Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

রূপপুর গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগের ধাপগুলো

Icon

ড. শফিকুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রূপপুর গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগের ধাপগুলো

Advertisement

খুব শিগগিরই হয়তো খবরে দেখব, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। দিনটি হবে ঐতিহাসিক। তবে এ অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও জটিল পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস, নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান এবং স্বস্তি ও আনন্দের মুহূর্ত। একটি দেশের সঙ্গে চুক্তি করলেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে যায় না। এর পেছনে রয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। শুরুতেই অর্থায়ন, প্রযুক্তি নির্বাচন ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারকে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এরপর মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য পারমাণবিক প্রযুক্তিবিষয়ক শিক্ষা চালু, পারমাণবিক আইন প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও পরিচালনাকারী কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও অস্ত্রবিস্তার রোধ-সংক্রান্ত কনভেনশনগুলোয় পক্ষভুক্ত হতে হয়।

রূপপুরে ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি চুল্লি স্থাপনের জন্য ২০১১ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। প্রকল্পটিতে রাশিয়া ৯০ শতাংশ অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ও চালুকরণ প্রক্রিয়াকে চারটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে-ধাপ-এ, ধাপ-বি, ধাপ-সি ও ধাপ-ডি।

ধাপ-এ হলো চুল্লি চালুর আগের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়। এটি সবচেয়ে দীর্ঘ ধাপ, যার জন্য পরিকল্পনায় মোট ৫৫ মাস বরাদ্দ ছিল। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রথম ইউনিটের চুল্লির ভিত্তিপ্রস্তরের কংক্রিট ঢালাইয়ের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হয়। এরপর ৩৯ মাস ধরে সাইট সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ ও তা মোকাবিলার ব্যবস্থা গ্রহণ, চুল্লির নকশা প্রণয়ন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলে।

পাশাপাশি পারমাণবিক আইন প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও পরিচালনাকারী কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কনভেনশনে অংশগ্রহণসহ নানা প্রস্তুতিমূলক কাজও সম্পন্ন করা হয়।

এরপর শুরু হয় বিভিন্ন সিস্টেমের পরীক্ষা। বিদ্যুৎ সরবরাহ, শীতলীকরণ, বায়ু চলাচল ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সিস্টেম প্রথমে আলাদাভাবে, পরে সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করা হয়। পাম্প ঠিকমতো চলছে কি না, ভালভ যথাযথভাবে খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে কি না-এসব বিষয় যাচাই করতে আরও প্রায় নয় মাস সময় লাগে।

এরপর আসে চুল্লির নিজস্ব ব্যবস্থাগুলোর পরীক্ষা। চুল্লির চারপাশে থাকা শক্তিশালী কংক্রিটের আবরণ বা কনটেইনমেন্টের উদ্দেশ্য হলো দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতিতেও তেজস্ক্রিয় পদার্থকে নির্ধারিত সীমানার মধ্যে আটকে রাখা। এরপর চুল্লির মূল পাইপ-বর্তনী প্রথমে ঠান্ডা অবস্থায় এবং পরে গরম অবস্থায় চালিয়ে পরীক্ষা করা হয়। তাপমাত্রা বাড়িয়ে প্রায় ৩২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চাপ ১৬.২ মেগাপ্যাসকেলে নেওয়া হয়। তখনো চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানো হয়নি।

এভাবে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য হলো, কোনো ত্রুটি বা অসংগতি থাকলে তা আগেই শনাক্ত করা, কারণ এ পর্যায়ে সেগুলো সংশোধন করা তুলনামূলকভাবে সহজ।

এদিকে প্রথম ইউনিটের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি ২০২৩ সালের অক্টোবরেই প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে যায়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকেরা জ্বালানির হিসাব ও যাচাই সম্পন্ন করে তাতে সিল লাগান, যাতে জ্বালানির অপব্যবহার রোধ করা যায়।

ধাপ-বি হলো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ বা ভৌত চালুকরণ পর্যায়। এ পর্যায়ে চুল্লি চালু করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলো আবারও ধাপে ধাপে পরীক্ষা করা হয়। পরিকল্পনায় এ কাজের জন্য দুই মাস সময় বরাদ্দ ছিল। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল চুল্লিতে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। এ সময় চুল্লিকে এমন অবস্থায় রাখা হয়, যাতে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ছাড়া স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন বিক্রিয়া শুরু হতে না পারে। যন্ত্রের সাহায্যে নিউট্রন পরিমাপ করা হয় এবং প্রকৌশলীরা কন্ট্রোল রড ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করেন।

ধাপ-বির শেষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ‘প্রথম ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে প্রথমবার নিয়ন্ত্রিত ফিশন চেইন বিক্রিয়া শুরু হয়, তবে চুল্লির পূর্ণ ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিতে। তখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন মূল লক্ষ্য নয়; বরং চুল্লি নকশা অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাই করাই প্রধান উদ্দেশ্য।

ধাপ-বি সম্পন্ন করতে পরিকল্পনায় দুই মাস সময় বরাদ্দ থাকলেও এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময় গড়িয়ে যায়। সেপ্টেম্বরে চুল্লির চাপ কমানোর নিরাপত্তা ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ায় ফিশন বিক্রিয়া শুরু করতে দেরি হয়। রুশ বিশেষজ্ঞরা ত্রুটি সংশোধন করেন।

এরপর ব্যবস্থাটি উচ্চচাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং ৮ অক্টোবর নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনুমোদন দেয়। সবশেষে ১১ অক্টোবর চুল্লিকে প্রথমবার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় নেওয়া হয়। এ পর্যায়ে ছোটখাটো ত্রুটি শনাক্ত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সময়মতো সেগুলো সংশোধন করা গেলে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

ধাপ-সি হলো পাওয়ার স্টার্ট-আপ বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পর্যায়। পরিকল্পনায় এ ধাপ সম্পন্ন করতে এক মাস সময় রাখা হয়েছে। এ পর্যায়ে চুল্লির তাপে বাষ্প তৈরি হবে, যা টারবাইন-জেনারেটরকে ঘোরাবে। এর মাধ্যমে জেনারেটরের যান্ত্রিক শক্তি বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত হবে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন এক ধাপে পূর্ণ ক্ষমতায় শুরু করা সম্ভব নয়। চুল্লির তাপীয় ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে। প্রথমে ৫, পরে ১০ ও ১৫ শতাংশ এবং এরপর প্রায় ৩৫ শতাংশ তাপীয় ক্ষমতায় পৌঁছানোর পর উৎপন্ন বাষ্পের সাহায্যে টারবাইন-জেনারেটর চালিয়ে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার কথা রয়েছে। এটি অর্জিত হলে তা হবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তবে গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের আগে জেনারেটর ও গ্রিডের মধ্যে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। এত বড় একটি ইউনিটকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা গ্রিড ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কারণ, কোনো কারণে ইউনিটটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে গ্রিডকে সেই আকস্মিক বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলার সক্ষমতা রাখতে হবে।

গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পর শুরু হবে শেষ ধাপ-ধাপ-ডি, অর্থাৎ পাইলট বাণিজ্যিক পরিচালনা। এ পর্যায়ের জন্য ১০ মাস সময় বরাদ্দ রয়েছে। এ সময় চুল্লির উৎপাদনক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে পূর্ণ ক্ষমতা, অর্থাৎ ১,২০০ মেগাওয়াটে নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কমিয়েও পরীক্ষা করা হবে। এর মাধ্যমে যাচাই করা হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন মাত্রায় চুল্লি ও জাতীয় গ্রিড সমন্বিতভাবে কতটা স্থিতিশীলভাবে কাজ করে।

সবশেষে পূর্ণ সক্ষমতায় অন্তত টানা তিন দিন স্থিতিশীলভাবে পরিচালনার সক্ষমতা দেখাতে হবে। এ পর্যায়ে বাংলাদেশের পরিচালনাকর্মীরা রুশ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেও বিভিন্ন পরীক্ষা চলবে। এরপর হবে সাময়িক হস্তান্তর, শুরু হবে ১২ মাসের গ্যারান্টি মেয়াদ এবং সবশেষে সম্পন্ন হবে চূড়ান্ত হস্তান্তর। এর পর দীর্ঘমেয়াদি, অর্থাৎ পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে।

চারটি ধাপ সম্পন্ন করতে সব মিলিয়ে পরিকল্পিত সময় ধরা হয়েছিল ৬৮ মাস, অর্থাৎ প্রায় ছয় বছর। বাস্তবে অবশ্য এর চেয়ে বেশি সময় লাগছে। নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের শেষদিকে। চলতি বছরের নভেম্বরে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে নির্মাণ শুরুর পর প্রায় নয় বছর পেরিয়ে যাবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং আগামী বছর শুরু হওয়ার কথা। এ ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তরের কংক্রিট ঢালাইয়ের মাধ্যমে।

তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। শুরুর দিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ কম থাকবে, আর পরীক্ষার প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে উৎপাদন কমানো বা বন্ধ রাখাও স্বাভাবিক। রূপপুরের সাফল্য বিচার করার মাপকাঠি শুধু নির্ধারিত দিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলো কি না, তা নয়। বরং প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না এবং নির্ধারিত সুরক্ষা ও নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ করা হয়েছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রূপপুরের মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বিশ্বের ৩৩তম দেশ হতে যাচ্ছে। প্রথমবার জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারলে নিঃসন্দেহে এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, তবে সেটিই চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হলো নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্নভাবে ৬০ বছর ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা। এই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা অবশ্য নির্ভর করবে পাইলট বাণিজ্যিক পরিচালনার ১০ মাস এবং পরবর্তী এক বছরের গ্যারান্টি মেয়াদে সফলভাবে পরিচালনার ওপর।

ড. শফিকুল ইসলাম : অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক ভিজিটিং অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

নিউইয়র্কের চিঠি ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

রূপপুর গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগের ধাপগুলো

রূপপুর গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগের ধাপগুলো

পর্যটনের আনন্দ যেন স্থানীয়দের দুঃখগাথায় পরিণত না হয়

পর্যটনের আনন্দ যেন স্থানীয়দের দুঃখগাথায় পরিণত না হয়

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম