Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

Icon

ড. একেএম আহসান উল্লাহ

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

Advertisement

একটি দোকানে ক্রেতার সঙ্গে দুর্ব্যবহার হলে ক্ষতিটি শুধু তার মনখারাপের মধ্যে সীমিত থাকে না। তিনি কেনাকাটা বাদ দিতে পারেন, অন্য দোকানে যেতে পারেন এবং পরিচিতদেরও সেখানে যেতে নিরুৎসাহিত করতে পারেন। একইভাবে পর্যটকের সঙ্গে হয়রানিমূলক আচরণ একটি হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র কিংবা দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, সৌজন্যের অর্থনৈতিক মূল্য আছে, অসৌজন্যেরও মূল্য দিতে হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনায় অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ হলেও দৈনন্দিন আচরণ কীভাবে অর্থনৈতিক ফলাফলকে প্রভাবিত করে, সেই প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।

এখানে ‘সৌজন্যভিত্তিক অর্থনীতি’ বলতে এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ বোঝানো হচ্ছে, যেখানে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্য ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তাবোধ লেনদেনকে সহজ করে। এর অর্থ শুধু হাসিমুখে কথা বলা নয়। নির্ধারিত দাম জানানো, প্রতিশ্রুত সেবা দেওয়া, অভিযোগ শোনা, লাইন মানা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাও এর অন্তর্ভুক্ত। তবে অসৌজন্য, প্রতারণা, যৌন হয়রানি ও সহিংসতাকে এক করে দেখা ঠিক নয়। শেষের আচরণগুলো অনেক গুরুতর এবং আইনগত প্রতিকার দাবি করে। অর্থনৈতিক আলোচনায় এগুলোর সংযোগ হলো : প্রতিটিই ভিন্নমাত্রায় আস্থা, অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তাকে ক্ষয় করতে পারে।

বাংলাদেশে অসৌজন্যের কারণে বছরে মোট কত টাকা ক্ষতি হয়, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সমন্বিত হিসাব এখানে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। তাই জাতীয় ক্ষতির একটি অঙ্ক দেওয়া যুক্তিসংগত হবে না। বরং গবেষণালব্ধ প্রমাণ এবং স্পষ্ট অর্থনৈতিক কার্যকারণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন। ক্ষতি প্রধানত কয়েকটি পথে ঘটে : বিক্রি কমে, গ্রাহক হারায়, কর্মীর উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, লেনদেনে সময় ও অর্থ বেশি লাগে এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হয় না। শেষের ক্ষতিটি সবচেয়ে কম দৃশ্যমান-যে পর্যটক এলেন না বা যে ক্রেতা আর ফিরলেন না, তাদের অনুপস্থিতি সাধারণ হিসাবখাতায় ধরা পড়ে না।

গ্রাহকসেবায় আচরণের গুরুত্ব সম্পর্কে আন্তর্জাতিক গবেষণা তাৎপর্যপূর্ণ। ক্রিস্টিন পোরাথ, ডেবি ম্যাকইনিস ও ভ্যালেরি ফোকসের ২০১০ সালের গবেষণায় দেখা যায়, কর্মীদের পরস্পরের প্রতি অসৌজন্য দেখেও ভোক্তারা পুরো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেন। অর্থাৎ গ্রাহক নিজে অপমানিত না হলেও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে বিদেশে পরিচালিত গবেষণার ফল থেকে বাংলাদেশের ক্ষতির নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা যায় না, এটি ক্ষতির একটি কার্যপ্রক্রিয়া বুঝতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের ব্যাংক, বিপণিবিতান, রেস্তোরাঁ কিংবা পরিবহণ প্রতিষ্ঠানের জন্যও সেই কার্যপ্রক্রিয়াটি বিবেচনাযোগ্য।

ধরা যাক, একটি রেস্তোরাঁয় খাবার নিয়ে অভিযোগ করার পর ক্রেতাকে অপমান করা হলো। এটি একটি ব্যাখ্যামূলক উদাহরণ, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঘটনা নয়। রেস্তোরাঁটি হয়তো সেদিনের বিল আদায় করল, কিন্তু ভবিষ্যতের কয়েকটি পারিবারিক আয়োজন হারাল। বিপরীতে, অভিযোগ শুনে ভুল সংশোধন করলে তাৎক্ষণিক কিছু খরচ হতে পারে, অথচ দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রক্ষা পায়। অর্থনৈতিক বিচারে তাই একটি অভিযোগের মূল্য শুধু ফেরত দেওয়া টাকার সমান নয়; এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ ক্রয়, সুপারিশ এবং আস্থার সম্পর্ক যুক্ত। গ্রাহকসেবাকে কেবল ব্যয় হিসাবে দেখলে এ সম্ভাব্য আয় উপেক্ষিত হয়।

সুনামের ক্ষতিতে আরও একটি সমস্যা আছে। একজনের আচরণের মূল্য অন্যরাও দিতে পারেন। কোনো পর্যটন এলাকায় কয়েকজন সেবাদাতা হয়রানি করলে সেখানকার দায়িত্বশীল হোটেলমালিক, দোকানি ও পরিবহণকর্মীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। দর্শনার্থী সব প্রতিষ্ঠান আলাদা করে যাচাই করার সুযোগ পান না; সীমিত অভিজ্ঞতা থেকে পুরো গন্তব্য সম্পর্কে ধারণা করেন। ফলে অসৌজন্য একটি সামাজিক ব্যয় তৈরি করে-যিনি আচরণটি করছেন, তিনি তার সম্পূর্ণ খরচ বহন করছেন না। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির সম্মিলিত আচরণবিধি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন হওয়ার এটি একটি অর্থনৈতিক যুক্তি।

পর্যটনে এ সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ শুধু সমুদ্র, পাহাড় বা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে যান না, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ মিলিয়ে একটি অভিজ্ঞতা কেনেন। বাংলাদেশের ৩১৪ জন পর্যটকের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় নিরাপত্তা ও সন্তুষ্টির মধ্যে এবং সন্তুষ্টি ও পুনরায় ভ্রমণের ইচ্ছার মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে নিরাপত্তা থেকে পুনরায় ভ্রমণের ইচ্ছার সরাসরি সম্পর্কটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। এই পার্থক্য মনে রাখা জরুরি-নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পর্যটকের সিদ্ধান্ত গড়ে ওঠে সামগ্রিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

কক্সবাজার, সিলেট বা অন্য কোনো গন্তব্যের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য মূল্যতালিকা, সম্মানজনক যোগাযোগ এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা সেই অভিজ্ঞতা উন্নত করতে পারে। অপরিচিত জায়গায় একজন দর্শনার্থী যদি বারবার দরদাম, অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ বা অভিযোগের পর প্রতিকূল আচরণের আশঙ্কা করেন, তাহলে তার মানসিক ও আর্থিক ব্যয় বাড়ে। তিনি কম সময় থাকতে পারেন, কিছু সেবা এড়িয়ে যেতে পারেন অথবা পরবর্তী সফরে অন্য গন্তব্য বেছে নিতে পারেন। এগুলো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া; বাংলাদেশে প্রতিটির আকার নির্ধারণে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন। শুধু পর্যটন প্রচারণা দিয়ে এমন অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণ করা কঠিন।

নিরাপত্তাবোধের অর্থনৈতিক গুরুত্ব দেশীয় নাগরিকের ক্ষেত্রেও সমান। বিশেষত নারীর চলাচলে হয়রানি কাজ, শিক্ষা ও কেনাকাটায় অংশগ্রহণের ব্যয় বাড়াতে পারে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত ব্র্যাকের একটি গবেষণার সংবাদবিবরণী অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫৭ নারীর ৯৪ শতাংশ সড়ক বা গণপরিবহণে যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানান। এটি নির্দিষ্ট এলাকা ও নমুনার ফল, বাংলাদেশের সব নারীর জাতীয় হার হিসাবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। তবু ফলটি চলাচলের পরিবেশে গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। যৌন হয়রানিকে নিছক ‘খারাপ ব্যবহার’ বলেও হালকা করা চলে না।

এ ধরনের পরিবেশে কেউ নিরাপদ বাহনের জন্য বেশি ভাড়া দিতে পারেন, দূরের চাকরি এড়িয়ে যেতে পারেন অথবা সন্ধ্যার পর কাজের সুযোগ গ্রহণে অনিচ্ছুক হতে পারেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্ভাব্য উৎস আলাদা : বাড়তি যাতায়াত ব্যয়, কম কর্মঘণ্টা কিংবা যোগ্যতার উপযুক্ত কাজ না পাওয়া। পরিবারের একজন সদস্যকে সঙ্গে যেতে হলে তার সময়ও ব্যয় হয়। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জনপরিসরের সুফল ব্যক্তির স্বস্তির বাইরে বিস্তৃত। এটি শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং পরিবারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে সহজ করার একটি শর্ত। তবে এসব প্রভাবের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অনুমান ছাড়া ঘোষণা করা উচিত নয়।

কর্মক্ষেত্রের ভেতরেও অসৌজন্যের মূল্য আছে। সহকর্মীকে অপমান, অধস্তনের কথা উপেক্ষা বা প্রকাশ্যে হেয় করা সমস্যার তথ্য ব্যবস্থাপকের কাছে পৌঁছাতে বাধা দিতে পারে। কর্মী যদি ভুলের কথা বলতে ভয় পান, তাহলে সংশোধন দেরিতে হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। গ্রাহকের সামনে কর্মীদের প্রতি অসম্মান প্রতিষ্ঠানের বাইরের ধারণাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে-যার পক্ষে উল্লিখিত ভোক্তা গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের জন্য এখানে বাস্তব প্রশ্ন হলো : ব্যবস্থাপনার আচরণ কি কর্মীকে সমস্যা সমাধানে উৎসাহিত করছে, নাকি সমস্যা আড়াল করতে শেখাচ্ছে? সম্মানজনক নেতৃত্বকে তাই সেবার মান নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসাবে দেখা প্রয়োজন।

তবে সব দায় সামনের সারির কর্মীর ওপর চাপানো বস্তুনিষ্ঠ হবে না। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অপর্যাপ্ত জনবল, অস্পষ্ট নিয়ম এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সীমিত ক্ষমতা সেবার পরিবেশকে কঠিন করতে পারে। গ্রাহকের দুর্ব্যবহার থেকেও কর্মীকে সুরক্ষা দিতে হবে। একইভাবে দাপ্তরিক সেবায় অস্পষ্ট নির্দেশনা ও বারবার আসার প্রয়োজন নাগরিক ও ব্যবসার সময় ব্যয় করে; শুধু বিনয়ী ভাষা সেই সমস্যা দূর করবে না। কার্যকর সৌজন্যের সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষতা, পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ম এবং দায়িত্বশীল সেবা। ভদ্র আচরণের প্রশিক্ষণ তখনই কার্যকর হবে, যখন প্রতিষ্ঠানের কাজের ব্যবস্থাও ভালো সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

বাংলাদেশে পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে পরিমাপযোগ্য কয়েকটি ব্যবস্থা দিয়ে : সহজ ভাষায় সেবার নিয়ম ও মূল্য প্রকাশ, অভিযোগ গ্রহণের নির্দিষ্ট পথ, নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং কর্মী ও গ্রাহক উভয়ের জন্য আচরণবিধি। পর্যটন এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের যৌথভাবে অভিযোগের ধরন এবং সমাধানের ফল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু মোট বিক্রি নয়, পুনরায় আসা গ্রাহকের অনুপাত, অভিযোগের পুনরাবৃত্তি এবং কর্মী চলে যাওয়ার কারণও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এতে সৌজন্যের অর্থনৈতিক সুফল সম্পর্কে স্থানীয় প্রমাণ তৈরি হবে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতারও প্রশ্ন : মানুষ যেখানে সম্মান, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা পায়, সেখানে লেনদেন এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।

ড. একেএম আহসান উল্লাহ : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন, ইউনিভারসিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

প্রকল্পগুলো ঘাস খায় না

প্রকল্পগুলো ঘাস খায় না

সম্মিলিত দায়িত্ববোধই কার্যকর প্রতিষেধক

সম্মিলিত দায়িত্ববোধই কার্যকর প্রতিষেধক

অন্যমত জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম