আশেপাশে চারপাশে
‘একতরফা’ বলার সুযোগ নেই
Advertisement
চপল বাশার
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সোমবার বিকালে প্রেস ক্লাবে যাচ্ছিলাম রিকশায়। মতিঝিল থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত পৌঁছানো গেল ভালোভাবেই। তারপরে দেখি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ যানজটে স্থবির হয়ে আছে। তখন রিকশা ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুটা এগিয়ে দেখলাম হাঁটাও যাচ্ছে না। যানজটের সঙ্গে তীব্র জনজট। মিছিলের পর মিছিল চলছে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দিকে। স্লোগান চলছে অবিরাম। সঙ্গে ঢাক, ঢোল, বাঁশি, বিউগল বাজছে। মাইক তো আছেই।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা দলীয় ফরম কিনতে যাচ্ছিলেন সমর্থকদের নিয়ে। সে কারণেই এত মানুষের ভিড়। এই ভিড় পুরো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, সচিবালয়ের সামনের সড়ক দখল করে রেখেছিল একটানা কয়েক ঘণ্টা। গুলিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, জিরো পয়েন্ট হয়ে সচিবালয়ের রাস্তা দিয়ে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত হেঁটে পৌঁছাতে আমার লেগেছিল প্রায় এক ঘণ্টা। তবুও সংগ্রামী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে গেছি জরুরি কাজ ছিল বলে।
আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ও আশপাশে সেদিন ছিল নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম কেনার তৃতীয় দিন। সেখানে লাখো মানুষের ভিড় ও আনন্দ-উচ্ছ্বাস। ঠিক সে সময়ে নয়াপল্টনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের চিত্রটা কেমন ছিল? সদর দুয়ার তালাবদ্ধ। দলীয় নেতাকর্মী কেউ আশপাশে নেই। পুলিশ বলেছে, বিএনপি অফিসে তারা তালা দেয়নি। দলের লোকেরাই অফিস খুলছে না, সেখানে আসছেও না। বিএনপি থেকে বলা হয়েছে, দলের নেতারা কারাগারে অথবা আত্মগোপনে, তাই আসতে পারেন না। দলের কর্মীরাও গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে সেখানে যাচ্ছেন না। এমন অবস্থা চলছে ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ গোলযোগের কারণে বন্ধ হওয়ার পর থেকে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল গত ১৫ নভেম্বর ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন স্থির করে মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই, প্রত্যাহার, চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণাসহ পুরো নির্বাচনি সময়সূচি জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনি তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে মনোনয়ন ফরম বিতরণের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো তফসিল প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোট না হলে তারা নির্বাচনে আসবে না।
২৮ অক্টোবরের ঘটনার পর থেকে বিএনপি দফায় দফায় অবরোধ কর্মসূচি দিচ্ছে দেশব্যাপী। নির্বাচনি তফশিল ঘোষণার পর তারা হরতালের ডাকও দিচ্ছে, যাতে জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোর সমর্থন রয়েছে। বিএনপির হরতালের মধ্যেই চলছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিতরণের উৎসব। এমন একটি দৃশ্যপট কারোই কাম্য ছিল না। সব রাজনৈতিক দল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নির্বাচন করবে এবং জনগণ তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে, এটাই ছিল কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যপট। কিন্তু তা হলো না। একপক্ষ আনন্দমুখর পরিবেশে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর একপক্ষ নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে হরতাল-অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। এটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের পরিপন্থি।
এক মাস হতে চলল বিএনপি তার নির্বাচনবিরোধী আন্দোলন তথা অবরোধ-হরতাল চালিয়ে যাচ্ছে। এতে জনগণের কাছ থেকে কতটুকু সাড়া পাওয়া যাচ্ছে? রাজধানীতে থেকে বোঝা যায় না বিরোধী দলের হরতাল কর্মসূচি রয়েছে। বাসসহ সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি পরিবহণ অবাধে চলেছে ঢাকা শহরে। অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার-দোকানপাট সবই খোলা ছিল। কোথাও বিঘ্ন ঘটেনি। দেশের অন্যত্র কমবেশি একই অবস্থা। বিএনপি ও জামায়াত কোথাও কোথাও হরতালের সমর্থনে ছোট আকারের ঝটিকা মিছিল করেছে এবং ওই পর্যন্তই।
বড় আকারের মিছিল-সমাবেশ করতে পারেনি। তবে অবরোধ-হরতালের সময় অগ্নিসন্ত্রাস হয়েছে, যা জনসমর্থন মোটেই পায়নি। সরকারি হিসাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাসসহ প্রায় দুইশ যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়। এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। দুটি স্থানে ট্রেনেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সরকারি কর্তৃপক্ষ এসব সহিংস ঘটনার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছে। এসব অভিযোগ বিএনপি নেতৃত্ব অস্বীকার করে কিছু বলেনি। কাজেই জনমনেও বিশ্বাস জন্মেছে যে, বাস পোড়ানোর ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এতে বিএনপির কোনো লাভ হয়নি। ক্ষতিই হয়েছে। আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শান্তিপ্রিয় জনগণ কখনোই সমর্থন করে না।
হরতাল-অবরোধ ও অগ্নিসন্ত্রাস যখন চলছে, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও গ্রেফতার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসের অভিযোগে মামলাও দেওয়া হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে। বিএনপি নেতৃত্ব অভিযোগ করেছে, সারা দেশে তাদের প্রায় ১৪ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়েছে এ পর্যন্ত। গ্রেফতার এড়াতে দলের নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রেফতারের সংখ্যা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করেনি। তারা বলেছেন, সন্ত্রাসের জন্য যারা দায়ী বা যাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাদেরই গ্রেফতার করা হচ্ছে।
তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যতদিন চলবে, গ্রেফতার অভিযানও ততদিন থাকবে। শুধু পুলিশ-র্যাব নয়, আওয়ামী লীগের কর্মী-ক্যাডাররাও সন্ত্রাস প্রতিরোধে রাস্তায় নেমেছে। হরতাল-অবরোধ, যানবাহনে আগুন, পুলিশের অ্যাকশন, আওয়ামী ক্যাডারদের প্রতিরোধ-সব মিলে একটি সংঘাতের পরিবেশ বিরাজ করছে দেশে।
সংঘাতময় রাজনীতি ও সহিংসতা জনগণের কাম্য নয়। করোনা-ডেঙ্গু মহামারি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত মানুষ এখন সংঘাতের রাজনীতির শিকার। জনগণকে জিম্মি করে রাজনীতির দাবাখেলা চলছে। আওয়ামী লীগের এক বড় নেতা জনসভায় প্রায়ই বলতেন, ‘খেলা হবে, খেলা হবে’। এই সহিংস খেলার কথাই কি তিনি বলেছিলেন? রাজনীতির খেলায় জনগণ এখন বড়ই অসহায়।
ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে এগিয়ে চলেছে, তাতে সহজেই বোধগম্য যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে এবং সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তবে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাকে আর একতরফা বলা যাবে না। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রার্থীরা ফরম কিনেছেন এবং দলীয় কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। বর্তমান সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও গ্রহণ করছে। জাসদসহ আরও বেশ কয়েকটি দল নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছে। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তো থাকবেনই। কাজেই ২০১৪ সালের মতো বিপুলসংখ্যক আসনে আওয়ামী প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভের ঘটনাও আর ঘটবে না। আসন্ন নির্বাচন একতরফা হতে যাচ্ছে একথা বলার সুযোগ নেই।
নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয় সে কথা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, চাপও দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি নির্বাচনে এলে তা অংশগ্রহণমূলক হবে, না এলে হবে না, এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। আওয়ামী লীগসহ যেসব দল এখন পর্যন্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এসেছে, তাদের কি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই? যদি আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা নাই থাকে, তাহলে দলটি এতদিন ক্ষমতায় আছে কীভাবে? এ দল অতীতেও ক্ষমতায় এসেছে জনগণের ভোটে। তদুপরি রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের রয়েছে সাত দশকেরও বেশি সময়ের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য।
আওয়ামী লীগ এখন জনগণের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য সেটা বুঝতে দলটিকে নির্বাচনে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। বিএনপিও অতীতে ক্ষমতায় ছিল, এ দলকেও নির্বাচনের মাধ্যমেই তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। এজন্য বিএনপি যাতে নির্বাচনে থাকে সে ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন।
এখন যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে বিএনপি নির্বাচন করবে কীভাবে? কারাগারে থেকে তারা তো নির্বাচন করতে পারবে না। অতএব বিএনপি যাতে নির্বাচন করতে পারে তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রথমেই প্রয়োজন দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা। এজন্য দুপক্ষকে কথা বলতে হবে, নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতা এবং ন্যূনতম ঐকমত্যে আসতে হবে। উভয় পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে। কোনো পক্ষ যদি গোঁ ধরে বসে থেকে বলে, ‘সালিশ মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার’, তাহলে কারোই লাভ হবে না। অসহায় জনগণ আরও অসহায় হয়ে পড়বেন।
সমঝোতা হলে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দিয়ে পুনঃতফশিল করা যাবে, যাতে সব পক্ষ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। সেই সময় ও সুযোগ এখনো আছে। রাজনীতিকরা যদি জনগণকে দুর্ভোগ থেকে বাঁচাতে চান, স্বস্তি দিতে চান, তাহলে তাদেরকে সমঝোতার পথেই হাঁটতে হবে। আর তা যদি না হয়, তাহলে জনগণ রাজনীতিবিমুখ হয়ে যাবেন। জনগণ রাজনীতিকদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবেন। সেটা কি ভালো হবে?
চপল বাশার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, লেখক
