Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সম্মিলিত দায়িত্ববোধই কার্যকর প্রতিষেধক

Icon

ডা. এম সেলিম উজ্জামান

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সম্মিলিত দায়িত্ববোধই কার্যকর প্রতিষেধক

Advertisement

দেশ এখন একসঙ্গে দুটি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত হামে সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ২৭ হাজার ছাড়িয়েছে। হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ১ হাজার ১৪৬, যার মধ্যে ১০৫ জন ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত। ডেঙ্গুতে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত মৃত্যু ৪১৮ এবং হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। অক্টোবরেই মারা গেছেন ১৭৩ জন, যা এ বছরের যে কোনো মাসের চেয়ে বেশি।

সংকটের গুরুত্ব বিবেচনায় রাষ্ট্র যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। মার্চে পরিস্থিতি বাড়তে থাকলে এপ্রিলে সারা দেশে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সি ১ কোটি ৬১ লাখের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২ লাখ ৩ হাজারের কিছু বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগীর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। এটি প্রায় ৯৬ শতাংশ, যা চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস সেবার প্রতিফলন। তৃতীয়ত, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মহল্লায় মাইকিং করে সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মন্ত্রী ও স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মেয়র-প্রশাসকদের সাপ্তাহিক সমন্বয় সভা হচ্ছে। মহাখালী সংক্রামক রোগ হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড ও দৈনিক বিজ্ঞপ্তির মতো ব্যবস্থায় প্রতিদিন বয়সভিত্তিক তথ্য প্রকাশ হচ্ছে। এ স্বচ্ছতা যে কোনো সংকট মোকাবিলার পূর্বশর্ত।

সংকট আমাদের কী শিখিয়েছে

প্রতিবেদনগুলো থেকে তিনটি শিক্ষা স্পষ্ট। এক. টিকাদানে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মিত টিকাদান কভারেজ ২০২৫ সালে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল। ধারাবাহিকতায় একটি ছোট ব্যবধান (গ্যাপ) হামের মতো অতি সংক্রামক রোগের বিস্তারের জন্য যথেষ্ট। দুই. ডেঙ্গুর মৌসুম বদলে যাচ্ছে। আগে মূলত জুন থেকে সেপ্টেম্বরের রোগ হিসাবে পরিচিত ডেঙ্গু এখন শরৎ পেরিয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, নভেম্বরেও সংক্রমণ থাকবে এবং ডিসেম্বরের আগে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আশা করা কঠিন। জলবায়ু পরিবর্তনের এ বাস্তবতা মেনে আমাদের প্রস্তুতি সারা বছরের হতে হবে। তিন. দেরিতে হাসপাতালে আসা প্রাণহানির বড় ঝুঁকি। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, অনেক রোগী ডেঙ্গু-রোগের জটিলতা পর্যায় চলে যাওয়ার পর হাসপাতালে আসছেন। তাই জনসচেতনতার মূল বার্তা হওয়া উচিত ‘বিপদচিহ্ন দেখামাত্র চিকিৎসকের কাছে যান, পরামর্শ নিন’।

সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য সুপারিশ

নিচের প্রস্তাবগুলো সবার সম্মিলিত দায়িত্বের রূপরেখা।

১. হামের টিকার ধারাবাহিকতায় ব্যবধান (গ্যাপ) বন্ধে ‘প্রতিটি শিশু, প্রতিটি ডোজ’ অভিযান : ইপিআই কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের নাম-ঠিকানাভিত্তিক তালিকা করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ঘরে ঘরে ফলোআপ করা দরকার। শহরের বস্তি, চর, হাওড়, পাহাড় ও অভিবাসী শ্রমিক পরিবারকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

২. টিকা সরবরাহ শৃঙ্খলে ‘আগাম-মজুত নীতি’ : হাম-রুবেলাসহ জরুরি টিকার জন্য ন্যূনতম বাফার স্টক এবং ক্রয়-সরবরাহের আগাম পরিকল্পনা স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া উচিত। এতে ভবিষ্যতে সরবরাহ নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকবে না।

৩. ডেঙ্গুতে সারা বছরের এডিস নজরদারি : সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো শুধু মৌসুমি অভিযানে সীমাবদ্ধ না থেকে মাসভিত্তিক লার্ভা জরিপ চালাবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নির্মাণস্থল, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার ও জমে থাকা পানির ওপর নিয়মিত তদারকি হবে। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির মালিকদের জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও সহযোগিতামূলক নির্দেশিকা থাকা চাই।

৪. হাসপাতালে ‘আগাম শনাক্তকরণ ও রেফারেল’ ব্যবস্থা : উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগের জটিলতা সতর্কতা প্রটোকল, পর্যাপ্ত স্যালাইন, রক্ত ও প্রয়োজনীয় আইসিইউ প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। হামের ক্ষেত্রে সন্দেহজনক শিশুকে দ্রুত আলাদা রাখা এবং ভিটামিন ‘এ’ ও জটিলতার চিকিৎসার প্রশিক্ষণ জরুরি। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের মধ্যে শয্যা ও রোগীর তথ্য আদান-প্রদান করার একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা হলে রোগীরা ঘুরে বেড়ানোর ভোগান্তি থেকে বাঁচবেন।

৫. গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা : আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক সচেতনতামূলক তথ্য আদান-প্রদান এখন গণমাধ্যমের বড় সেবা। কোন লক্ষণ দেখলে কী করতে হবে, কোথায় টিকা মিলবে-এসব সহজ ভাষায় নিয়মিত প্রচার করা যেতে পারে। টিকা নিয়ে গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও গণমাধ্যমের যৌথ ফ্যাক্ট চেক ব্যবস্থা কার্যকর হবে।

৬. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির-গির্জা ও সামাজিক নেতৃত্ব : স্কুলে টিকা কার্ড যাচাই, জুমার খুতবা ও ধর্মীয় সমাবেশে স্বাস্থ্যবার্তা, পাড়া-মহল্লায় স্কাউট ও স্বেচ্ছাসেবকদের ‘পরিষ্কার উঠান, পরিষ্কার নালা’ উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য ও দ্রুত কার্যকর পথ। আস্থার জায়গা থেকে আসা বার্তা সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়।

৭. বেসরকারি খাত : কারখানা, ব্যাংক, টেলিকম ও রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ এলাকায় সচেতনতা, মশক নিয়ন্ত্রণ ও টিকাকেন্দ্র সহায়তায় অংশ নিতে পারে। গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য কর্মস্থলে পরামর্শ ও দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা উৎপাদনশীলতাও রক্ষা করবে।

৮. গবেষণা ও জলবায়ু সংবেদনশীল পূর্বাভাস : আবহাওয়া অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে বৃষ্টি-তাপমাত্রা-আর্দ্রতার সঙ্গে ডেঙ্গুর সম্পর্কভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে ডেঙ্গু টিকা ও নতুন প্রযুক্তির মূল্যায়নেও বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি থাকা দরকার।

৯. জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি সমন্বয় কাঠামো : স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, তথ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী কাঠামো থাকলে সংকটের সময় আলাদা করে সমন্বয় গড়ার সময় নষ্ট হবে না। এ কাঠামো নিরবচ্ছিন্ন চলার মতো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেলে আরও ভালো হবে। জনস্বাস্থ্য কোনো সরকারের নয়, রাষ্ট্রের স্থায়ী দায়িত্ব।

১০. নাগরিক হিসাবে আমাদের ছোট কাজ : অন্তত সপ্তাহে একদিন বাড়ির আশপাশের জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়া, মশারি ও প্রতিরোধক ব্যবহার, শিশুর টিকা কার্ড মিলিয়ে দেখা, জ্বর হলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া-এ ছোট অভ্যাসগুলোর যোগফলই একটি বড় প্রতিরোধ।

হাম ও ডেঙ্গু রোগ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, জনস্বাস্থ্য অবহেলার জায়গা নয়, ধারাবাহিক বিনিয়োগের জায়গা। আজ যে টিকাকেন্দ্র, আইসিইউ শয্যা, গবেষণা ও সচেতনতায় আমরা বিনিয়োগ করব, আগামী প্রজন্ম তার সুফল পাবে। বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান, পোলিও নির্মূল ও মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যে বিশ্ব-প্রশংসিত সাফল্য দেখিয়েছে। সেই সক্ষমতা আমাদের আছে, প্রয়োজন কেবল সম্মিলিত সংকল্প।

সরকার, বিরোধী মত, চিকিৎসক, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সাধারণ নাগরিক-সবাই এককাতারে দাঁড়ালে এ সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব এবং এমনভাবে যেন পরেরবার আমরা আরও আগে আরও প্রস্তুত থাকি। প্রতিটি শিশুর টিকা, প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা ও প্রতিটি পরিবারের সুরক্ষাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।

ডা. এম সেলিম উজ্জামান : জনস্বাস্থ্য ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

প্রকল্পগুলো ঘাস খায় না

প্রকল্পগুলো ঘাস খায় না

সম্মিলিত দায়িত্ববোধই কার্যকর প্রতিষেধক

সম্মিলিত দায়িত্ববোধই কার্যকর প্রতিষেধক

অন্যমত জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম