‘নেবে তো আমায়?’
Advertisement
সেলিম জাহান
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি
সাগরের ঢেউয়ে চেপে
নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছ,
আমি শুনেছি সেদিন তুমি
নোনা বালি তীর ধরে
বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছ।’
মৌসুমী ভৌমিকের এ গান আমার বড় প্রিয়। প্রায়ই শুনি, আমার বাড়ির বারান্দায় দুলুনি চেয়ারে বসে বাইরের দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়ে। ঠিক কী আছে গানটাতে, আমি জানি না, কিন্তু শুনতে শুনতে চোখের দৃষ্টি উদাস হয়ে যায়, মনটা হুহু করে ওঠে, কেমন একটা বিষণ্নতায় ছেয়ে যায় হৃদয়।
বিশেষত মৌসুমী যখন গেয়ে ওঠেন-
‘আমি কখনো যাইনি জলে,
কখনো ভাসিনি নীলে,
কখনো রাখিনি চোখ ডানা মেলা গাঙচিলে,
আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে,
আমাকেও সাথে নিও,
নেবে তো আমায়, বলো নেবে তো আমায়?’
এ আর্তি বাতাসকে চিরে চিরে প্রতিধ্বনিত হয়, চোখ ছাপিয়ে যায় জলে, মাথার মধ্যে ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে’ কে যেন কথা কয়, ‘নেবে তো আমায়? নেবে তো?’ যতবার গানটা শুনি, এ লাইন ক’টা এলেই কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়ি, কত কথা মনে হয়, কতজনের কথা ভাবি-কিছু না দেখার কথা, কিছু তৃষিত আকাঙ্ক্ষার। সবই ওই সমুদ্র বিষয়ে।
এই যে একজন অবয়বপত্র বন্ধু লিখেছেন তার মা-বাবার কথা। বিদেশে ছেলের কাছে বেড়াতে এসেছেন তারা। ছেলে, ছেলে-বউ সযত্নে নিয়ে গেছে মা-বাবাকে সমুদ্রসৈকতে। সমুদ্র-দর্শনে দুজনেই উত্তেজিত, উল্লসিত ও উদ্ভাসিত। ছেলে স্মিতমুখে বাবাকে মন্তব্য করেছে, ‘বঙ্গোপসাগর দেখেছেন, এবার আটলান্টিক দেখলেন।’
ছেলেকে অবাক করে দিয়ে মা-বাবা জানালেন যে, এর আগে দুজনের কেউই সাগর দেখেননি। এ স্বীকারোক্তিতে পুত্রটি হতবাক। প্রতিষ্ঠিত পরিবার, মা-বাবা দুজনেই ভালো চাকুরে ছিলেন, কিন্তু এর আগে কোনোদিন সমুদ্র দেখেননি! অথচ দেশে থাকতেই, ছেলেটি ভাবে, সে কতবার কক্সবাজার কুয়াকাটা গেছে বন্ধুদের সঙ্গে। আর তার মা-বাবা কিনা এর আগে সমুদ্র দেখেননি!
মাকে প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দিয়েছেন, ‘সময় হয়নি’। বহু বছর আগে আমার বয়োজ্যেষ্ঠ এক অতি প্রিয়জন যখন ভীষণ অসুস্থ, তখন তার ছেলে-মেয়ে দুজন মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কী তার মন চায়। খুব নরম স্বরে তিনি বলেছিলেন যে জীবনে তিনি সমুদ্র দেখেননি-সমুদ্র দেখা এবং সমুদ্র স্নানের বড় সাধ তার। তার সন্তানরা তাকে কক্সবাজার নিয়ে গিয়েছিল। তিনি হাঁটতে পারতেন না বলে তাকে একটি রিকশার পাটাতনের ওপরে বসিয়ে জলের ধারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
শুনেছি, সমুদ্রের দিগন্ত রেখার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার দুচোখ জলে ভরে গিয়েছিল। তিনি মৃদুস্বরে বলেছিলেন, ‘তিনি কল্পনায় যে সমুদ্র দেখেছেন, তারচেয়ে বাস্তবের সমুদ্র অনেক বেশি সুন্দর।’ সবাই মিলে রিকশাটিকে জলে নামালে সমুদ্রের লোনাজল পরম আদরে তাকে সিক্ত করে দিয়েছিল। বহুকালের একটি লালিত আকাঙ্ক্ষা তার পূরণ হয়েছিল। এ ঘটনার পরে তিনি আর বেশিদিন বাঁচেননি।
আমি প্রথম বহুদূর থেকে সমুদ্র দেখি ষাটের দশকের প্রথমার্ধে-যখন আমি বারো বছরের বালক। ফেনী থেকে রেলগাড়িতে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে কুমীরার কাছাকাছি এলে যাত্রীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যেত। কারণ ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে ক্ষণিকের জন্য বঙ্গোপসাগরের এক চিলতে রুপালি জল দেখা যেত। একবার এ রকম এক ভ্রমণে আমার পিতা আমাকে দেখিয়েছিলেন। তেমন কিছু মনে হয়নি আমার, হতবাকও হইনি, সাড়া তোলেনি তা আমার বালক হৃদয়ে।
কিন্তু মধ্য সত্তরে যখন বঙ্গোপসাগরের তীরে দাঁড়িয়েছি, তখন তার বিশালত্ব, অবিরাম গর্জন, ঢেউয়ের মাথা কুটে মরার চিত্রপটের সামনে হতচকিত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, একটা ঘোর লেগে গিয়েছিল এবং কেন জানি চোখ ছাপিয়ে জল এসেছিল। তারপর এ দীর্ঘ চার দশকে কত সমুদ্র দেখেছি। বড় নমিত হয়ে বলি, আমার এ জীবনে পৃথিবীর সব মহাসাগর দেখেছি, চল্লিশটিরও বেশি সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়েছি, বহু উপসাগরের জলে পা ভিজিয়েছি। তবু সমুদ্র এখনো আমাকে আবিষ্ট করে রাখে, তরঙ্গ এখনো আমায় টানে, সমুদ্র-তৃষা আমার আজও আকণ্ঠ।
আসলে সমুদ্রের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দুর্নিবার। প্রেসিডেন্ট কেনেডি একবার এ আকর্ষণের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তার মতে, মানুষ জল থেকেই এসেছে, জলেই আবার ফিরে যাবে। হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় ওই আকর্ষণের কারণটা হয়তো অন্য জায়গায়-অন্তত আমার ক্ষেত্রে। পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে তুলনা করে বলা যাক।
আমি পাহাড় ও সমুদ্র দুটোই ভালোবাসি। দুটোই বিশাল, যার সামনে মাথা নত হয়ে আসে। কিন্তু পাহাড় হচ্ছে স্থির, নিশ্চল ও মৌনী। অন্যদিকে সমুদ্র অস্থির, জীবন্ত এবং কথা কয়। পাহাড়ের মধ্যে একটা প্রশান্ত ভাব আছে, সমুদ্রের আছে গতিময়তা। পাহাড় বহু দূরের, সমুদ্র বড় কাছের। পাহাড়কে মনে হয় ধরাছোঁয়ার বাইরে; কিন্তু সমুদ্রকে স্পর্শ করা যায়। পাহাড়কে সম্মান করা যায়, সমুদ্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়।
কিন্তু সমুদ্র দেখতে হলে কি সব সময়ে জলের সমুদ্রের কাছে যেতে হয়? তা কিন্তু নয়। আমাদের আশপাশে অনেক মানুষ আছেন, যাদের হৃদয়ে মমতার সমুদ্র, কথায় মায়ার সমুদ্র, আর চোখে স্বপ্নের সমুদ্র। সুদূরে জলের সমুদ্রের আকাঙ্ক্ষায় আমরা যেন আমাদের চারপাশের মায়ার, মমতার আর স্বপ্নের সমুদ্রে ডুব দিতে ভুলে না যাই। তখন মৌসুমীর গানের শেষ চরণটি মনে পড়ে যায়, ‘তাই স্বপ্ন দেখব বলে আমি দু’চোখ পেতেছি’।
ড. সেলিম জাহান : অর্থনীতিবিদ; সাবেক পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
