Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

Advertisement

Icon

সৈয়দ তোশারফ আলী

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এ শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই শিল্পের সাফল্যের পেছনে যাদের শ্রম, দক্ষতা ও নিষ্ঠা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই শ্রমিকদের জীবনযাত্রা যদি অনিশ্চয়তা ও অভাবের মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে শিল্পের সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ বলা যায় কি? উৎপাদন বাড়বে, রপ্তানি বাড়বে, মালিকের ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে-অথচ শ্রমিকের সংসারে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর নিশ্চয়তা থাকবে না, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘকাল চলতে পারে না। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে সাম্প্রতিক অসন্তোষ আমাদের সামনে এ প্রশ্নটিই নতুন করে তুলে ধরেছে। শ্রমিকেরা যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খান, তখন তাদের মজুরি পুনর্বিবেচনার দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিষয়টিকে নিছক আইনশৃঙ্খলা কিংবা উৎপাদন সচল রাখার সমস্যা হিসেবে দেখলে মূল সংকটের সমাধান হবে না। দরকার শ্রমিকের বাস্তব জীবনকে বোঝা, মালিকের সক্ষমতা বিবেচনা করা এবং সরকারের কার্যকর মধ্যস্থতায় একটি ন্যায়সংগত সমাধানে পৌঁছানো।

মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধান : সর্বশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন হার কার্যকর হয় ওই বছরের ১ ডিসেম্বর। কিন্তু মজুরি বাড়লেই শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় না; প্রকৃত উন্নতি নির্ভর করে সেই মজুরি দিয়ে তিনি কতটা পণ্য ও সেবা কিনতে পারছেন তার ওপর। মুদ্রাস্ফীতির কারণে খাদ্য, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, পরিবহণ ও অন্যান্য অপরিহার্য ব্যয়ের পরিমাণ বাড়লে নির্দিষ্ট অঙ্কের মজুরির ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে কাগজে-কলমে মজুরি অপরিবর্তিত থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকের জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটে। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে মজুরি নির্ধারণ করলে তা শ্রমিকের ন্যায্য প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী কত টাকা ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত, তা কেবল আবেগ কিংবা অনুমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা সমীচীন নয়। খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা, বাসস্থান, চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষা এবং পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত হিসাব তৈরি করা দরকার। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, মজুরি নির্ধারণে যেমন শ্রমিকের জীবনধারণের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, তেমনই শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও নিশ্চিত করতে হবে।

মজুরি বোর্ডের কার্যকর ভূমিকা চাই : সরকার পোশাক শ্রমিকদের মজুরি পুনর্বিবেচনার জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর এ বোর্ড গঠনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বোর্ড যেন দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে কাজ শুরু করে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য শুনে বাস্তবসম্মত সুপারিশ পেশ করে। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৪১ ধারায় মজুরি সুপারিশের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনযাত্রার মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। অতএব, মজুরি পুনর্বিন্যাসের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচ্য বিষয়গুলো আইনেই স্বীকৃত। এখন দরকার এসব বিধান যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। মজুরি বোর্ডের কাজ কেবল শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দাবিদাওয়া শোনা নয়। তাদের উচিত হবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, শিল্পের উৎপাদন ও মুনাফার প্রবণতা পর্যালোচনা, শ্রমিকদের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন মজুরি প্রস্তাবের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা। বোর্ডের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে হবে তথ্য, যুক্তি ও ন্যায়বিচার। সরকারেরও উচিত বোর্ডের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া। অনির্দিষ্টকাল আলোচনা চলতে থাকলে শ্রমিকদের হতাশা বাড়বে। তাই একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও সময়সীমা থাকা দরকার।

ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ : শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে সরকারের সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত ও অর্থবহ আলোচনা। শ্রমিকদের দাবি সম্পর্কে মালিকপক্ষের বক্তব্য শোনা যেমন জরুরি, তেমনই শ্রমিকদের প্রতিনিধিরাও যেন তাদের সদস্যদের প্রকৃত সমস্যা স্বাধীনভাবে তুলে ধরতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। মজুরি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে আলোচনাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজা একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ও পরিণত শিল্পব্যবস্থার পরিচয়। সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করা যেতে পারে। সেখানে মজুরি ছাড়াও বকেয়া বেতন, নিয়মিত বেতন প্রদান, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং শ্রমিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।

শ্রমিকের ন্যায্য দাবি ও শিল্পের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয় : কোনো কোনো ক্ষেত্রে মজুরি বৃদ্ধির বিরোধিতা করতে গিয়ে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়। এ আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের মূল্যচাপ, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং ঋণের ব্যয় পোশাকশিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। কিন্তু এই সমস্যাগুলোর সমাধান শ্রমিকের জীবনধারণের ন্যূনতম চাহিদাকে অস্বীকার করে হতে পারে না। শ্রমিকের মজুরি একটি উৎপাদন ব্যয় হলেও তার শ্রমই উৎপাদনের ভিত্তি। ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কর্মজীবনের নিশ্চয়তা শ্রমিকের কর্মস্পৃহা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা অসন্তোষ, অনুপস্থিতি, শ্রমিকের কর্মস্থল পরিবর্তন এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। সুতরাং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। বরং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, অপচয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য আদায়ের উদ্যোগের মাধ্যমে মজুরি বৃদ্ধির চাপ সামলানোর পথ খুঁজতে হবে।

সমাধান অসম্ভব নয়, দরকার সদিচ্ছা : বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের হাতে এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে-মজুরি বোর্ড। এর পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ, জীবনযাত্রার ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। মজুরি কাঠামো এমন হতে হবে, যাতে শ্রমিকের মৌলিক চাহিদা পূরণের বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং শিল্পও টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা ও নিরপেক্ষ ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের কষ্টকে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে। মনে রাখতে হবে, যে শিল্পের সমৃদ্ধি শ্রমিকের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, সেই শিল্পের স্থায়িত্ব শ্রমিকের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে নিশ্চিত করা যায় না। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগের আস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেও জরুরি। অতএব, এখন আর দোষারোপ বা কালক্ষেপণের সময় নয়। সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। যুক্তিসংগত মজুরি নির্ধারণ করতে হবে, সময়মতো তা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পর্যালোচনার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সদিচ্ছা থাকলে এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। বরং ন্যায়সংগত সমাধানই হতে পারে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন, শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে একই সূত্রে বাঁধার কার্যকর পথ।

সৈয়দ তোশারফ আলী : কলামিস্ট, দ্য নিউ নেশন পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

দৃষ্টিপাত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম