দেড় শতকের ঐতিহ্য কালিয়াকৈরের ‘ধনীর চিড়া’
Advertisement
মো. মিলন হোসেন
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অদ্ভুত সমন্বয়ে সৃষ্টি আমাদের বাংলাদেশ। গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য।
বাংলার এমনই এক ঐতিহ্যবাহী খাবারের নাম ‘ধনীর চিড়া’। যে চিড়ার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সুদূর ইংল্যান্ডসহ সারা বিশ্বে। যার স্বাদ আর গন্ধে জয় করেছিল ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়ার মন।
গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত ‘বারবাড়ীয়া’ গ্রামের শ্রী দুর্লভ সরকারের সহধর্মিণী শ্রীমতী ধনী রানি সরকার এ চিড়ার আবিষ্কারক। পরে তার নামানুসারেই বাংলার সেই বিখ্যাত চিড়ার নাম হয় ‘ধনীর চিড়া’। স্থানীয় বাসিন্দা যতীন্দ্র সরকার জানান, ১৮৫০ সালের দিকে এক অভাবগ্রস্ত হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ধনী রানি সরকার।
বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় ধনী রানি সরকারের স্বামী দুর্লভ সরকার মারা যান। রেখে যান দুটি সন্তান। এ অবস্থায় চরম হতাশায় পড়েন ধনী রানি। উপায়ান্তর না দেখে তিনি সাহায্যের জন্য চলে গিয়েছিলেন বলিয়াদী জমিদার বাড়িতে। তখন জমিদার সাহেব সাহায্য স্বরূপ কিছু ধান দিয়েছিলেন তাকে। তিনি চিন্তা করলেন, ধান থেকে ভাত রান্না করে খেলে কিছুদিনের মধ্যে তা শেষ হয়ে যাবে। তাই দীর্ঘদিন খাওয়ার আশায় ঢেঁকিতে চিড়া কুটেন ধনী রানি। ঢেঁকিতে চিড়া কুটে রীতিমতো বিস্মিত হন ধনী রানি-এই ধানে এত সুস্বাদু চিড়া হয়! সব ধানের চিড়া না কুটে কিছু ধান বীজ হিসাবে বপন করেন এবং প্রতিবেশীদেরও কিছু ধানের বীজ দেন। এভাবেই পুরো এলাকায় বিস্তার লাভ করে এ ধানের জাত।
কথিত আছে, ১৮৮৬ সালের দিকে রানি ভিক্টোরিয়ার জন্মদিনে তৎকালীন ঢাকার গভর্নর উপঢৌকন হিসাবে কয়েক মন ধনীর চিড়া পাঠান। সেই জšে§াৎসবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় অতিথিরা এ চিড়ার গুণগত মান ও স্বাদের প্রশংসা করেন। পরে রানি ভিক্টোরিয়া চিড়া প্রস্তুতকারীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ধনী রানি ভয়ে যাননি। কেননা, ঢাকার মসলিন কাপড় যখন বিখ্যাত হয়েছিল, তখন ইংরেজরা কারিগরদের আঙুল কেটে দিয়েছিল, যাতে তারা আর মসলিন না বানাতে পারে। দ্বিতীয়বার রানি ভিক্টোরিয়া আবার আমন্ত্রণ জানালে ধনী রানি শর্ত দিয়ে বলেন, ‘যদি তাকে বিনা পয়সায় গয়াকাশি ও বৃন্দাবন যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়, তবে তিনি রানি ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে দেখা করবেন। তার প্রস্তাব গ্রহণ করেন রানি ভিক্টোরিয়া এবং ১৮৮৭ সালে ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসাবে ধনী রানি গয়াকাশি ও বৃন্দাবনসহ ভারত সফর করেন।
কালের প্রবাহে বাঙালির ১৫২ বছরের ঐতিহ্যে লালিত সুস্বাদু সেই ধনীর চিড়া আজ বিলুপ্তির পথে। কালিয়াকৈর হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার আজও নানা সমস্যার মাঝে ধনীর চিড়া তৈরি করছে। স্থানীয় ধনীর চিড়া উৎপাদনকারী ধীরেন্দ্র সরকার বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ধনী রানির বংশধরেরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য। ধানের দাম দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে; কিন্তু সেই তুলনায় চিড়ার দাম বাড়ছে না। চিড়ার চাহিদা থাকলেও অর্থের অভাবে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
এ অবস্থায় ঐহিত্যবাহী ধনীর চিড়ার উৎপাদন কিভাবে বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করছি।
শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
