Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

Advertisement

Icon

আবু হেনা রাজ্জাকী

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একটি দেশের বিচারব্যবস্থার শক্তি শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অবকাঠামো কিংবা আইনগত ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বহুলাংশে নির্ভর করে বিচারকদের মেধা, প্রজ্ঞা, সততা ও বিচারিক দক্ষতার ওপর। একজন বিচারকের সিদ্ধান্ত মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও মৌলিক অধিকারকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই বিচারক নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সর্বাধিকসংখ্যক প্রার্থীকে বাদ দেওয়া নয়; বরং যোগ্যতম ব্যক্তিদের নির্ভরযোগ্যভাবে চিহ্নিত করা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার প্রাথমিক ফল বিদ্যমান বাছাইপদ্ধতির যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৮ হাজার ৪৭২ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে মাত্র ৩৪৩ জনকে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। অথচ সহকারী জজ পদে নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ২৫০ জন। অর্থাৎ প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের হার মাত্র ৪ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং প্রতিটি পদের বিপরীতে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন গড়ে ১ দশমিক ৩৭ জন। এত সীমিত প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের জন্য যোগ্যতম প্রার্থীদের নির্বাচন কতটা বাস্তবসম্মত, তা গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।

বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায়। নির্বাচিত ৩৪৩ জনের মধ্যে অন্তত ২৫০ জনকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে পাশের হার প্রায় ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ হতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় ৭০ শতাংশ উত্তীর্ণ হলে তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২৪০ জনে। এরপর মৌখিক পরীক্ষা ও অন্যান্য নিয়োগ শর্ত রয়েছে। ফলে ঘোষিত পদ পূরণের জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য প্রার্থী পাওয়া কঠিন হতে পারে। অবশ্য শুধু শূন্যপদ পূরণের উদ্দেশ্যে যোগ্যতার মান শিথিল করা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিযোগিতার পরিসর এত সংকুচিত হয়ে পড়া নিয়োগের সামগ্রিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না।

এখানে পরীক্ষার কঠোরতা এবং মূল্যায়নের যথার্থতার মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন জরুরি। কোনো পরীক্ষায় বেশির ভাগ প্রার্থী অকৃতকার্য হওয়া নিজেই পরীক্ষা পদ্ধতির ত্রুটির প্রমাণ নয়। আবার খুবই কমসংখ্যক প্রার্থী উত্তীর্ণ হওয়াও পরীক্ষার উৎকর্ষের নিশ্চয়তা দেয় না। একটি পরীক্ষার প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করে সেটি সংশ্লিষ্ট পেশার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা কতটা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারছে, তার ওপর। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে এ নীতির গুরুত্ব আরও বেশি।

বিজেএসের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে ১০০ নম্বরের প্রাথমিক এমসিকিউ পরীক্ষার পর ১ হাজার নম্বরের লিখিত এবং ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ নম্বর অর্জনের বিধান রয়েছে। এমসিকিউ-এর মাধ্যমে আইনগত তথ্য ও বিধিবিধান সম্পর্কে ধারণা যাচাই সম্ভব হলেও একজন বিচারকের জন্য অপরিহার্য ঘটনার বিশ্লেষণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ মূল্যায়ন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, পরস্পরবিরোধী যুক্তির বিচার এবং যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত লেখার সক্ষমতা পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা কঠিন। এসব দক্ষতা মূল্যায়নের জন্য লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি। ফলে প্রাথমিক পরীক্ষার বাছাই ক্ষমতা এবং পরবর্তী বিচারিক দক্ষতার মধ্যে বাস্তব সম্পর্ক কতটা শক্তিশালী, তা নির্ণয় করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৪৬তম বিসিএসে ৩ হাজার ১৪০টি পদের বিপরীতে সংশোধিত প্রাথমিক ফলে ২১ হাজার ৩৯৭ জন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে প্রায় ৬ দশমিক ৮১ জন। অন্যদিকে আলোচ্য বিজেএসে এই অনুপাত মাত্র ১ দশমিক ৩৭। বিসিএস ও বিজেএসের দায়িত্ব, পরীক্ষার বিষয়বস্তু এবং যোগ্যতার মানদণ্ড ভিন্ন হওয়ায় এই তুলনা দিয়ে কোনো পদ্ধতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা যায় না। তবে বিচারিক দায়িত্বের মতো বিশেষায়িত পেশায়, যেখানে গভীর আইনগত বিশ্লেষণ অপরিহার্য, সেখানে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে আরও বিস্তৃত পরিসরে যোগ্য প্রার্থীদের মূল্যায়নের সুযোগ থাকা উচিত কি না, সেই প্রশ্নটি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও বিচারিক যোগ্যতার বহুমাত্রিক মূল্যায়নের গুরুত্ব নির্দেশ করে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে Judicial Appointments Commission বিচারক নির্বাচনে পদভেদে পরিস্থিতিভিত্তিক মূল্যায়ন, সাক্ষাৎকার এবং পেশাগত দক্ষতা যাচাই করে। ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে সিভিল জজ নিয়োগে প্রাথমিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার সমন্বয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিচারক নিয়োগের কাঠামো ভিন্ন; সেখানে বাংলাদেশের মতো অভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেই। এসব দেশের পদ্ধতি সরাসরি অনুকরণযোগ্য না হলেও একটি শিক্ষা স্পষ্ট-বিচারিক যোগ্যতা যাচাইয়ে আইনগত জ্ঞানের পাশাপাশি বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যুক্তিবোধ এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে আইন প্রয়োগের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হয়। এই বাস্তবতায় প্রথম প্রয়োজন ১৯তম বিজেএসের প্রাথমিক পরীক্ষার একটি নিরপেক্ষ ও সীমিত কারিগরি পর্যালোচনা। কমিশন অভিজ্ঞ বিচারক, আইনশিক্ষক এবং পরীক্ষাবিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রশ্নপত্রের শুদ্ধতা, দ্ব্যর্থক প্রশ্নের সম্ভাবনা, উত্তরসূচির যথার্থতা এবং নম্বর গণনার নির্ভুলতা যাচাই করতে পারে। কোনো ত্রুটি শনাক্ত হলে প্রচলিত বিধি অনুসারে সব পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সমভাবে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে পরীক্ষার মান অক্ষুণ্ন রেখেই ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, পূর্ববর্তী কয়েকটি বিজেএস পরীক্ষার প্রাথমিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফল তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রাথমিক পরীক্ষায় উচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত প্রার্থীরা পরবর্তী পরীক্ষায় কতটা সফল হয়েছেন এবং চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত প্রার্থী পাওয়া গেছে কি না, তা যাচাই করলে বিদ্যমান পদ্ধতির কার্যকারিতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সময় বিষয়ভিত্তিক ভারসাম্য, কঠোরতার মাত্রা এবং আইনগত সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

তৃতীয়ত, নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ও পূর্ববর্তী পরীক্ষার সফলতার হার বিবেচনায় লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য একটি যুক্তিসংগত প্রতিযোগিতামূলক পরিসর নির্ধারণের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, ন্যূনতম যোগ্যতার মান অক্ষুণ্ন রেখে প্রতি পদের বিপরীতে তিন থেকে পাঁচজন প্রার্থীকে লিখিত পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নয় এবং নির্দিষ্টসংখ্যক প্রার্থী উত্তীর্ণ করানোর জন্য পরীক্ষার মান শিথিল করার প্রস্তাবও নয়। বরং যোগ্যতার মান বজায় রেখে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ যখন মামলা জট, বিচারকস্বল্পতা এবং বিচারপ্রার্থীদের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশার মুখোমুখি, তখন বিচারক নিয়োগে মানের সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই। একইভাবে অতিরিক্ত সংকীর্ণ বাছাইয়ের কারণে সম্ভাবনাময় প্রার্থীদের হারানোর ঝুঁকিও উপেক্ষা করা যায় না। ১৯তম বিজেএসের ফল একাই পরীক্ষা পদ্ধতির ত্রুটি প্রমাণ করে না; তবে বিদ্যমান পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাইয়ের যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে। কমিশনের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেই এ বিষয়ে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।

বিচারক নিয়োগের সাফল্য কতজন প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে যোগ্যতম ব্যক্তিদের নির্বাচন করা গেল, তা দিয়ে বিচার করতে হবে। পরীক্ষার কঠোরতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই কঠোরতা যেন প্রকৃত মেধা ও বিচারিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ বিচারক নিয়োগের একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একজন প্রার্থীর কর্মজীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব পড়তে পারে ভবিষ্যতের অসংখ্য বিচারপ্রার্থীর জীবন, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির ওপর।

আবু হেনা রাজ্জাকী : সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

দৃষ্টিপাত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম