নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
শহরে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে ব্যাংক আমানত
Advertisement
ড. আর এম দেবনাথ
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে দিন দিন ব্যাংক আমানত বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন, ব্যাংক আমানত কি দেশের বিশেষ কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, গ্রামীণ আমানত কেন দিন দিন কমছে? তৃতীয় প্রশ্ন, ঢাকার আশপাশের অঞ্চলেও কেন এত কম মাথাপিছু আমানত? আবার প্রশ্ন আছে ব্যাংক আমানতের মালিকানা নিয়েও। দেখা যাচ্ছে, আমানত কেন্দ্রীভূত হচ্ছে বড় বড় হিসাবধারীর অ্যাকাউন্টে। এসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দরকার। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৫২-৫৩ বছর। ইতোমধ্যে দেশে প্রভূত উন্নতি/উন্নয়ন হয়েছে। বাজেটের আকার অনেক বড় হয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬-৭ শতাংশের ঘরে। আমদানি, রপ্তানি, রেমিট্যান্সের পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে। রাজস্ব আয় বেড়েছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার অনেক বড়। শিল্প খাত বড় হয়েছে। দারিদ্র্যের যে সীমারেখা আছে, তার নিচের মানুষের সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে। কৃষিতে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। চালে আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। শাক-সবজি, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম, তরিতরকারি, ফলমূলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতসব অগ্রগতি/অর্জন, উন্নতি/উন্নয়নের সুবিধা কি সমাজের নিচের স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাবে অনেক সূচক ব্যবহার করা যায়। এর থেকে একটা জবাব পাওয়া সম্ভব। এসব সূচকের একটি অবশ্যই হতে পারে ব্যাংক আমানত/সঞ্চয় নিয়ে।
এর আগে দেখা যাক খাতটি আকারে কত বড়। দেশে তফশিলি ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। এসব ব্যাংকের শাখা সংখ্যা ১১ হাজার ২১৯। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্যে আরও দেখা যায় ব্যাংক খাতে মোট আমানত ১৭ লাখ ১৩ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রামীণ আমানতের পরিমাণ ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। শহর এলাকায় আমানতের পরিমাণ ১৪ লাখ ৫৩ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে মোট হিসাব সংখ্যা ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ৬৮৪। হিসাবপ্রতি সঞ্চয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৪ টাকা। বলা বাহুল্য, এসবই হচ্ছে গড় হিসাব। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে নানাবিধ সমস্যা, যার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দরকার, যেমন গ্রামীণ আমানতের বিষয়টি। স্বাধীনতার পর থেকেই বহুদিন ধরে আমরা বলে আসছি গ্রামীণ আমানত মোট আমানতের মোটামুটি ১৮-২০ শতাংশ। এ নিয়েই অনেক প্রশ্ন ছিল। কেন গ্রামীণ আমানত বাড়ছে না? পাশাপাশি অবশ্য অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন গ্রামীণ জনসাধারণের ব্যাংক আমানতের পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এটা কিসের লক্ষণ? ব্যাংক আমানত মানে মানুষের সঞ্চয়। সঞ্চয় হচ্ছে একটা আর্থিক শক্তি। সঞ্চয়ই মানুষ দুঃসময়ে ব্যবহার করে। এ সঞ্চয় যত বাড়বে ততই ভালো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, যদিও তা আশানুরূপ নয়; কিন্তু এর মধ্যে আবার গ্রামীণ আমানতের অবদান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে দেখা যাবে মোট আমানতে গ্রামীণ আমানতের পরিমাণ মাত্র ১৫ শতাংশ। নিশ্চিতভাবেই এটা ভালো লক্ষণ নয়। তবে এখানে একটা প্রশ্ন আছে। গ্রামীণ আমানতের হিসাবায়নে কি সংজ্ঞাগত কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে? এটি হলেও বর্তমানে যে অবস্থা তা আশাপ্রদ নয় বলা যায়।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মোট আমানতের সিংহভাগই ছিল মেয়াদি আমানত। আর কিছু হচ্ছে সঞ্চয়ী আমানত এবং চলতি হিসাবের আমানত। এটা বিশাল একটা পরিবর্তন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান আমলে এ চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তখনকার দিনে সঞ্চয়ী আমানতের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। মেয়াদি আমানতের পরিমাণ ছিল কম। এর অর্থ, তখনকার সময়ে আমাদের পক্ষে টাকা সঞ্চয় করে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব ছিল না, যা আয় ছিল মোটামুটি তা-ই ছিল ব্যয়। সঞ্চয় ছিল সামান্য; যা ছিল তা আমরা রাখতাম সঞ্চয়ী আমানতে (সেভিংস অ্যাকাউন্ট)। টার্ম ডিপোজিট বা মেয়াদি আমানতে টাকা রাখা বা জমা করার লোকের সংখ্যা ছিল কম। এখন দেখা যাচ্ছে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। মেয়াদি আমানতের পরিমাণ বেশি। সেপ্টেম্বরে ১৭ লাখ ১৩ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে এফডিআর ছিল ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন আছে। এ ধরনের অ্যাকাউন্টের বৈশিষ্ট্যেরও পরিবর্তন ঘটেছে। আগে দেখা যেত সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টের টাকা মানুষ তুলে ফেলত। এখন সেই প্রবণতা কম। লোকে সঞ্চয়ী আমানতে টাকা ধরে রাখে। এ কারণে মেয়াদি আমানত (টার্ম ডিপোজিট) হিসাবায়নের সময় সঞ্চয়ী আমানতের সিংহভাগ টাকা যোগ করা হয়। এসবই আমাদের সঞ্চয়ী বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের লক্ষণ, যা ইতিবাচক। এদিকে দেখা যাচ্ছে, হিসাবপ্রতি গড় আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৪ টাকা। খারাপ না তথ্য হিসাবে। কিন্তু এখানে সমস্যা হচ্ছে, এটা গড় হিসাব। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু আয় অনেক কম। মাথাপিছু আমানতের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলায়। এর পরের স্থান হচ্ছে চট্টগ্রামের ১১ জেলার। রংপুর বিভাগের ৮ জেলার মানুষের মাথাপিছু আমানত দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। তারপরই স্থান করে নিয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলা। আমানতের দৃষ্টিকোণ থেকে তৃতীয় দরিদ্রতম হচ্ছে রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলা। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান হচ্ছে বরিশাল ও খুলনার। আটটি বিভাগের মধ্যে মাথাপিছু আমানতের দিক থেকে এক নম্বরে ঢাকা বিভাগ এবং দুই নম্বরে চট্টগ্রাম বিভাগ। বাকি বিভাগগুলোর স্থান খুবই নিচে। আরও কথা আছে। রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার মানুষের মাথাপিছু আমানত খুবই কম-মাত্র ১৯ হাজার টাকা। বলা বাহুল্য, এ জেলাগুলো হচ্ছে দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও। আমানত-দারিদ্র্য দ্বিতীয় স্থান ময়মনসিংহ বিভাগের। তাদের মাথাপিছু গড় আমানত মাত্র ২৩ হাজার টাকা। এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, এ বিভাগটির সব জেলা রাজধানী ঢাকা শহরের খুবই কাছে অবস্থিত। এ জেলা থেকে একজন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিসহ তিনজন রাষ্ট্রপতি আমরা পেয়েছি। তবু কী দারিদ্র্যের নিরিখে, কী আমানত-দারিদ্র্যের নিরিখে এ বিভাগটির অবস্থা শোচনীয়। আবার দেখা যায় ঢাকা বিভাগের কিশোরগঞ্জ জেলার আমানত-দারিদ্র্যও প্রকট। সাধারণ দারিদ্র্যের ক্ষেত্রেও তা-ই। এদিকে যে সিলেট বিভাগের এত সম্পদ, সেই বিভাগে ব্যাংক আমানত, মাথাপিছু ব্যাংক আমানত খুবই কম। অথচ এ বিভাগ থেকে তিনজন ডাকসাইটে অর্থমন্ত্রী আমরা পেয়েছি। এ বিভাগের মাটির নিচে তেল ও গ্যাস, উপরে প্রচুর চা বাগান। আবার বিদেশে বসবাস করে বহু সিলেটি, যাদের অনেকেই বিরাণ অঞ্চলেও আলিশান দালানকোঠা নির্মাণ করে রেখেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে দারিদ্র্যে তারা অন্যতম। এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সুনামগঞ্জের।
আসা যাক আমানত কেন্দ্রীভূত হওয়ার পরিসংখ্যানে। দেখা যাচ্ছে, ১০ কোটি টাকার উপরে আমানত আছে ২৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ হিসাবধারীর। প্রায়ই খবরের কাগজে তথ্য দিয়ে বলা হয়, কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ১০ কোটি থেকে ১৫ কোটি টাকা আমানত আছে এমন হিসাবধারীর সংখ্যা ৪ হাজার ৭৪। ৫০ কোটি টাকার উপরে ব্যালেন্স আছে এমন হিসাবধারীর সংখ্যা ১ হাজার ৭৭৮। হিসাবধারী অবশ্য ব্যক্তিও হতে পারে, প্রতিষ্ঠানও হতে পারে। বোঝার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তির হিসাবকে আলাদাভাবে দেখালে আমরা বুঝতে পারতাম অবস্থাটা আসলে কী।
পরিশেষে প্রশ্ন, এসব তথ্য/পরিসংখ্যান কি অস্বাভাবিক? আমি মনে করি, মোটেই নয়। দেশে বর্তমান অনুসৃত অর্থনৈতিক মডেলে এর ব্যতিক্রম ঘটাই অস্বাভাবিক। আমাদের অনুসৃত মডেল বাজার অর্থনীতি (মার্কেট ইকোনমি)। না, ঠিক বললাম না। আমাদের অর্থনীতিকে বলা হয় ‘আগ্রাসী বাজার অর্থনীতি’। এখানে মেধা, প্রতিযোগিতা, দক্ষতা ও শ্রমের মূল্য কম। রমরমা অবস্থা তাদের, যাদের অবস্থান ক্ষমতার কাছাকাছি। একে বলা যায় অন্যভাবে। যেমন কাঁটাওয়ালা গাছ লাগিয়ে আমরা কেউ সুস্বাদু আম আশা করতে পারি না। ক্ষমতানির্ভর অর্থনীতিতে আমানত কেন্দ্রীভূত হবে, কিছু লোক বড় আমানতের মালিক হবে এটাই স্বাভাবিক।
এ ধরনের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হবে। কিন্তু পাশাপাশি বৈষম্য বাড়বে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য বাড়বে। অঞ্চলে-অঞ্চলে বৈষম্য বাড়বে। মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়বে। বহু মানুষ পেছনে পড়ে যাবে। তাদের রাষ্ট্রের আনুকূল্যে বেঁচে থাকতে হবে। এ জন্যই দিন দিন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং এর আওতা বড় হচ্ছে। বাড়বে বরাদ্দ। ফলে অসহায় মানুষ পরিণত হচ্ছে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল একটা জনগোষ্ঠীতে। গ্রামের মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে, কর্মচ্যুত হয়ে আসবে শহরে। বাড়বে শহরের কলেবর। এ কারণেই ঢাকা শহর পরিণত হচ্ছে একটি ‘অতি বৃদ্ধ’ শহরে। এটা এখন ব্যবস্থাপনার ঊর্ধ্বে। শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে। এ শহরের লোকেরা খায় বেশি, ভোগ করে বেশি। উচ্চমূল্যের জিনিসপত্র, মাছ-মাংস, তেল-দুধ, ডিম, তরিতরকারি এ শহরের লোকেরাই খায় বেশি, ভোগ করে বেশি। এখানে লোকের সঞ্চয়ও বেশি, তাদের আমানতও বেশি। তারাই সঞ্চয় করতে পারে। তারাই ফ্ল্যাট-বাড়ি-জমি কেনার ক্ষমতা রাখে। এসব কারণেই এখানে ব্যাংক আমানত বেশি। এখানে ব্যাংক ঋণও বেশি। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে উন্নয়নের দর্শন ও কৌশল পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
