উপদেষ্টাদের উচিত প্রধান উপদেষ্টাকে চাপমুক্ত রাখা
Advertisement
এম আবদুল্লাহ
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অভুতপূর্ব এক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয়েছে দেশ। জাতির ঘাড় থেকে জগদ্দল পাথর অপসৃত হয়েছে। তারুণ্যের দুর্দান্ত শক্তির সঙ্গে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সমর্থন ও সহযোগিতায় দেড় দশক পর মুক্ত বাংলাদেশের সর্বস্তরে এখন পালাবদলের হাওয়া বইছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলো এরই মধ্যে। প্রচণ্ড চাপের মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করতে হচ্ছে অরাজনৈতিক সরকারকে।
৮ আগস্ট ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে ১৭ সদস্যের যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে, তাদের দপ্তর বণ্টন করা হয় পরদিন। প্রথমে ২৭টি মন্ত্রণালয় ছিল প্রধান উপদেষ্টার হাতে। পরে শপথ গ্রহণকারী তিন উপদেষ্টার দপ্তর বণ্টনের পর এখন ২৪টি মন্ত্রণালয় দেখভাল করতে হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টাকে। এর মধ্যে রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, সড়ক ও সেতু, কৃষি, জনপ্রশাসন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, তথ্য ও সম্প্রচারসহ গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। বাকি ১৬ জনের মধ্যে অন্যান্য মন্ত্রণালয় বণ্টন করা হয়েছে। বস্তুত নতুন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টাকে। একজন মানুষের পক্ষে ২৪টি মন্ত্রণালয় সামলানো শুধু কঠিন নয়, রীতিমতো অসম্ভব।
অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টার সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ২০০৭ সালের আগে সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর কাজ ছিল শুধু একটি নির্বাচন পরিচালনা করা। তারা রুটিন কাজ ছাড়া কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন না। ফলে সেখানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসংখ্যা কম থাকলেও সমস্যা হয়নি। কিন্তু বর্তমান সরকার বিগত ষোলো বছরের স্বৈরশাসনে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ফলে তাদের কর্মপরিধি ব্যাপক। বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তাদের অগ্রসর হতে হবে।
গণবিস্ফোরণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ আসছে এবং আসবে সবচেয়ে বেশি। এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। পুলিশে বিদ্রোহ সৃষ্টির অপচেষ্টা, জুডিশিয়াল ক্যু করার পাঁয়তারা, রাতে ডাকাত নামিয়ে ও গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভোঁতা কার্ড ব্যবহার এবং ১৫ আগস্টে মাঠ দখলের ঘোষণা দিয়ে একধরনের শঙ্কার মধ্যে ফেলা হয়েছিল। অবশ্য রাজনৈতিক দল ও ছাত্রদের সহযোগিতায় তা বেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করা গেছে।
পতিত আওয়ামী লীগ ছাড়াও ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিএনপি, জামায়াতসহ ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক শক্তিও একটি নির্দিষ্ট সময় পর চাপ বাড়াবে। মাস ছয়েক পর বর্তমান সরকারের ক্ষমতা প্রলম্বিত করাকে যে তারা চ্যালেঞ্জ করবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। সর্বোপরি যে ছাত্র ও তারুণ্যের শক্তিতে ভর করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে, তা তাদের পূরণ করতে হবে।
আমরা জানি, ‘সুপারম্যান’ একটি কাল্পনিক কমিক চরিত্র। এর নির্মাতা ১৯৩২ সালে আমেরিকান লেখক জেরি সিগাল এবং জোই শাস্টার। অবশ্য পরে তারা ডিটেকটিভ কমিকসের কাছে ১৯৩৮ সালে স্বত্ব বিক্রি করে দেন। চরিত্রটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালের জুনে অ্যাকশন কমিকসের প্রথম সংখ্যায়। পরবর্তীকালে নানা রেডিও চ্যানেল, টেলিভিশন সিরিয়াল, চলচ্চিত্র, সংবাদপত্রের স্ট্রিপ বা ভিডিও গেমে এর বহুল ব্যবহার দেখা যায়। সুপারম্যান তার ব্যাপক সাফল্যের মাধ্যমে সুপারহিরো সিরিজের এক নতুন ধারা চালু করে।
কমিকটির কাহিনি অনুযায়ী, সুপারম্যান ক্রিপটন গ্রহে জন্মগ্রহণ করে। সে সময় তার নাম ছিল ক্যাল-এল। ক্রিপটন ধ্বংস হওয়ার আগমুহূর্তে তার বাবা তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়। আমেরিকার ক্যানসাস শহরের এক কৃষক ও তার স্ত্রী তাকে খুঁজে পায়। সেখানে সে ক্লার্ক কেন্ট নামে বড় হতে থাকে। ছোটবেলা থেকেই তার নানা অতিমানবীয় ক্ষমতা দেখা যায় এবং বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে এ ক্ষমতা দিয়ে মানুষের উপকার করতে থাকে। এ কমিক চরিত্রটি দেখে অনেক তরুণ-যুবক নিজেকে সুপারম্যান ভাবতে চায়। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও সুপারম্যানের মতো অতিমানবীয় ক্ষমতার প্রত্যাশা জন্ম নিতে দেখা যায়।
সপ্তাহকাল ধরে ড. ইউনূস সরকারের কাছে বাংলাদেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রত্যাশার বহর দেখে মনে হচ্ছে-তারা তাকে সুপারম্যানের মতো অতিমানবীয় ক্ষমতাধর দেখতে চাইছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর দম নিতে পারছেন না তিনি। দেড় দশকের অপশাসন, দুঃশাসন, নিপীড়ন, নির্যাতন, বঞ্চনার প্রতিকার মনে হচ্ছে দেড় সপ্তাহের মধ্যেই করে ফেলতে হবে। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে বিক্ষোভ করছেন পদোন্নতি ও প্রাপ্য পোস্টিংবঞ্চিতরা। আনসার বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভে নেমে গেলেন হাইকোর্টের গেটে। পতিত সরকারের সময়ে সবচেয়ে সুবিধাভোগী হিসাবে পরিচিতি পাওয়া পুলিশবাহিনীরও দাবিদাওয়ার বহর এক-দুটি নয়-১১টি।
দাবি ও প্রত্যাশার ফর্দ নিয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোও। দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত ও ভঙ্গুর। মূল্যস্ফীতি দেড় যুগে সর্বোচ্চ। জ্বালানি খাত তো বর্তমান সরকারের জন্য কঠিন চ্যালঞ্জ হিসাবে সামনে রয়েছে। সর্বস্তরে দলীয়করণের কারণে কাজের পরিবর্তে সরকারের শীর্ষ কর্তাদের তোষামোদি করে ফায়দা লোটা কালচার হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এক ব্যক্তির খেয়ালখুশিতে পরিচালিত তিন মেয়াদের শাসনের পরিণতিতে সবাই হতাশার সঙ্গে বলতে শুরু করেছিলেন, এদেশে আর সুশাসন ফেরানো সম্ভব নয়। দলবাজি, ব্যক্তিপূজা, ক্ষমতার অপচর্চা, বেপরোয়া লুটপাট ও দুর্নীতি শিকড় গেড়ে বসেছিল। এমন প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ভেঙে জনগণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তন করার অঙ্গীকার পূরণ কম চ্যালেঞ্জের নয়।
বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি খুবই দুর্বল। দিনকয়েক আগেও কী অন্যায়, অনাচার ও দুরাচার হয়েছে, তা নিমিষে বিস্মৃত হওয়ার উদাহরণ ভূরিভূরি। মানুষের আবেগও ক্ষণস্থায়ী। ফলে ড. ইউনূস সরকার ফুরফুরে মেজাজে ধীরে-সুস্থে এগোবে-এমন সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এবারের পরিবর্তনটা এমন একটি শক্তির নেতৃত্বে এসেছে, যারা রাজনীতির মারপ্যাঁচ, প্রশাসনিক জটিলতা বা রাষ্ট্রযন্ত্রের সীমাবদ্ধতা-এসব বিবেচনায় কমই নেবে। তারা চাইবে বৈষম্যহীন সমাজের যে স্বপ্ন নিয়ে সহপাঠীরা অকাতরে জীবন দিয়েছেন, তা দ্রুত দৃশ্যমান হোক।
ড. ইউনূস সরকারের স্মরণ রাখা দরকার, আমলাতন্ত্র তথা সিভিল প্রশাসন খুব জটিল জায়গা এবং মন্ত্রণালয়ের মূল কাজগুলো করেন আমলারা। তারা যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের সঠিকভাবে গাইড না করেন বা সহযোগিতা না দেন, তাহলে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টির শঙ্কা থাকবে। পতিত সরকারের দোসররা কিন্তু ভোল পালটে, রূপ বদলে টিকে থাকার চেষ্টা করবে। বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে অতিবিপ্লবী সাজারও ভণিতা করবে। আবার সুযোগ বুঝে পতিতদের হয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড করবে। এসব বিষয়ে সতর্কতা ও চোখ-কান খোলা রাখা জরুরি।
বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিত্ব প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস পোড় খাওয়া সফল মানুষ। তিনি একা সব সামলে উঠতে পারবেন-এমনটা আশা করলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেনও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। আশা করা যায়, তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজগুলো ভালোমতো সামাল দিতে পারবেন। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। তিনিও দক্ষ ও অভিজ্ঞ। উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কম। তিনি আইনাঙ্গনকে ঢেলে সাজাতে এরই মধ্যে বলিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জুডিশিয়াল ক্যুর অপচেষ্টা নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে তার ভূমিকাও প্রশংসনীয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এরই মধ্যে অতিকথনের কারণে বিতর্কে জড়িয়েছেন। আবার দুঃখপ্রকাশও করেছেন। তার ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে।
আদিলুর রহমান খানকে দেওয়া হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প মন্ত্রণালয়। সৎ ও সাহসী মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব আদিলুর রহমান খানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। ফরিদা আখতারও কর্মজীবনে অত্যন্তু সফল ও দক্ষ হিসাবে সুপরিচিত। তাকেও আরও কার্যকর ভূমিকায় রাখা যেতে পারে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি হিসাবে যে দুজন উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন, তারা তারুণ্যের শক্তির সঙ্গে দ্রুত প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারী করতে সচেষ্টা হবেন আশা করি।
সর্বোপরি মনে রাখা দরকার, ড. ইউনূস কিংবা তার পরিষদের সদস্যরা মানুষ। ভিন্নগ্রহে জন্মাননি। তাদের কাছে সুপারম্যানের মতো কাল্পনিক অতিমানবীয় ক্ষমতা প্রত্যাশা করলে তা হবে ভুল। সময় দিতে হবে। তাদের সদিচ্ছাকে সম্মান করে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়ে যেতে হবে। তবেই স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
এম আবদুল্লাহ : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাবেক সভাপতি, বিএফইউজে
