Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার উদ্যোগী পুরুষ

Advertisement

Icon

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার উদ্যোগী পুরুষ

Advertisement

ইতিহাসকে ভিন্ন মাত্রায় ভিন্ন তাৎপর্যের উপস্থাপন করেছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ।

পণ্ডিতপ্রবর এই মানুষটি চিরবিদায় নিলেন ২৮ এপ্রিল, ২০২৩ সন্ধ্যায়। তার জীবনাবসান হয়েছিল অস্ট্রিয়ায় নিজ বাসগৃহে।

যদি তিনি আরও ২৫ দিন জীবিত থাকতেন, তাহলে শতবর্ষ স্পর্শ করতে পারতেন। রণজিৎ গুহের জন্ম হয়েছিল ১৯২৩ সালের ২৩ মে বাংলাদেশের সে সময়কার বাখরগঞ্জ জেলার সিদ্ধকাটি গ্রামে। রণজিৎ গুহ ইতিহাস চর্চায় এবং ইতিহাস বিদ্যার ক্ষেত্রে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন।

এই ধারাটি হলো ‘নিম্নবর্গের অধ্যয়ন’। ইতিহাস রচনার এ ধারাটি ক্রমান্বয়ে বিস্তার লাভ করছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিহাস বিদ্যার (হিস্টোরিওগ্রাফি) এ ধারাটি ক্রমান্বয়ে প্রসার লাভ করছে। এ কারণে ইতিহাস বিদ্যার যে কোনো আলোচনা কিংবা গবেষণায় রণজিৎ গুহের নামটি উজ্জ্বলভাবে আমাদের সামনে আসবে।

রণজিৎ গুহ রাজনীতি ও গবেষণার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বিকশিত হয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে ঢোকার পর খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সুশোভন সরকারের সান্নিধ্যে এসেছিলেন তিনি। যোগ দেন কমিউনিস্ট ছাত্রসংগঠনে। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি পার্টির সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন। পার্টির সদস্য হিসাবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত তিনি প্যারিসের বিশ্ব গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। একইসঙ্গে তিনি গবেষণা করেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে শিল্প, কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস নিয়ে। এটা ছিল তার পিএইচডি গবেষণা। এ গবেষণার কাজটিতে তিনি প্রাণমন ঢেলে দিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি চলছিল কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলন সংগ্রামের দায়িত্ব পালন।

মার্কসবাদের চর্চা তাকে উদ্বুদ্ধ করে নিম্নবর্গের ইতিহাস রচনায়। ১৯৬৮ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন চেকোস্লোভাকিয়ায় আগ্রাসন চালায়। রণজিৎ গুহ এটা মেনে নেননি। প্রতিবাদে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বের হয়ে আসেন। ১৯৫৯ সালে রণজিৎ গুহ চলে যান ব্রিটেনে। সেখানে ম্যানচেস্টার ও সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। ১৯৭০ সালে বছরখানেকের জন্য তিনি ভারতে আসেন। নকশাল আন্দোলন এবং একদল তরুণ নকশালপন্থি ছাত্রের সংস্পর্শে এসে তিনি বদলে যান। নকশাল আন্দোলনের প্রধান ফোকাস ছিল কৃষক আন্দোলনের ওপর। এই বিপ্লবী তত্ত্বে বলা হয়েছিল, গ্রাম থেকে শহর ঘেরাও করে সর্বহারা শ্রেণি তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। এ অভিজ্ঞতার পর রণজিৎ গুহ তার গবেষণার বিষয়বস্তু হিসাবে কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। এ ইতিহাস রচনার তাত্ত্বিক কাঠামো হিসাবে যে গ্রন্থটি তিনি ১৯৮৩ সালে প্রকাশ করেন, তার শিরোনাম হলো ‘দি এলিমেন্টারি আসপেক্টস অব পিজেন্ট ইনসার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া।’ এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। এই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘‘The discourse on peasant insurgency thus made its representation of the past as linear and secular rather than cyclical and mythic it had nothing but reasons of state as its raison d'etre. Drafted into the service of the regime as a direct instrument of its will it did not even bother to conceal its partisan character. Indeed, it of the merged, both in its narrative and analytic forms, into what was explicitly official writing. For administrative practice turned it into a convention that a magistrate or a judge should construe his report on a local uprising as a historical narrative, as witness the classic series, 'Narrative of Events', produced by the heads of the districts caught up in the disturbances of the mutiny years. and again casual explanation used in the west of arrive at what its practitioners beloved to be the his to recall truth, served in colonialist historiography merely as an apology for law and order the truth of the force by which the British had annexed the subcontinent.”

রণজিৎ গুহ ‘একটি অসুরের কাহিনী’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণদের বিশ্লেষণই শেষ কথা নয়। ব্রাহ্মণদের নিন্দায় দূষণ আর লুণ্ঠনের অপরাধে চিহ্নিত রাহু বহু অনুগামী খুঁজে পায় তাদের মধ্যে, হিন্দু ধর্মের স্তর বিন্যাসে যাদের স্থান নিম্নতম ধাপে। এ বিষয়ে ঔপনিবেশিক পর্যায় থেকে আমরা কিছু তথ্য পাই : তা একাধারে প্রভূত এবং অভ্রান্ত। উনিশ শতকের শুরুতে বিউক্যানান হ্যামিল্টনের পর্যবেক্ষণ থেকে ব্রিটিশ রাজের শেষ পাঁচ দশকে বহু আমলা এবং নৃ-তত্ত্ববিদের বর্ণনায় এসব তথ্য ছড়িয়ে আছে। সেই তথ্য প্রমাণ করে যে, গ্রহণ পূজার অস্তিত্ব একান্ত প্রাচীন এবং ডোম, দোসাদ, ভাঙ্গি আর মাঙ্গ প্রভৃতি জাতির বিশ্বাসের জগতে আজও তা এক কার্যকর উপাদান।

অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং জীবনযাত্রার বিন্যাসে এই জাতিগুলো নানাভাবেই পৃথক এবং বিভক্ত। কিন্তু সবাই মিলে তারা যে গোষ্ঠী গড়ে তোলে, ব্রিকসের প্রামাণ্য পুস্তিকায় তাকে বলা হয়েছে ডোম। এরা এক গোষ্ঠী, কারণ অর্থনৈতিক অবনতি, সামাজিক কলংক চিহ্ন এবং আচার অনুষ্ঠানের অসূচিতে এদের প্রত্যেকেরই এক দশা। ৭৫ বছর আগে এক পর্যবেক্ষক তাদের অবস্থান বর্ণনায় লিখেছিলেন : ডোম জন্মায় অড়হর খেতে। ছোটবেলা থেকেই সে চুরি করতে শেখে। জীবনের প্রথম থেকেই সে অতীতের মতো ঘুরে বেড়ায়। মাথার ওপর ছাদ ছাড়াই সে বাঁচে, থাকে না পরের দিনের অন্নের কোনো সংস্থান। পুলিশের তাড়নায় জীবনভর সে পালিয়ে বেড়ায় এক শিবির থেকে অন্য শিবিরে। গ্রাম থেকে সে সদাই বহিষ্কৃত। ... সে আছে হিন্দু ধর্মের নাগালের বাইরে ... সভ্যতার অগ্রগতি তাকে শুধু আরও অবনমনের দিকেই ঠেলে দিয়েছে।’ ... এ কথা স্পষ্ট যে কালের ধারায় ডোমেদের অবস্থা বদলায়নি। তারা সমাজের প্রান্তে ভবঘুরের জীবনেই দণ্ডিত। প্রাচীন আইন প্রণেতার বিধান ছিল, ‘এরা সর্বদা ভ্রমণ করবে’ : আজ বিশ শতকেও তাদের একই দশা। ঘুরে বেড়ানোর এই স্পৃহা যেন শাস্ত্রের নির্দেশের মতো : ইংরেজ আমলের সরকারি লেখাপত্রে এই স্পৃহাকেই মনে হয় স্বভাবের অঙ্গ। পবিত্র জ্ঞান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞান, এই অগ্রগতি দেড় হাজার বছরে নৃ-তত্ত্ব বর্ণনার পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে। ধর্মীয় প্রাচীন থেকে সমাজতাত্ত্বিক আধুনিকে এ বিবর্তন এবং দীর্ঘকালীন ইতিহাসের ধারায় রক্ষণশীল শক্তি, এরা বৈপরীত্যের সম্পর্কেই যুক্ত। কৃষি সমাজে অথবা তার ভাব জগতে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রাধান্য : এই প্রাধান্যের অভ্যন্তরে বিলীন হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল দেশজ, আদিবাসী সম্প্রদায়।’ ডোমরা সমাজের নিম্নবর্গে অবস্থান করছে প্রাচীনকাল থেকেই। বর্ণ বিভেদমূলক হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য জারি আছে যুগ যুগ ধরে এমন ব্রাহ্মন্ন আধিপত্যের বিরুদ্ধে ডোমদের মতো নিগৃহীত গোষ্ঠীও প্রতিবাদ করতে পারে স্ব-অস্তিত্ব বজায় রাখতে। ব্রাহ্মণ্যবাদের সমাজে অধস্তনদের অধিকার খুব সহজে পালটায় না। সভ্যতার অগ্রগতি সত্ত্বেও।

রণজিৎ গুহের পিএইচডি থিসিসের শিরোনাম ছিল, এ রুল অব প্রোপার্টি ফর বেঙ্গল। এর কথা ইতোমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে। রণজিৎ গুহ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গভীরে প্রবেশ করে এর দার্শনিক ভিত্তি সন্ধান করেছেন। তার মতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিশাসিত বাংলায় যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয়েছিল তার মূলে ছিল ফরাসি ফিজিওক্র্যাটদের প্রভাব। স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস, আলেকজান্ডার দাউ প্রমুখ ব্যক্তি বাংলার জন্য কৃষিব্যবস্থার সুপারিশ করতে গিয়ে ফ্রান্সের ফিজিওক্র্যাটদের চিন্তাভাবনার আলোকে প্রভাবিত ছিলেন।

রণজিৎ গুহের দৃষ্টিতে ভারতবর্ষ বা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস লেখার সংকট শুধু উপনিবেশের পণ্ডিতদের মধ্যেই নয়, ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী, এমনকি মার্কসবাদী ইতিহাসবিদদের মনের গভীরেও বাসা বেঁধে আছে। তাদের ইতিহাস নতুন সাজ-পোশাকে অভিজাতদেরই ইতিহাস। দৃশ্যমান আন্দোলনের বিপরীতে ভাষাহীনদের অদৃশ্য আবেগ আর চর্চার মধ্যে ইতিহাসের সত্য লুকিয়ে আছে (সাজ্জাদ শরীফ, প্রথম আলো)। ইতিহাসের সত্য কোথায় লুকিয়ে আছে তা শুধু ইতিহাসবিদদের মাথাব্যথা নয়। যে রাজনীতিতে রাষ্ট্রক্ষমতা অদল-বদল হয়, সেখানেও ইতিহাসের সত্য উপলব্ধি করতে পারলে সামাজিক রূপান্তরের সমস্যা অনেকাংশে কেটে যায়।

রণজিৎ গুহের জন্য ইতিহাসচর্চার বিশ্লেষণগত কাঠামো এসব চিন্তাভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং গড়ে ওঠে। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি সাব অলটর্ন স্টাডিজ শিরোনামের সংকলনটি সম্পাদনা করতে শুরু করেন। রণজিৎ গুহের পদচিহ্ন অনুসরণ করে যারা নতুন পথে চলতে শুরু করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন দিপেশ চক্রবর্তী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র, শাহিদ আমিন, ডেভিড হার্ডিম্যান, জ্ঞানেন্দ্রপান্ডে এবং বিনা দাশ প্রমুখ ইতিহাসবিদ। ১৯৮০ সালে রণজিৎ গুহ যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তারপর তিনি যোগ দেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। তিনি বিশ্বের বেশকিছু নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি বক্তা হিসাবে বক্তৃতা করেছেন। ২০০৯ সালে ৪৫তম সমাবর্তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিলিট উপাধি দিয়ে তাকে সম্মানিত করে। ইতিহাসের অধ্যাপক ড. আহমদ কামালের প্রস্তাবে এবং আমার সমর্থনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল রণজিৎ গুহকে ডিলিট দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করে।

রণজিৎ গুহ শেষ বয়সে একটি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালের পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন কোণ থেকে নিমন্ত্রণে সাড়া দেননি। নিজেকে নিজের একান্ত জগতে স্ত্রী মেখধিল্ডকে নিয়ে গুটিয়ে থাকেন। তার শেষ আবাস ছিল অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা। ১৯৯৯ সালের পরে তিনি যা কিছু লিখেছেন, সেসব ছিল বাংলা ভাষায় লেখা। এই পণ্ডিত ব্যক্তিটিকে নিয়ে বাংলাদেশে খুব কমই আলোচনা হয়। অথচ তিনি ছিলেন বাংলাদেশেরই সন্তান।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ .রণজিৎ গুহ.

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম