ্ছে প্রতিটি দেশে। ফলে ভাবতেও কষ্ট হয়, বিশ্ব কখনো করোনামুক্ত হবে কি না। এ সম্পর্কে করোনা-বিশেষজ্ঞদের অনেক ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হয়েছে। যেসব বিজ্ঞানী গত বছর বলেছিলেন, উইন্টারের পর সামারে ভালো দিন আসছে, তাদের প্রোফেসি অসত্য প্রমাণিত হয়েছে।

অটাম ও সামারে করোনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের ঢেউ এসেছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এসেছে তা আরও মারাত্মক ব্যাধিরূপে। বাংলাদেশ এ মহামারির প্রথম ধাক্কা সাফল্যের সঙ্গে কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার দেশটিতে বিপুল অংশের মধ্যে আপৎকালে সচেতন মন নিয়ে সরকারের এবং ডাক্তারদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শিক্ষা এবং সুযোগ নেই। ফলে সরকারের পক্ষে এ উন্নয়নশীল দেশটিতে করোনার হামলা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের করোনার ধাক্কাটাই বাংলাদেশে ভয়াবহ।

একদিকে অধিকাংশ দেশই তাদের সাধ্যমতো করোনার টিকা বা ভ্যাকসিন জনসাধারণকে দিয়ে চলেছে। অন্যদিকে করোনা তার ছোবল বাড়িয়ে চলেছে। এ অবস্থায় করোনা-পরবর্তী মানবসমাজের কথা কেউ ভাবতেই পারছেন না। ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন নিয়ে তারা কী কথাই আর বলবেন। শুধু কেউ কেউ বলছেন, করোনার পরে যদি মানবসমাজ টিকে থাকে তার চরিত্র ও প্রকৃতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

করোনা আমাদের অনেক অভ্যাস ও স্বভাব বদলে দিয়েছে এবং কিছু নতুন অভ্যাস ও স্বভাব তৈরি করে দিয়েছে। ভবিষ্যতের মানবসমাজ এ পরিবর্তিত স্বভাব ও অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে চলবে। কেউ বলছেন, তাতে মানবসভ্যতার অগ্রগতি হবে। কেউ বলছেন, তাতে সভ্যতা সামনের দিকে এগোবে না। কী হবে তা ভবিষ্যতে যারা বেঁচে থাকবেন, তারা হয়তো জানতে পারবেন।

করোনা মহামারি যে সংকট এনেছে, তা একটি দেশের সংকট নয়, সারা বিশ্বের সংকট। করোনা যেভাবে দ্রুত ভ্যারাইটি বদলাচ্ছে, টিকা দিয়ে তাকে দমন করা যাবে তা কেউ আশা করছেন না। টিকা দীর্ঘস্থায়ী নয় এবং তা মানবদেহে কার্যকর হতে না হতেই নতুন ভ্যারাইটির করোনা আবির্ভূত হতে পারে। তাহলে মানবসভ্যতার টিকে থাকার উপায় কী?

অতি আশাবাদীরা মনে করেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আরও উন্নত টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সক্ষম হবেন। করোনা স্থায়ীভাবে যাবে না বটে, তবে কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়ার মতো মৌসুমি রোগে পরিণত হবে। ফলে বিশ্বের মানুষকেও যক্ষ্মা ও বসন্তের টিকার মতো প্রতিবছর টিকা নিয়ে রোগের হামলা থেকে নিজেদের বাঁচাতে হবে।

এ বিশ্বাসে অনেকেই বিশ্বাসী। বিশ্বে করোনার হামলা শুরু হওয়ার এক বছরের মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা তার প্রাথমিক প্রতিষেধক উদ্ভাবনে সক্ষম হওয়ায় নিকট ভবিষ্যতে তারা বর্তমান ভ্যাকসিনের চেয়ে আরও উন্নত ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সক্ষম হবেন বলে এ বিশ্বাসীরা মনে করেন। তবে এটা সত্য, বিশ্বের মানুষ আর কোনো শতকে বিশ্বব্যাপী এত বড় সংকট ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি।

প্রাচীনকালে নূহের বিশ্বব্যাপী প্লাবনের কথা জানা যায়। সেই প্লাবনও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিল কি না তা জানা যায়নি। বাংলার ১৩৫০ বঙ্গাব্দের ‘গ্রেট ফেমিন’ সারা বিশ্বকে দূরে থাক, সারা উপমহাদেশকেই স্পর্শ করেনি।

গত শতকের (বিশ শতক) বিশ্ব অনেক বড় বড় সংকট পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু করোনা মহামারির কাছে সেগুলো কিছুই নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ইউরোপেই বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলোতে তার প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিন্তু ইউরোপের মতো মহাবিপর্যয় তা নয়। আমেরিকা মহাদেশ অনেকটা মুক্ত ছিল বলা চলে।

গত শতকে আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এ দুই পরাশক্তির মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ, কিউবা সংকট, পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের পতন, আফগান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান ও বিপর্যয়, বাংলাদেশে বাঙালি জতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান ও বিপর্যয়, ইসলামি টেররিস্টদের বিশ্বের বহু দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, মধ্যপ্রাচ্যে তালেবান শক্তির অভ্যুদয় ও পতন, আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা, ইরানের ইসলামি বিপ্লব, সালমান রুশদীর ইসলামবিরোধী বই নিয়ে বিতর্কে ইরানের খোমেনির ফতোয়া ইত্যাদি সারা বিশ্বকে ধ্বংস করবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা হয়নি। গত শতকের এসব বিপদ ও বিপর্যয় সারা বিশ্বকে স্পর্শ করেনি। যেভাবে করেছে করোনা মহামারি বা কোভিড-১৯।

খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থে ‘ডুমস ডে’র কথা আছে। ইসলামে বলা হয়েছে রোজ কেয়ামতের কথা। যেদিন ইসরাফিল ফেরেশতা শিঙা ফুঁকবে, সেদিন সারা বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। অনেক ভীতিগ্রস্ত মানুষ ভাবতে শুরু করেছিলেন, সেই ডুমস ডে অথবা রোজ কেয়ামত হয়তো এসে গেছে। করোনা মহামারি তারই অশনিসংকেত। নইলে সারা বিশ্বে অতীতে আর কখনো এমন মৃত্যুর তাণ্ডব তো শুরু হয়নি।

এমন ভীতি অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আরও কারণ হলো, অনেক অর্থনীতিবিদ বিশ্ববাসীকে এ বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, করোনা মহামারি থেকে যদি তারা বাঁচতেও পারে, তার পরেই আসবে অর্থনৈতিক মন্দার মহাধাক্কা। করোনায় বহু উন্নত দেশেরও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। এ অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে যে সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে তা থেকে হিটলারের চরম দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দলের মতো রাজনৈতিক দল গড়ে উঠে বিশ্বের বহু দেশে ক্ষমতা দখল করতে পারে।

জার্মানিতে আবার এ ফ্যাসিস্ট দলের আবির্ভাবের খবর পাওয়া গেছে। লন্ডনের ডেইলি মেট্রো গত বুধবার খবর দিয়েছে-‘Far right gang plotted to start civil war in Germany’-উগ্র ডানপন্থিরা জার্মানিতে গৃহযুদ্ধ বাধানোর ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। একই ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে ফ্রান্সে এবং ইতালিতে নব্য নাৎসিরা। ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতা দখল করেছে। বাংলাদেশে ধর্মান্ধ রাজনীতি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। অনেকে বলেন, বিশ শতক ছিল বামপন্থাপ্রবণ শতক। কিন্তু বর্তমান একুশ শতক সম্পূর্ণভাবেই উগ্র ডানপন্থি ও স্বৈরাচারীদের যুগ। গত শতকে হয়েছিল কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম ও সুপার পাওয়ারে পরিণত হওয়া এবং ৭০ বছর পর তার পতন। এ শতক দেখছে আমেরিকায় নব্য ফ্যাসিবাদ ও ট্রাম্পইজমের উত্থান।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের মানুষ আশা হারাতে বসেছিল। এ দুঃসময়ে মানুষের বুকে আশা জাগিয়েছেন ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তিনি তার এবারের নববর্ষের বাণীতে বলেছেন- We will meet again- আমরা আবার মিলিত হব। তার এ বাণী লুফে নিয়ে বিশ্বের কবি-সাহিত্যিকরা করোনা জর্জরিত মানুষের মনে আশা, বিশ্বাস, সাহস ফিরিয়ে আনার জন্য কবিতা, গান রচনা করেছেন। বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকরাও তা করেছেন।

ফলে করোনার হামলায় প্রথম যুগে তাকে মোকাবিলার জন্য মানুষের মনে সাহস ও বিশ্বাস ফিরে এসেছিল। বর্তমানে করোনার আরও ভয়াবহ হামলার সময়ে প্রতিটি দেশের কবি-সাহিত্যিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষের মনে সাহস ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে তাদের জীবনে ‘ডুমস ডে’ আসন্ন নয়।

করোনা মানবতার জন্য সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বড় অস্ত্র আর কিছু নেই। সরকার টিকাদানসহ সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষের জীবন বাঁচাবে। করোনার পর যে ভয়ানক অর্থনৈতিক মন্দা ধেয়ে আসছে, তাকে রোখার পরিকল্পনা নেবে (পশ্চিমা দেশগুলো তা করছে), সামাজিক অরাজকতা রোখার জন্য জনগণের শক্তিকে সংহত করে ডানপন্থা ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সরকার নিজেরা প্রস্তুত হবে, জনগণকে প্রস্তুত করবে। মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে সর্বকালের সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য লড়াই করা ছাড়া বাঁচার বিকল্প কোনো পথ নেই।

এজন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এ কাজটি করবে রাজনৈতিক দলগুলো। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য জনগণকে অনুপ্রাণিত করবেন শিল্পী, সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্য ও শিল্পকর্ম দ্বারা। বাংলাদেশে অতীতে দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো ছোট ছোট বিপদ মোকাবিলায় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের এ লড়াকু ভূমিকা আমরা দেখেছি। আজ মানবতার সর্ববৃহৎ ও ভয়ংকর বিপদ রোধে, মানুষের মনে আশা ও সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত করার কাজে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদেরও সেই ভূমিকা নিতে হবে।

১৯৫০ সালে বাংলাদেশে (তখন পূর্ব পাকিস্তান) সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে বাম প্রগতিশীল লেখক সংঘের ভূমিকা আমরা দেখেছি। ’৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধে মুক্তির গান কণ্ঠে ধারণ করে অনেককে আমরা দেখেছি সারা দেশ ভ্রমণ করতে। আজ গোটা মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে তাদের সেই ভূমিকা আমরা দেখতে চাই। হিটলারের কারাগারে বসে মনীষী রোমারোলা লিখেছিলেন-‘বিপদ যত গভীর হোক, মানবতার জয় হবেই।’ আমরাও বিশ্বাস করি, করোনা যতই অকরুণ হোক, মানবতা তার সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হবেই।

লন্ডন ১৮ এপ্রিল, রবিবার

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস