প্রকল্পগুলো ঘাস খায় না
ড. মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রকল্পগুলো উন্নয়নের নয়। ওইসব প্রকল্পের পেছনে আছে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র-মুদ্রা। শুনতে কেমন লাগছে, তাই না? ষড়যন্ত্রের সঙ্গে মুদ্রা কেন লিখছি? এই মুদ্রা হলো লক্ষ্য। কোন লক্ষ্য সাধনের জন্য এসব প্রকল্প, তা বুঝতে হলে রাজনীতির প্যাঁচ বুঝতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে কে কাকে, কারা কাকে টার্গেট করেছে।
১. সংসদ-সদস্য ফজলুর রহমান অনেক আগেই নেট-দুনিয়ায় বলেছিলেন, বিএনপিকে দুর্বল করতে চাইছে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল। সে দলটি আদাজল খেয়ে মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে লাগে। নেট-দুনিয়ার বাঘা বাঘা তাত্ত্বিক মির্জার কীর্তি ও রাজনৈতিক কুকীর্তি রসিয়ে রসিয়ে বয়ান করেন। সাধারণ পাবলিক কিন্তু তা বিশ্বাস করে। কারণ তারা রাজনীতির দুর্গন্ধ শুঁকতে ভালোবাসেন। মজা পান। ওই মজা রাজনীতিকরাই সৃষ্টি করেছেন।
ওই একই সময়ে সংসদ-সদস্য ফজলুর রহমান বলেছিলেন, এর পরের শিকার ইশরাক হোসেন। এই প্রেডিকশন অনেক আগের ঘটনা। তখনো নির্বাচন হয়নি আর ইশরাকও এমপি নির্বাচিত হননি। সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাককে রাজনৈতিক অ্যারেনা থেকে অফ করতে পারলে ঢাকায় বিএনপির তৃণমূলের শক্তি অনেকটাই খর্ব হবে। তখন স্বাধীনতাবিরোধী চক্র নরম জায়গাগুলোয় থাবা বসাতে পারবে সহজেই। এ দুটি কাজ সহজেই করেছে তারা। মির্জার বয়স হয়েছে। তিনি চিকিৎসা নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন। আর ইশরাককে মন্ত্রিপরিষদ থেকে খরচা করে বেশ ফূর্তিতে আছে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ভারতীয় আধিপত্যবাদী এজেন্টরা। দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ভারতীয় দালালদের চেনা সহজ নয়। তারা এতটাই প্রভাবশালী।
শেখ হাসিনা-বধে বেশকিছু সুযোগ তারাই নস্যাৎ করে দিয়েছিল। বিশেষ করে বিএনপির শেষ মহাসমাবেশে হাসিনার পুলিশি ও দলীয় প্রতিবন্ধকতা উড়িয়ে দিয়ে গোলাপবাগের মাঠে দশ লাখ মানুষের উপস্থিতিকেও কাজে লাগাতে পারেনি বিএনপি নেতৃত্ব। এর জন্য দায়ী ঘাপটি মেরে থাকারা।
তাদের এ প্রকল্প কতটা সফল হবে, তা দেখার জন্য দেশবাসী অপেক্ষা করছে। কেননা আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক ট্রাইব্যুনাল এর মধ্যেই হাসিনাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে ফাঁসির আসামি হিসাবে রায় দিয়েছেন। সে রায় মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা দেশে আসবেন-এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। জীবনের মায়া বড় মায়া। সেই মায়ার টানেই তো শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। ডিসেম্বরে ফিরলে জনতা তাকে সহজেই পাবে, হাতেনাতে ধরবে। আওয়ামী নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাকে বাঁচানোর জন্য পথে নামবে না।
প্রকল্প ২
সন্ত্রাস, মাদক আর সন্ত্রাসী ইত্যাদি নিয়ে আমরা এখন আতঙ্কিত। দেশের তিনদিকের সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্র, স্বর্ণ, সন্ত্রাসী ঢুকছে। বলবেন, বিজিবি থাকতে সীমান্ত অতিক্রম করে মাদক ও সন্ত্রাসী ঢুকছে কেমন করে? প্রশ্নটি ঠিক আছে। কিন্তু সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বশীলরা যদি হেরোইন পাচারকারী ও অস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গ দোষে, সরল বাংলায় টাকার কাছে নতি স্বীকার করে থাকে, তাহলে তো বানের মতোই ঢুকবে মাদক আর সন্ত্রাসী। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা চোরাচালানি চক্র ও সন্ত্রাসীরা। স্বর্ণের সঙ্গে সোহাগা মিললে যা হয়, এই আর কী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা দিয়ে যদি মাদকের এই রমরমা হয়, তাহলে তার বাহিনী কী করে?
দেশব্যাপী অসৎ লোকেরা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা মোটা অঙ্কের টাকা পায়। যারা সীমান্তের ওপার থেকে মাদক সরবরাহ করছে, তারা তো শুধু ব্যবসার জন্য ওই পণ্য বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে না। এদেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করতেই তারা এটা করছে। একটি দেশের যুবসমাজ যদি বিচ্যুত হয়ে পড়ে, মাদকাসক্ত হয়ে নির্জীব হয়, তাহলে দেশের পক্ষে তারা দাঁড়াতে পারবে না। সেই দেশের অর্থনীতি দুর্বল হতে হতে তলানিতে পৌঁছাবে। আমাদের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছে, তারা তো চায় দেশটা যেন গণতান্ত্রিকভাবে দাঁড়াতে না পারে। তাহলে আগামীর বাংলাদেশে কীভাবে নিজেদের রক্ষা করবে? এক ঢিলে দুই পাখি মারার এই অপকৌশলই হচ্ছে বাংলাদেশকে ভেতর থেকে খুবলে খাওয়ার প্রকল্প। আমাদের দেশপ্রেমিক সাংবাদিকরা সেই সন্ত্রাস ও মাদক পাচারের সামান্য কিছু দেখিয়েছেন দেশবাসীকে। তবে ইশরাক হোসেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের পর নতুন করে তিনি প্রাণ পেয়েছেন বলে শত শত লোক ফেসবুকে লিখেছেন। তার পক্ষে হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসায় তিনি সিক্ত হয়েছেন। তিনি মাদকের ডেরা ভেঙে দিয়ে সুনামই অর্জন করেছেন। তবে যেহেতু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজকে তিনি নিজের দায়িত্বে করেছেন, তাই চক্ষুশূল হওয়ারই কথা।
প্রকল্প ৩.
ইশরাক হোসেনের প্রতি এনসিপি অনেকটাই উদার ও নৈতিক সমর্থন দিচ্ছে বলে মনে হয়। এটা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য শুভ। এ শুভবুদ্ধির উদয় হলে আমরা ধারণা করি, পলাতকার প্রতি যে সংযোগের অভিযোগ করেছেন বিএনপি ও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, সেই দায় জামায়াতকে মুছে ফেলতে হবে। এটা ঠিক যে, ’৭১-এর অপরাধ বর্তমান জামায়াত করেনি। কিন্তু তাদের পূর্বসূরিরা যে অপরাধের জন্য দায়ী, তারা তার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি। এই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে। কে বা কারা ওই ক্ষমার বিষয়টি মিডিয়ার সামনে এনেছে, তা আমি জানি না। একদিন দেখলাম রিকনসিলিয়েশন বিষয়ে রিপোর্ট হয়েছে পত্রিকায়। এর অর্থ আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কথা তোলা হয়েছে। সেখানেই বলা হয়েছে, ১ হাজার ৪০০ লোকের হত্যাকারী ও ২৫ হাজার মানুষকে পঙ্গু করে দিয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন ভারতে। সেখানেই তিনি আশ্রিতা। সেখান থেকে দেশে ফিরে আসার কোনোরকম সুযোগ নেই বললেই চলে। প্রশ্ন উঠেছে, বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেহেতু কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল হিসাবে অংশ নিতে পারেনি, তাই প্রধান বিরোধী দল হিসাবে উঠে এসেছে ক্ষমা না চাওয়া জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। আওয়ামী ভোটগুলো যে জামায়াতের পকেটে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে থাকতে পারত, তাহলে প্রধান বিরোধী দল হিসাবে সংসদে তারাই থাকত। বাস্তব সত্য হচ্ছে, ওই দলের লাখ লাখ কর্মী ভোটার আছে, যারা হাসিনার পক্ষে ছিল। কিন্তু খুনের ভাগিদার তারা নয়।
এই রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন প্রকল্পে উদ্গাতা যে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেই এসেছে, সেখানে সাংবাদিকরা কোনো পার্ট নয়। তবে সাংবাদিকদের দায় যেন রাজনীতিকদের চেয়ে নেহায়েত কম নয়। তাই নিউজ হিসাবে রিকনসিলিয়েশন জনসম্মুখে এসেছে। সাংবাদিকরা কোনো দল করেন না। তবে হাসিনার আমলে আমরা কতিপয় অসৎকে পার্টিজেন হতে দেখেছি। পার্টির লোক হওয়া লোকগুলো আর সাংবাদিক হতে পারে না।
আওয়ামী পুনর্বাসন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বিএনপি আর জামায়াতের কাঁধেই উঠেছে। এনসিপি হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোরতর বিরোধী। তারা ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তবে সেখানে জনতার আগমন ঘটেছে ১৭ বছরের বঞ্চনার ঘোর থেকে। হাসিনার পতনের জন্য বিএনপি ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে ঠিক, অনেক কর্মী হত্যার শিকার হয়েছে, অনেক নেতাকর্মী ঘরে থাকতে পারেনি। গুম হয়েছে শত শত মানুষ-তারপরও কেন তারা কামিয়াব হতে পারেনি? কারণ দলের ভেতরে আওয়ামীদের গুপ্ত অবস্থান, যারা মূলত ভারতকে ভয় পায়। রাজনীতিতে যে ভয় শব্দটি নেই, তা তারা বুঝতে পারেনি বা পারছেন না। ভয়হীন হয়েছেন ইশরাক, নতুন প্রজন্মের রাজনীতিক। তার বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এবং সাহসী মানুষ। আমাদের মতোই তিনি চীনপন্থি বিপ্লবী ছিলেন। তার ছেলেও নিঃশঙ্কচিত্ত। তার জয় অনিবার্য, আমার ধারণা। প্রকল্পগুলো ধারণারই ফসল। চিন্তা তাই, ওইসব প্রকল্পের শিকড় যাতে উপড়ে ফেলা যায়, সেই পথে হাঁটতে হবে সরকার ও রাজনৈতিক দলকে। কারণ উন্নয়ন তরিকায় ওইসব প্রকল্প প্রধান প্রতিবন্ধক। বাধা আর বিপত্তি নিয়ে সামনে এগোনো কঠিন।
ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক
