কাশীধামে কেলেঙ্কারি
Advertisement
পবিত্র সরকার
প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাশীতে, মানে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে, একটা কিম্ভূত আর কদাকার কাণ্ড ঘটেছে, এতদিনে সবাই সে খবর পেয়ে গেছেন। আমরা ভেবেছিলাম ‘হিন্দু’ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু নামটা নির্দোষ ‘ভারতীয়’ অর্থে সেঁটে দিয়েছিলেন পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য, এখন মনে হচ্ছে তা নয়। একদল ছাত্র তাকে আধুনিক আর সাম্প্রতিক এবং সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক অর্থ দিতে চায়। যেন বলতে চায়, এ বিশ্ববিদ্যালয় হিন্দুদের জন্য, হিন্দুদের দ্বারা, হিন্দুদের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়, আর কোনো গোষ্ঠীর এখানে ঠাঁই নেই।
এখন বিশ্ববিদ্যালয় কথাটার মানে আমরা যতটা বুঝি, তাতে এ রকম হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু গায়ের জোর যখন তোমার মাথার উপরে লোহার বস্তার মতো চাপিয়ে দিতে চায়, তখন আর তুমি কী করবে। বিশ্ববিদ্যালয় হিন্দুর হয় না, মুসলমানের হয় না, খ্রিস্টানের হয় না, বাঙালির হয় না, পাকিস্তানির হয় না, মাড়োয়ারির হয় না। শুধু পুরুষ বা নারীর জন্য হয় না, যদিও নারীর অধিকারের বিবেচনায় আজকাল নারী বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত কথা ধার করে বলতে পারি, ‘যত্র বিশ্বং ভবতি একনীড়ং।’ কেন এক জায়গায় বাসা বাঁধে? না বিদ্যা শিক্ষার জন্য। যে জন্য হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, ‘বিদ্যার জন্য চীন দেশেও যেতে পার।’ বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য।
কাশীতে ফিরোজ খান নামে সংস্কৃতে ডক্টরেটধারী এক অধ্যাপকের কাছে ছাত্ররা সংস্কৃত পড়তে অস্বীকার করেছে, আপত্তি জানিয়ে মিছিল করেছে, শুনেছি কিছু অধ্যাপকও নাকি তাদের সঙ্গে আছেন। আমি ধন্যবাদ দেব সেই নির্বাচকদের যারা ফিরোজের যোগ্যতা দেখে তাকে প্রথম প্রার্থী হিসেবে গণ্য করেছেন, নিজেরা কোনো সংকীর্ণতার শিকার হননি। কিন্তু ছাত্ররা এটা কী করল? তারা কি এই হাস্যকর বার্তা দিতে চায় যে, এর পর কোনো মুসলমান সংস্কৃত পড়বে না, কোনো হিন্দু আরবি-ফারসি পড়বে না ইত্যাদি ইত্যাদি? তাহলে দেশ-বিদেশের জ্ঞানচর্চায় যে ভয়ংকর ধস তৈরি হবে, তা কি তারা বুঝতে পেরেছে? নাকি কাশী ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মহিমাপূর্ণ নির্বাচনকেন্দ্র বলে তারা এই উদ্ভট কাণ্ড বাধাতে উৎসাহিত হয়েছে?
হ্যাঁ, আমাদের মনে আছে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কথা, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতে এমএ পড়তে চেয়ে সুযোগ পাননি, কারণ সত্যব্রত সামশ্রমী বলে একজন অধ্যাপক মুসলমান ছাত্র সংস্কৃত পড়লে আত্মহত্যা করবেন বলে ভয় দেখিয়েছিলেন। উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সেই হুমকি উপেক্ষা করতে পারেননি, তাই তাকে নতুন তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি করে নিয়েছিলেন। ড. শহীদুল্লাহ আজও সেই বিভাগের অহংকার হয়ে আছেন।
কিন্তু তার বেলায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের The Bengalee কাগজ তো লিখেছিল, পণ্ডিতদের ধিক্কার জানিয়ে, The pundits should be thrown into the Ganges. মনে পড়ছে অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্যের কথা। তাকে ওই সংস্কৃত বিভাগের পণ্ডিতেরা ঘরে ঢুকে বেঞ্চে বসে ক্লাস করতে দেয়নি। তার অপরাধ ছিল- তিনি একে নারী, তার ওপর খ্রিস্টান। ড. শহীদুল্লাহ আর সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতো ক’জন ছাত্রছাত্রী কলকাতার সংস্কৃত বিভাগ উৎপাদন করেছে সেটা একটা কোটি টাকার প্রশ্ন।
মনে আছে, এই লেখক যখন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, তখন সেখানে একটি মুসলমান মেয়ে সংস্কৃতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিল। তার শিক্ষকরা, সবাই অতিশয় ব্রাহ্মণ, তাকে নিয়ে আমার ঘরে এসেছিলেন। তাদের গর্বে আমিও গর্বিত হয়েছিলাম। আমার সময়ে একটি মুসলমান ছেলে বাংলায়ও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিল, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছে। এমনই তো হওয়ার কথা।
জানি ঢাকা বা আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতের বিভাগ আছে, সেখানে যারা সংস্কৃত পড়ান এবং পড়ে তারা অধিকাংশ মুসলমান। তাই তো হওয়ার কথা। বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন কলেজে মুসলমান অধ্যাপক সংস্কৃত পড়ান, বেদান্ত পড়ান, তা নিয়ে তো কোনো শোরগোল নেই! হঠাৎ কাশীধামে এ কেলেঙ্কারি ঘটল কেন?
মনে পড়ল, এই কাশীরই উপাচার্য ডা. হরি গৌতম ইউজিসির অধ্যক্ষ হয়েই ২০০১ নাগাদ পৌরোহিত্য বিষয়ে কোর্স খোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন পশ্চিমবাংলার উচ্চশিক্ষা সংসদের কর্তা হিসেবে আমি তাকে লিখি, ‘আমাকে বলুন যে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স যখন, তাতে মেয়েরা, মুসলমান, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ সবাই পড়ার সুযোগ পাবে এবং ডিগ্রি পেলে তার পৌরোহিত্যের জীবিকা গ্রহণ করতে পারবে। অর্থাৎ তারা হিন্দু মন্দিরে পুজো করার, হিন্দু বিবাহ দেওয়ার, হিন্দু শ্রাদ্ধ করার অধিকার পাবে।’ তিনি আর এ বিষয়ে অগ্রসর হননি।
সংস্কৃত পৃথিবীর নানা দেশে পড়ানো হয়- জার্মানিতে, আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, চীনে, জাপানে, অস্ট্রেলিয়ায়, রুশ দেশে এবং অন্যত্র। সেখানে সংস্কৃত পড়ান খ্রিস্টান আর বৌদ্ধ অধ্যাপকরা, অধিকাংশত। এরপর কি কাশীর ওই বীরপুঙ্গবেরা এই ফতোয়াও জারি করবে যে, না, শুধু হিন্দুরাই সংস্কৃত পড়াবে, আর কেউ নয়! আমি সেটাও দেখার জন্য অপেক্ষা করে আছি, দেখি তাদের জারিজুরির দৌড় কতটা। আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি যে, এখনও পর্যন্ত ভারতের শিক্ষামন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এ ঘটনা নিয়ে কোনো নিন্দাবাদ উচ্চারিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী না হয় বিদেশ ভ্রমণে শ্বাস ফেলার অবকাশ পান না, কাজেই এসব তুচ্ছ ছেলেমানুষি বিষয়ে তার নজর দেয়ার কথা নয়, কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী? জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন কি তারও অবসর কেড়ে নিচ্ছে?
কাশী শহরটার কিন্তু একটা মিশ্র চরিত্র আছে। হ্যাঁ, এটা হিন্দুদের একটা বড় তীর্থস্থান, লোকের বিশ্বাসে আদি নগরী, খ্রিস্টানদের যেমন রোম। কিন্তু এখানে মুসলমান নাগরিকও প্রচুর। বাঙালি হিন্দুদের বিয়েতে অবশ্য ব্যবহার্য বেনারসি শাড়ি তৈরি করেন কাশীর মুসলমান ‘জোলা’রা। ভাবুন তো, তারা বেনারসি না বানালে আমাদের মেয়েদের বিয়ে হতো কেমন করে? এক সময় বিশ্বাস ছিল (হয়তো এখনও আছে, কারণ কুসংস্কার সহজে মরে না) কাশীতে মরলে শিবত্ব পাওয়া যায়।
এজন্য শিবনাথ শাস্ত্রী ব্রাহ্ম হয়ে যাওয়ায় তার বাবা প্রিয়নাথ যখন রাগ করে কাশী চলে যান, তখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, কাশীতে গিয়ে তিনি গাঁজা খাওয়া ধরেছেন কিনা। প্রিয়নাথ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বিদ্যাসাগর এ কথা বলছেন কেন? বিদ্যাসাগর উত্তর দিলেন, না, কাশীতে মরলে হয় শিব হবে, না হয় তার চ্যালা হবে। তা শিবঠাকুরও গাঁজা খান, আর তার চ্যালারাও খায়। কাজেই প্রিয়নাথকেও তো গাঁজা ধরতে হবে, নইলে স্বর্গে পাত্তা পাবেন কী করে?
আমি জানি, কাশীর ওই ঘটনা একদল গাঁজাখোরের কাজ, এ বললে, তাকে ক্ষমার চোখেই দেখা হয়। আসলে এ অত্যন্ত অন্ধ, নির্বোধ, ভয়ংকর এক প্রবণতা, যার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবী এবং সাধারণ মানুষের তীব্র ধিক্কার উচ্চারিত হওয়া উচিত। আশ্চর্য কথা এই যে, রাষ্ট্রের কোনো উচ্চবাচ্য এখনও শোনা যাচ্ছে না। কান পেতে আছি।
পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা
