Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আলোর মুখ দেখুক

Advertisement

Icon

ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আলোর মুখ দেখুক

Advertisement

রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় ২০২৩ সালে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব কার্যক্রমের পরও প্রায় সাত বছর চলা এ সংকট সমাধানের মুখ দেখছে না। এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি।

তবে কিছু রোহিঙ্গা ছয় বছরেরও বেশি সময় পর মিয়ানমারের রাখাইনে চীনের উদ্যোগে নেওয়া পাইলট প্রকল্প দেখে এসেছেন। সব মিলিয়ে যা হয়েছে তাতে রোহিঙ্গারা এখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে আছে আর বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। বছরজুড়ে চলা কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা এখানে তুলে ধরছি।

চীনের উদ্যোগে নেওয়া পাইলট প্রকল্প

মিয়ানমার সরকার ১১ জন কূটনীতিককে সেদেশের মংডু ও সিতওয়ে শহরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকা সরেজমিনে দেখাতে নিয়ে যায়। ১৫ মার্চ মিয়ানমারের ২২ সদস্যের প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে এসে ১৭৭টি পরিবারের ৪৮০ জন রোহিঙ্গার তথ্য যাচাই করে। চীনের উদ্যোগে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের আবাসনের জন্য ১৫টি নতুন গ্রাম তৈরি করতে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়।

২৩ মার্চ মিয়ানমার জানায়, এ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আরও পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৮ এপ্রিল কুনমিংয়ে চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং এর অংশ হিসাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তৃতীয় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। রোহিঙ্গাদের আÍবিশ্বাস বাড়াতে এবং রাখাইন রাজ্যের পরিবেশ প্রত্যাবাসন উপযোগী কিনা তা দেখার জন্য ২০ জন রোহিঙ্গাসহ ২৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে ৫ মে মিয়ানমারের উদ্যোগে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

মিয়ানমার দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় বলে তাদের জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নিজ গ্রামে ফেরত না যেতে পারলে প্রত্যাবাসনে আগ্রহী নয়। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ক্যাম্পে ফিরে যেতে অনীহা থাকায় তারা যেসব এলাকায় বসবাস করত সেখানেই তাদের পুনর্বাসনে রাজি হয় মিয়ানমার।

চীন পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ১৭৬ রোহিঙ্গাকে দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায়। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের টেকনাফে পাঁচটি ট্রানজিট কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাইলট প্রকল্প নিয়ে চীনের ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে সবসময় আশাবাদী।

রোহিঙ্গাদের অনুদান কমে যাওয়া

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ও সংকটের কারণে দাতারা অনুদান কমিয়ে দেওয়ায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্যসহায়তা প্রায় ১৭ শতাংশ কমিয়েছে। রোহিঙ্গাদের খাবারের জন্য মাথাপিছু মাসিক বরাদ্দ ছিল ১২ ডলার; ১ মার্চ থেকে তা কমিয়ে ১০ ডলার এবং ১ জুন থেকে ৮ ডলার করেছে। এর ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্যসংকট বাড়বে এবং ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ত্রাণকর্মীরা। রোহিঙ্গারা সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। রোহিঙ্গাদের খাদ্য বরাদ্দ কমানোর ফলে অপরাধ বেড়ে যাবে।

ক্যাম্প পরিস্থিতি

নানা কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো দিনদিন অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। সেখানে প্রতিনিয়ত হত্যা, মানব পাচার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, গুম, অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবি এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিসহ (আরসা) ১০টি দুর্বৃত্ত দল ও সশস্ত্রগোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে বলে জানা যায়।

ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০২১-২২ সালে সংঘটিত ২২২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার মধ্যে ৬০টি ছিল নাশকতামূলক। রোহিঙ্গাদের একটি অংশ খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, অস্ত্র, মাদক পাচার, চোরাচালানসহ নানা অপরাধে জড়িত। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের উপকূল থেকে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশিদের মানব পাচার এখন একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার থেকে অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে অবৈধভাবে মাদক ও ইয়াবা পাচার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তের নিরাপত্তাহীনতা পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, পুলিশের ওপর হামলা, হত্যা ও মানব পাচারসহ নানা অপরাধে ২ হাজার ৪৩৮টি বিভিন্ন ধরনের মামলা হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৬৪টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৬১টি সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় অন্তত ৭৪ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের একটি অংশ এসব অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে এবং নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছে। তাদের কারণে স্থানীয়রাও নিরাপত্তা হুমকিতে রয়েছে। বর্তমানে দেশের আশ্রয় শিবিরগুলোতে সাড়ে ১২ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ক্যাম্প এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণেও এ সমস্যার সমাধান করা বেশ কষ্টসাধ্য। ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন ধরনের মানবিক সেবায় দেশ-বিদেশের শতাধিক সংস্থার ২০ হাজারেরও বেশি কর্মী কাজ করছেন। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হওয়ার কারণে ক্যাম্পে কাজ করতে যাওয়া এনজিও-আইএনজিওর কর্মীরা উদ্বিগ্ন এবং তাদের অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব কারণে বেশকিছু এনজিও ক্যাম্পগুলোতে তাদের সেবা কার্যক্রম সীমিত রেখেছে এবং কয়েকটি এনজিও তাদের কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে।

ভাসানচর পরিস্থিতি

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ বিপর্যয় এবং কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরগুলোর ওপর থেকে চাপ কমাতে বাংলাদেশ সরকার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে, সব মিলে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে সেখানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ স্থানান্তর ব্যয়বহুল এবং বাংলাদেশের একার পক্ষে তা বহন করা কষ্টসাধ্য। ভাসানচরের খালি জায়গায় নতুন ক্যাম্প নির্মাণ করে দ্রুততম সময়ে যত বেশি রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করা যাবে, ততই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে নিতে বন্ধুরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশ সরকার পরিবহণ খরচ বহন এবং রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরে আরও নতুন অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা চেয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত হুমকি সৃষ্টি করছে, সামনের দিনগুলোতে যা আরও জটিল হবে। বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো এ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলে ক্যাম্পের পরিস্থিতির উন্নতি হবে আশা করা যায়।

উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম আসাদ আহমাদ খান ৬ জুলাই আইসিসির ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। তিনি ক্যাম্পের পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও তাদের সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেন। খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এর ফলে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি নারী ও শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল ১২ জুলাই রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে। তিনি রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে সংঘাতে না জড়িয়ে প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমারের নির্যাতনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারের জন্য ধৈর্য ধরতে আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, বর্তমানে আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় কানাডা ও ব্রিটেনসহ ছয়টি প্রভাবশালী দেশ যুক্ত হয়েছে।

২৪ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ইমন গিলমোর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। তহবিল সংকট কাটাতে ইইউ সদস্য ও অন্যান্য দেশের সরকারের সঙ্গেও তারা কাজ করে যাবেন বলে তিনি জানান। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে ইইউ জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও অন্যান্য ফোরামে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সাম্প্রতিক প্রস্তাবগুলো

বাংলাদেশের উদ্যোগে ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রেগুলোর পক্ষ থেকে ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রস্তাবটি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৫৩তম অধিবেশনে উত্থাপন করা হলে তা ১৪ জুলাই জাতিসংঘে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়।

প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা সব ধরনের নির্যাতন, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার আওতায় আনা ও তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকেও সমর্থন জানানো হয়।

২০ সেপ্টেম্বর ১৮তম এশিয়া কো-অপারেশন ডায়ালগে (এসিডি) রোহিঙ্গা সংকট ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এ ইস্যুটি আলোচ্যসূচির শীর্ষে রাখতে অনুরোধ জানানো হয়।

মিয়ানমার পরিস্থিতি

২০২৩-এর অক্টোবরের শেষভাগে জাতিগত সংখ্যালঘু তিনটি গোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠন মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ), তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) এবং আরাকান আর্মি (এএ) একত্রে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স নামে জোট গঠন করে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা শুরু করে।

এ ধারাবাহিকতায় এএ চলমান অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে রাখাইনে হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে জান্তা বাহিনী ও পুলিশ ৪০টি অবস্থান হারিয়েছে। রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘর্ষের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছে। এর পাশাপাশি সেখানে খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চলমান এ সংকটের কারণে সীমান্তের এ পাশে যেন কোনো প্রভাব না পড়ে সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে।

রোহিঙ্গাদের ঘরেফেরা কর্মসূচি

২৭ জুলাই রিইন্ট্রোডিউসিং উইম্যান’স লিডারশিপ ব্যানারে রোহিঙ্গা নারীদের নিয়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে রোহিঙ্গা নারী প্রতিনিধিরা জানান, তারা আর আশ্রিত জীবন চান না এবং নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চান। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোট রোহিঙ্গার ৫২ শতাংশ নারী। এই প্রথমবারের মতো তারা বাড়িফেরা কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন এবং ঐক্যবদ্ধ হলে রোহিঙ্গা নারীদের যে থামানো যাবে না, তারা সেটাই প্রমাণ করেছেন।

মানবিক কার্যক্রমের জন্য ব্যয় ছাড়াও বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ব্যবস্থাপনায় প্রচুর জনশক্তি ও অর্থ ব্যয় করছে। রোহিঙ্গা সংকটের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয় দিন দিন বেড়ে চলেছে। কক্সবাজারে মোট ২০ লাখ ৯২ হাজার ১৬ একর বনভূমির মধ্যে ৩ হাজার ৫০০ একর ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে হারিয়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রতিবছর ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।

সামনের দিনগুলোতে প্রত্যাশা

২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল-এ দীর্ঘ সময়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হওয়ায় সংকট মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। যে কোনো পরিস্থিতিতে ত্রাণ ও আর্থিক সাহায্য চলমান রাখতে জরুরিভিত্তিতে আপতকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ ও রিজার্ভ গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে। রাখাইনের স্থিতিশীল পরিস্থিতি নিশ্চিতপূর্বক চীনের উদ্যোগে নেওয়া চলমান পাইলট প্রকল্পকে সফল করে সামনের দিনগুলোতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলমান রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কার্যক্রমে একটা সেইফ জোন সৃষ্টি করে ক্রমান্বয়ে প্রত্যাবাসন চালু রাখা যেতে পারে।

রাখাইন প্রদেশের অবকাঠামো ও উন্নয়ন নিশ্চিত করে কর্মসংস্থান ও মৌলিক সমস্যাগুলো নিরসনে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া গতিশীল ও টেকসই করতে মিয়ানমার সরকার, সেনাবাহিনী, বৌদ্ধ ভিক্ষু সংগঠন, রাখাইন প্রদেশের জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধান ঘুচিয়ে আন্তরিক পরিবেশ ও আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ, অভিবাসী রোহিঙ্গা সংগঠন, এনইউজি ও এএ এবং রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে সক্রিয় গ্রুপগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ক্যাম্পের জনঘনত্ব কমিয়ে দ্রুত রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানোর কার্যক্রম নিতে হবে। ভাসানচরে অর্থায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আবাসন তৈরিতে সহায়তা করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের দ্রুত এ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দাতা সংস্থাগুলোকে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মিয়ানমারের মূল জনস্রোতে মিশে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কারিগরি প্রশিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে বলে আশা করা যায়। এ প্রচেষ্টা যেন চলমান থাকে। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের সম্প্রীতির সম্পর্ক বজায় রাখতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। দেশি ও আন্তর্জাতিক এনজিও এবং অন্যান্য সাহায্য সংস্থা এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্যাম্পের সামগ্রিক অপরাধ দমনে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়াতে হবে। মাদক ও অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করতে হবে। নিরাপত্তা তল্লাশি ও টহলের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের আস্তানায় বিশেষ অভিযান চালাতে হবে।

এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর চাপ ফেলবে, যা মোটেও কাম্য নয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে সশস্ত্র তৎপরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করে প্রত্যাবাসন শুরু করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

বাংলাদেশ আশা করে, জাতিসংঘ, দাতা দেশ ও মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানকারী সংস্থা, রোহিঙ্গাদের স্বার্থ ও অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন এবং নারী অধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত ফোরাম ও সংগঠনগুলো এ প্রলম্বিত সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রেখে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এ উদ্যোগ যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

২০২৩ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রাপ্ত সাহায্য আশানুরূপ ছিল না, সামনের দিনগুলোতে এ ত্রাণ সহায়তা চলমান রাখতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, এটা একটা আঞ্চলিক সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় ডিসেম্বরে চীন প্রথমবারের মতো ত্রাণ সহায়তায় যুক্ত হয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক। আঞ্চলিক দেশগুলোকেও এ সংকট সমাধানে মানবিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি এ সংকট নানা দিক দিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়িয়ে চলেছে। বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এ সমস্যা যেন গুরুত্ব না হারায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সজাগ থাকতে হবে। ২০২৪ সালে এ সংকটের সমাধান কার্যকর ও গঠনমূলক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আলোর মুখ দেখবে, এটাই প্রত্যাশা।

ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন : মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক

Advertisement

রোহিঙ্গা সংকট সমাধান আলোর মুখ দেখুক

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম