Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর এটি তার তৃতীয় বিদেশ সফর। এ সফরকে কেন্দ্র করে অনেক সম্ভাবনার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে বাংলাদেশের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর এ জাপান সফরকে অবশ্যই স্বাগতম জানাই। কেননা জাপান আমাদের বিশ্বস্ত ও অকৃত্রিম বন্ধু রাষ্ট্র। জাপান আমাদের অতীতে অনেক সাহায্য করেছে, খুবই অল্প সুদে ঋণ দিয়েছে আমাদের অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য।

বর্তমানে দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে জাপানি বিনিয়োগ দরকার। অটোমোবাইল, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগে উৎপাদিত পণ্যকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে কিংবা বিদেশে-যেখানেই বিক্রি হোক, পণ্যটি বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য হিসাবে পরিচিতি পাবে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে এমনই একটি সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে, সেটা হলো, জাপানি বিনিয়োগে বাংলাদেশে বিশ্বমানের গাড়ি তৈরি হবে। বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়বে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড। টয়োটার মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে দেশে গাড়ি উৎপাদন শুরু হলে গড়ে উঠবে হাজারো সহযোগী শিল্প, আসবে নতুন বিনিয়োগ, বাড়বে কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে জাপানি প্রযুক্তি ও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে দেশের শিল্পায়নে খুলবে নতুন দরজা।

জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বড় শিল্পে যুক্ত হতে পারবেন। বিশ্বজুড়েই জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করে। একটি গাড়ি তৈরিতে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ ধরনের যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে টয়োটা গাড়ি উৎপাদন শুরু হলে এসব যন্ত্রাংশ তৈরিতে অসংখ্য পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হবে। এতে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের গাড়ি দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এটা বাংলাদেশের জন্য খুবই আশার একটি খবর।

একটি জাতীয় দৈনিক থেকে জানতে পারলাম, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু দেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি ডলারের নিচে। অর্থাৎ জাপানি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি থাকলেও বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে তাদের বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ গত অর্থবছরে জাপানে ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে; বিপরীতে আমদানি করেছে ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য। এ ব্যবধান কমাতে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দেশে উৎপাদন সম্প্রসারণ জরুরি। জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাব্য নতুন ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অটোমোবাইল শিল্প বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা টয়োটা ইতোমধ্যে সরকারকে জানিয়েছে। পূর্ণ উৎপাদন ২০২৯ সালের মধ্যে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে কারখানাটির বিনিয়োগের অঙ্ক, উৎপাদন সক্ষমতা, নির্দিষ্ট মডেল ও চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।

জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা জেট্রোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজুইকি কাতাওকার তথ্য অনুযায়ী, টয়োটা সুসো করপোরেশন ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্রয়, সার্ভিস এবং খুচরা যন্ত্রাংশের দুটি কেন্দ্রে প্রায় চার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এসব কেন্দ্রের নির্মাণকাজ নভেম্বরেই শুরু হওয়ার কথা। পাশাপাশি জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর উন্নয়নকাজ ২০২৭ সালে শুরু এবং ২০২৯ সালে পূর্ণ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এসব সংবাদে আমরা খুবই আশাবাদী। তবে জাপানের বর্তমান পলিসিতে আগের মতো সেই উদারতা নেই, এর অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। জাপান এখন মিলিটারি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হতে চাচ্ছে। জাপান এখন বিমানবাহী রণতরি তৈরি করছে। সুতরাং তারা বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাচ্ছে, বিশেষ করে চায়নার বিরুদ্ধে। সুতরাং জাপানের সঙ্গে আমরা যাই করি না কেন, এ ক্ষেত্রে আমাদের একটু হুঁশিয়ার থাকতে হবে। কেননা জাপান আগের মতো সেই স্বল্প হার সুদে আমাদের ঋণ দেবে না। কোনো সাহায্য করবে না। কারণ জাপান এখন বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সবকিছু দেখছে।

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সূত্র ধরে মাতারবাড়ী নিয়ে জাপান যেটা বলতে চাচ্ছে, সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ মাতারবাড়ী নিয়ে আমাদের ভারতের সঙ্গে শর্তে যেতে হবে কেন? বাংলাদেশের মাতারবাড়ীতে তাদের এ শর্তসাপেক্ষ বিনিয়োগ, এটা বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু হবে বলে মনে হয় না। এটা ঠিক, তারা আমাদের অত্যন্ত স্বল্প সুদে ঋণ দেবে এবং তাদের সুবিধা অনুযায়ী তারা শিল্প করবে, রপ্তানি করবে-এগুলোতে তো আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এর মাঝে ভারতকে সুবিধা দেওয়ার শর্তে যেতে হবে কেন? ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে ‘গিভ অ্যান্ড টেক’। ভারতকে সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি যদি অর্থনৈতিকভাবে আমাদের জন্য যথেষ্ট পোষায়, তাহলে অবশ্যই আমরা নিজস্ব উদ্যোগেই সেটা করব। সেটা শর্তের মাধ্যমে হবে কেন? সেভেন সিস্টারে আমাদের মালামাল সরবরাহ করা এবং ওদের জন্য সুযোগ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি যদি লাভজনক হয়-অবশ্যই আমরা সেটা করব।

যাই হোক, বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। এখন আমাদের উচিত এআই রিলেটেড শিল্প গড়ে তোলা। মাতারবাড়ি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্প গড়ে তুলতে হবে। চীনও আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তাদের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্কের চাকাটিকে আরও গতিশীল করতে হবে। চীন যে মিয়ানমার হয়ে ওদের সঙ্গে একটা করিডর বানাতে চাচ্ছে, তা যদি বস্তাবায়ন করা যায়, তাহলে সেটাও ব্যবহার করতে পারবে বাংলাদেশ। অবশ্য এটা বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তে হওয়া উচিত।

আমি আবারও বলছি যে, বাংলাদেশে আগের মতো সহজে বিদেশি ঋণ, অর্থ কিংবা সুদবিহীন সাহায্য এগুলো এখন আর আশা করা ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে কোনো পণ্য আমদানি করলে সেটা বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল হবেই। ইউরোপ থেকে আনা হলে তার থেকে কিছুটা কম হবে। সুতরাং বাংলাদেশকে বুঝেশুনেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যাই হোক, বাংলাদেশকে নিজস্ব সম্পদ আহরণের ওপর জোর দিতে হবে। কিন্তু আমরা নিজস্ব সম্পদ আহরণ সেভাবে করতে পারছি না। আমাদের ব্যর্থতা, অযোগ্যতার কারণে, কাজে কর্মে মন্থর গতির কারণে আমরা সে সম্পদ আহরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। তা না হলে চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন এত বছর এভাবে ফেলে রাখলাম? চট্টগ্রাম বন্দরের এ সিদ্ধান্তটি আমরা আরও অনেক আগেই নিতে পারতাম। কিন্তু তা পারিনি। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কথাই চিন্তা করি না কেন? এটা কি আন্তর্জাতিক মানে কাজ করছে? না, করছে না। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো এটাকেও বিদেশি তত্ত্বাবধানে দেওয়া উচিত। এখন সবার একই কথা-আমাদের অর্থ নেই, তাই ঋণের জন্য মরিয়া হয়ে আছি। আমাদের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিগুলোকে যদি ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারতাম, তাহলে দেশে অর্থ নেই-এ কথাটি শুনতে হতো না। আসলে আমাদের এফিসিয়েন্ট ইকোনমি তৈরি করতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। আমরা গর্ব করে বলি যে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মতো এত বড় সৈকত পৃথিবীতে হয়তো খুব বেশি পাওয়া যাবে না। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এর কতটুকুই আমরা ব্যবহার করতে পারছি? আসলে সমস্যা হচ্ছে, আমাদের যে কালচারে বা বর্তমানে যে লেভেলে আমরা আছি, সেখানে বিদেশি পর্যটক আমরা পাব না এবং এটাই স্বাভাবিক। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে একবার চিন্তা করা হয়েছে। থাইল্যান্ড কর্তৃপক্ষকে যদি কক্সবাজার বিমানবন্দরকে লিজ দিয়ে তাদের হাতে এর ব্যবস্থাপনা ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে এর চেহারা পালটে যাবে। কক্সবাজারের কিছু অংশ তাদের মাধ্যমে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ভারী হতো। এখানকার দুর্নীতি থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত হতো দেশ। আসলে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই তো দুর্নীতির একটা বড় ব্যবসা চলছে। এটাকে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। দেশ এগোবে কীভাবে? আসলে দেশে মানুষ যত গরিব থাকবে-তত বিভক্ত থাকবে, তত দুর্নীতিগ্রস্ত হবে। এটাই নিয়ম। পৃথিবীতে তাই দেখা গেছে। ‘ইউ রিমেইন পুওর, ইউ রিমেইন ডিভাইডেড, অ্যান্ড ইউ রিমেইন করাপ্ট।’ এখন এটাই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা যদি কোনো আশার উজ্জ্বল আলো সামনে দেখতে পেতাম তাহলে আমরা সেদিকেই দৌড়াতাম। কিন্তু সে আলোর কোনো রেশ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। জানি না সামনে দেখতে পাব কি না।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

দৃষ্টিপাত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম