নির্বাচনের পরব ও ভাষা-সন্ত্রাস
Advertisement
পবিত্র সরকার
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতে লোকসভার একটি নির্বাচন আসছে, যার একটি রঙ্গভূমি হলো পশ্চিমবঙ্গ। অন্য প্রদেশগুলোর খবর রাখি না, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নানা পক্ষের ব্যক্তি ও দলের মধ্যে কথার যুদ্ধ এরই মধ্যে বেশ জমে উঠেছে, প্রবল গরমেও তাতে বিশ্রাম নেই। বিশ্রাম থাকবেই বা কেন; যে মহারণ আসছে, তাতে জয়-পরাজয় অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে প্রার্থীর বচনপটুতার ওপর নির্ভর করে। পার্লামেন্টে গিয়ে তিনি পাঁচ বছর মুখ না খুলুন, নির্বাচনের ময়দানে তাকে প্রচুর কথা বলতেই হবে। তার মধ্যে প্রতিপক্ষকে গালাগাল একটা অনিবার্য উপাদান।
Verbal violence বা ভাষা-সন্ত্রাস (বা ভাষা-হিংস্রতা) একটা গুরুগম্ভীর পরিভাষা, এ কথাটার সোজা মানে হলো গালাগাল। ভাষা দিয়ে আমরা বহু কাজ করি, যেমন প্রেম নিবেদন, শিশুকে আদর, সন্তানদের শাসন, দোকানে-বাজারে দরাদরি, মাঠে নিজের দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহদান, থিয়েটারে দুর্বল অভিনয়কে ‘আওয়াজ’ দেওয়া ইত্যাদি। গালাগাল সেইরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এটা ভালো না মন্দ, সে বিচারে আসার আগে বলা ভালো-যেটা সবার জানা কথা-যে আমরা সাধারণ মানুষ একা বা দলে পড়ে সবাই কখনো না কখনো গালাগাল দিই। বিনিময়ে গালাগাল খাইও বটে। পৃথিবীর সব ভাষার মানুষ। এবং বেশির ভাগ ভাষা কাজের মতোই গালাগাল দ্বিপাক্ষিক। অর্থাৎ একপক্ষ গালাগাল দেয় অন্য এক পক্ষকে। এমন সম্ভাবনা প্রায়ই থেকে যায় যে, যে পক্ষ সে গালাগাল ফিরিয়ে দেবে।
অবশ্যই গালাগালের ক্ষেত্রেও, সংঘটিত অপরাধের মতোই, একটা সালিশি বা arbitration-এর সুযোগও থাকে। যেমন স্কুলে একটি ছেলেকে কেউ গালাগাল দিল, সে স্যার বা ম্যাডামের কাছে গিয়ে নালিশ করল, স্যার/ম্যাডাম গালাগালের গুরুত্ব বুঝে অপরাধীকে শাস্তি দিলেন বা বললেন, ‘খবরদার, আর যেন এই নালিশ না শুনি!’ সামাজিক প্রকাশ্য গালাগালেও সালিশি হতেই পারে, সেটা আমরা পরে-নির্বাচনিক গালাগালের বিচার উপলক্ষ্যে খানিকটা বিস্তারিতভাবেই বুঝে নেব। এ লাইনটা লিখতে গিয়েই চোখে পড়ল যে ‘নির্বাচন’ কথাটার মধ্যে লুকিয়ে আছে ‘বাচন’ কথাটা। যার উৎপত্তি ‘বাক্’ থেকে, আর গালাগাল হলো বাক্ বা বাচনেরই এক অঙ্গ। জানি না, বাগ্দেবী সরস্বতী গালাগালেরও দেবী কি না।
আমরা সেসব উৎসবের কথা শুধু ছুঁয়ে যাব, যেগুলোতে গালাগাল একটা উৎসব বা অনুষ্ঠানের (ritual) অঙ্গ। সেখানে গালাগাল শুনে কেউ কিছু মনে করে না। আপনারা প্রায়ই দেখবেন, যখন কিছু শ্রমিক দলবেঁধে একটা ভারী কাজে হাত লাগায় এবং কয়েকটা ধাক্কায় বা ধাপে সে কাজটা সমাধা করতে হয়, তখন ‘মারো জোয়ান, হেঁইও’, ‘আউর থোড়া, হেঁইও’, ‘বাঁয়া সামহালকে, হেঁইও’, ‘ডাহিন বাঁচাকে, হেঁইও’ ইত্যাদি সমবেত শীৎকার উঠতে থাকে, তখন কন্ট্রাক্টর বা মালিকের নাম না করে তাদের বাড়ির মহিলাদের সম্বন্ধে অশ্রাব্য ও যৌন ইচ্ছাপূরক নানা শব্দ সেই স্লোগানগুলোর সঙ্গে মিশে যায়। ভদ্রলোকের তা শুনে কানে হাত দিয়ে পালানোর কথা; কিন্তু এ যৌথ শ্রমকৃত্যের প্রতিবেশে এ বিষয়ে কন্ট্রাক্টর বা মালিকরা কেউ গা করে না। এগুলো খানিকটা পুজোর মন্ত্রের মহিমা পায়। এরকম ঘটে উত্তর ভারতে দোলের সময়। শুনেছি সেখানেও রংখেলা উপলক্ষ্যে সমাজের নানা উপরওয়ালাদের প্রচুর গালাগাল করা হয় এবং তারাও সেটা অবিচলিতভাবে সহ্য করেন।
না, সাধারণ সামাজিক গালাগাল এবং নির্বাচন উপলক্ষ্যে গোষ্ঠীর গালাগাল এ ধরনের পবিত্র আনুষ্ঠানিকতা মাত্র নয়। তা রীতিমতো গায়ে জ্বালা ধরায় এবং হয় প্রতিগালাগাল, না হয় সালিশ-নালিশ আমন্ত্রণ করে। নির্বাচন এলেই যা ঘটে। ফলে একটি ফর্মুলার আকারে গালাগালের সামাজিক সংগঠনকে হয়তো এভাবে দেখানো যেতে পারে-
পক্ষ ১-এর গালাগাল >>><<<পক্ষ ২-এর প্রতি গালাগাল এবং এ চক্রের পুনরাবৃত্তি অথবা বিকল্পে পক্ষ ১-এর গালাগাল >>> পক্ষ ২-এর সালিশ-দরবার। সালিশ সার্থক ও বলশালী হলে গালাগাল বন্ধ, না হলে গালাগাল চক্রের পুনরাবৃত্তি।
২.
গালাগালের পেছনে যে মনস্তত্ত্ব আছে, তা এখন সবারই জানা। গালাগাল দিই আমরা অন্যের ওপরে, সত্য না হোক, একটা সাময়িক ও মানসিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। গালাগালের নানা ধরন আছে। আত্মবিজ্ঞাপন দিয়ে বলি যে, এ নিয়ে সম্ভবত বাংলা ভাষায় প্রথম আমরাই আলোচনা করেছি। আমাদের তা নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনাও আছে, আগ্রহী পাঠক আমাদের ‘লোক, ভাষা, সংস্কৃতি নন্দনতত্ত্ব’ বইটি দেখতে পারেন। সেখানে আমরা খিস্তি, গালাগাল ইত্যাদির তাত্ত্বিক পার্থক্য করে দেখিয়েছি গালাগালের প্রধান দু-তিনটি ধরন এরকম :
১. আরোপমূলক : প্রতিপক্ষকে নানাবিধ পশুপাখির শ্রেণিতে ফেলা-গরু, ছাগল, শূকর, শকুন ইত্যাদি। কখনো অবৈধ সম্পর্কজনিত জন্মের অধীন করা।
২. বক্তার ইচ্ছাপূরক : প্রতিপক্ষের সর্বনাশ, মৃত্যু ইত্যাদি (‘তেরাত্তির যেন না পোহায়’ গোছের)।
৩. প্রতিপক্ষের অগৌরবের ইতিহাসকে সামনে আনা : যেমন প্রতিপক্ষ মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর নন্দীগ্রামে পরাজয়ের কথা বা সিঙ্গুরে টাটাদের বিতাড়নের কথা যেমন বলছেন, তেমনই শ্রীসৌগত রায় সুজন চক্রবর্তীর ২৬ হাজার ভোটে হেরে যাওয়ার কথা বলছেন। এগুলো ঠিক গালাগাল নয়, কিন্তু প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এবং প্রতিপক্ষের তুলনায় নিজের গৌরব জাহিরের একটা উপায় তো বটেই। গালাগালের একটা উদ্দেশ্যও তাই।
আপাতত এ তিন ধরনের উক্তি-প্রত্যুক্তিই খুব চলছে। সভায় বলা হচ্ছে, ভিডিও বা টেলিফোন-সংলাপ ‘ভাইরাল’ হচ্ছে এবং আমরা ভদ্রলোকেরা শুনে শিহরিত হচ্ছি। সাবেক বিচারক শ্রীঅভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ‘মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে’ বলে একটি অবাঞ্ছিত উক্তি করেছেন; তার ফলে তৃণমূল দলের মর্মযন্ত্রণা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে এবং তারা নিজেদের বিতৃষ্ণা ও বেদনায় দিশাহারা হয়ে জনতার দরবার থেকে কমিশনের দরজা পর্যন্ত ছোটাছুটি করছেন। এটা ঠিকই, শ্রীগঙ্গোপাধ্যায় ব্যক্তিনাম উল্লেখ করে ‘মৃত্যু’ প্রসঙ্গ এনে অনুচিত কাজ করেছেন, তার ব্যাখ্যা যা-ই দিন তিনি।
৩.
আমাদের মতো বৃদ্ধরা, যাদের বয়েস অনেক এবং অনেকে আমাদের ইতিহাসের সাক্ষী বলে মনে করে, তারা সাধারণভাবে এ প্রশ্নটার মুখোমুখি হই : আগে কি এরকম ছিল? এ অসৌজন্য, এ অপমানজনক, কখনো হিংস্র ভাষা? আমরা বলি যে, আগে কী ছিল, তা বলা খুব সহজ নয়। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিলোপের উদ্যোগ নিলে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল রক্ষণশীল সমাজপতিরা, মৃত্যু কামনা তো তার আবশ্যিক উপাদান। প্যারীচরণ সরকার বারাসতে মেয়েদের স্কুল বসানোতে তাকেও হত্যা করতে লাঠিয়াল পাঠিয়েছিল জমিদাররা। গালাগাল তো সে তুলনায় নস্যি। আমরা বেশির ভাগ নির্বাচন দেখেছি বা সেসবের খবর পেয়েছি মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমে। সেখানে সব গালাগাল বা কটূক্তি হয়তো আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। ‘দাদাঠাকুর’ ও অন্যান্য ছবির দু-একটা দৃশ্য দেখে মনে হয়, সে সময়ে নির্বাচনও ভাষা ব্যবহারের দিক থেকে খুব নিরিমিষ বা নিষ্কলুষ ছিল না। ‘চোর’, ‘ডাকাত’, ‘লুটেরা’ ইত্যাদি কথা এখন গালাগাল না নিজেদের কৃতকর্মের দ্বারা অর্জিত নিছক বিশেষণ, তাই নিয়ে তর্কাতর্কি চলতেই পারে, তার মীমাংসা হওয়া খুব মুশকিল। আমাদের মনে আছে, ১৯৮০-এর মাঝামাঝি বছরগুলোয়, সম্ভবত বিহার থেকে, এ সমিল ঘোষণাটি চালু হয়েছিল, ‘গলি গলিমে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়’। তার জন্য কাউকে জেলে যেতে হয়েছিল বলে জানি না। তবে এখন টেলিভিশন, ভিডিও, সিসিটিভি কত কী হয়েছে, আর ক্যামেরা সামনে এলে হয়তো কারও কারও উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়, কাজেই অসতর্ক কথার পরিমাণ বাড়ছে। এক সময় Politics is a game of scoundrels কথাটা শুনতাম, তার সঙ্গে এসব অপভাষা প্রয়োগের কোনো যোগ আছে কি না কে জানে?
অর্থাৎ শুধু নির্বাচন নয়, সমাজে প্রতিপক্ষতার নানা উপলক্ষ্য তৈরি হয়। তাতেও গালাগাল মারধরের অবাধ সুযোগ। কিন্তু নির্বাচনের ওই এক তীব্র লক্ষ্য, প্রতিপক্ষের তুলনায় আমি মহৎ, নিষ্কলঙ্ক, কর্মঠ, জনদরদি, এবং নানা বিচিত্র গুণের অধিকারী-রাস্তার ধারে চায়ের স্টলে চা বানাতে বা কচুরি ভাজতেও আমার দক্ষতা কম নয়। কাজেই আমাকে ভোট দেবে না-এমন অবিবেচকের এ ধরাধামে থাকার কোনো অধিকার আছে?
নির্বাচন আসবে আর আকথা-কুকথার বন্যা বইবে না, তা কি হয় নাকি?
পবিত্র সরকার : ভারতের খ্যাতনামা লেখক; সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা
