Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

পর্যটনের আনন্দ যেন স্থানীয়দের দুঃখগাথায় পরিণত না হয়

Icon

পিডিশন প্রধান

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পর্যটনের আনন্দ যেন স্থানীয়দের দুঃখগাথায় পরিণত না হয়

Advertisement

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা দেশের পর্যটন খাতের অনিয়ম, অপরিকল্পিত বিকাশ ও সমন্বয়হীনতার চিত্র নতুন করে সামনে এনেছে। একটি হলো টুপটুপ নামের কথিত রিসোর্টে ১১ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি, অন্যটি জার্মান এক পর্যটকের ব্যাগ খোয়া যাওয়া এবং এ ঘটনায় তার কান্নার দৃশ্য দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়া। ঘটনা দুটি আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যেমন প্রকাশ করেছে, তেমনই পর্যটনের নামে স্থানীয় মানুষের জীবন ও পরিবেশের ওপর সৃষ্ট চাপ নিয়েও ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে।

সম্প্রতি আমার এলাকা মৌলভীবাজারের শমশেরনগর চা বাগানের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা একটি গলফ মাঠকে চা চাষের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একসময় বাগানের বিদেশি মালিক ও তাদের প্রতিনিধিদের নির্মল আনন্দের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই মাঠে গলফ খেলা। কিন্তু গত বছরের প্রথমদিকে শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ‘চান্দের গাড়িতে’ করে শত শত দর্শনার্থী সেখানে যাতায়াত শুরু করেন।

মাঠের উপর দিয়ে গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালিয়ে মহড়া দেওয়া, চৌকিদারকে মারধর এবং এক চা শ্রমিকের শিশুসন্তানকে গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে আহত করার মতো ঘটনাও ঘটে। শেষ পর্যন্ত বাগান কর্তৃপক্ষ মাঠটি সংরক্ষণের পরিবর্তে চা চাষের জন্য প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

অথচ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় চা বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ, কারখানা পরিদর্শন এবং বাগানের বাংলোয় রাত্রিযাপনের সুযোগ রেখে পর্যটন প্যাকেজ চালুর সম্ভাবনা ছিল। দার্জিলিং বা আসামের আদলে এমন উদ্যোগের চিন্তাও করা হয়েছিল। কিন্তু দেশের পর্যটকদের আচরণ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থেকে সংশ্লিষ্ট বাগানমালিকরা সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। চা বাগানের সংরক্ষিত ভূমি ও সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশের ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যটনের আকর্ষণ তৈরি করতে গিয়ে এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

গত বছর সিলেটের উৎমাছড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে দর্শনার্থীদের বিরোধের ঘটনাটিও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন। স্থানীয়রা ছড়ায় গোসল, হইচই ও নাচানাচি না করে তাদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাদের বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তখন স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটনের ফলে কর্মসংস্থানের উদাহরণ হিসাবে গাড়ি পার্কিং ও খাবারের দোকানের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষের বৃহত্তর আর্থিক লাভের কোনো সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন হলো, পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষের প্রকৃত লাভ কতটুকু? কিছু হোটেল, রিসোর্ট, ভাড়ায় চালিত গাড়ি ও তিন চাকার যানবাহনের মালিকের আয় বাড়তে পারে। কিন্তু এর বিনিময়ে সাধারণ বাসিন্দারা যদি শব্দদূষণ, যানজট, আবর্জনা, পরিবেশদূষণ এবং ব্যক্তিগত জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের শিকার হন, তাহলে সেই পর্যটনকে জনকল্যাণমূলক বলা যায় না। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের মতো ছোট জনপদে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর মতো সড়ক, স্বাস্থ্যসেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত অবকাঠামো আদৌ রয়েছে কি না, তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

পর্যটনের নামে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও। বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পুরুষানুক্রমে ভোগদখলে থাকা ভূমিতে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলেও পর্যটকের অবাধ আনাগোনা বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থলের জন্য উদ্বেগের কারণ। বিপন্ন উল্লুকসহ নানা বিরল প্রাণীর আবাসস্থলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রবেশ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে।

অন্যদিকে চা বাগানের সেচের জন্য তৈরি জলাধারকে পর্যটন আকর্ষণ হিসাবে প্রচার করা হচ্ছে। সেখানে দর্শনার্থীদের অসচেতন চলাফেরা, যত্রতত্র খাবার খাওয়া ও ময়লা ফেলার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

এ সমস্যা শুধু সিলেট অঞ্চলের নয়। দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটক আগমনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে আট বর্গকিলোমিটারের এই প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন দ্বীপে পর্যটকের চাপ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান বিধিনিষেধের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।

একইভাবে সুন্দরবনের ভ্রমণ নীতিমালা হালনাগাদ করে রামসার সাইট ও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত এই বনাঞ্চলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জসহ সিলেটের অন্যান্য সংবেদনশীল পর্যটন এলাকার জন্যও প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা নীতিমালা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ স্থানীয় মানুষের জীবনে সংকট তৈরি করছে। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে পর্যটনবিরোধী বিক্ষোভের অন্যতম কারণ বাসাভাড়া, খাদ্যদ্রব্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। পাশাপাশি শব্দদূষণ, বর্জ্য ও পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ স্থানীয়দের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। অর্থাৎ পর্যটনের সুফল যেমন রয়েছে, তেমনি অপরিকল্পিত পর্যটনের সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্যও কম নয়।

বিশ্বের বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ সংরক্ষণে অস্ট্রেলিয়ায় কঠোর পরিবেশগত ও আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় দেখেছি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি না করে, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কীভাবে পর্যটন উপভোগ করা যায়। আমাদের দেশেও সেই সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

পর্যটন মানে শুধু দর্শনার্থীর ভিড়, হোটেল-রিসোর্টের ব্যবসা কিংবা স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের অধিকার, জীবিকা, ব্যক্তিগত পরিসর, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির অস্তিত্ব। তাই পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণার আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত, পরিবেশের ধারণক্ষমতা ও অবকাঠামোগত সামর্থ্য যাচাই করতে হবে। পর্যটকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত না হলে পর্যটন উন্নয়ন টেকসই হবে না। উৎমা ছড়ার ঘটনা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা। পর্যটনের আনন্দ যেন স্থানীয় মানুষের দুঃখগাথায় পরিণত না হয়।

পিডিশন প্রধান : সভাপতি, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরাম

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

নিউইয়র্কের চিঠি ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

রূপপুর গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগের ধাপগুলো

রূপপুর গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগের ধাপগুলো

পর্যটনের আনন্দ যেন স্থানীয়দের দুঃখগাথায় পরিণত না হয়

পর্যটনের আনন্দ যেন স্থানীয়দের দুঃখগাথায় পরিণত না হয়

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

কীভাবে আয়, আস্থা ও সম্ভাবনা বাড়ানো যায়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম