সাক্ষাৎকার
উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী
Advertisement
আসিফ রশীদ
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন। দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ব্যাংক খাত, মূল্যস্ফীতিসহ সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে সম্প্রতি তিনি যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -আসিফ রশীদ
যুগান্তর : দেশে অনেকদিন ধরেই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কম। বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ব্যাংক খাত কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ দরকার। সেই বিনিয়োগ হতে হবে প্রাইভেট সেক্টরে এবং উৎপাদনশীল খাতে। টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে জিডিপির অন্তত ৪০ শতাংশ বিনিয়োগ হওয়া প্রয়োজন বলে অনেকেই মনে করেন। এর মধ্যে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ হওয়া দরকার জিডিপির ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ। উল্লেখ্য, সরকারি খাতে যে বিনিয়োগ, তা প্রধানত অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য করা হয়। ব্যক্তি খাতে সাধারণত উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়। ব্যক্তি খাতে কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিনিয়োগ না হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। তাই আমাদের যে কোনো মূল্যে হোক, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। কিন্তু ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন একটা অবদান রাখতে পারছে না। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের উন্নয়নের চেষ্টা করেছে। বর্তমান সরকারও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ খাতের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্যার গভীরতা এত বেশি যে, রাতারাতি তা সমাধান করা সম্ভব হবে না। উন্নত দেশে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জন্য সাধারণত পুঁজিবাজারের ওপর নির্ভর করেন। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো ততটা বিকশিত হয়নি। পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তাই উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জন্য ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু ব্যাংক খাত উদ্যোক্তাদের সেভাবে সাপোর্ট দিতে পারছে না। এজন্য ব্যাংক খাতে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার করতে হবে।
যুগান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের অন্তত ২২টি ব্যাংক বিপুল পরিমাণ লোকসান দিয়েছে। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় যেসব ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেসব ব্যাংক অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যেসব ব্যাংক ভালোভাবে চলছে না, সেগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : একটি দেশে কতগুলো ব্যাংক থাকা প্রয়োজন, সে সম্পর্কে কোনো সংখ্যা নির্ধারিত নেই। প্রয়োজনের বিবেচনায় ব্যাংক গড়ে উঠতে পারে। তবে সবার আগে দেখতে হবে ব্যাংকগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হতে পারছে কিনা। তারা জনগণের চাহিদা মেটাতে পারছে কিনা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে উপযোগিতা বিবেচনা না করেই রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশকিছু ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, দেশে এ মুহূর্তে নতুন ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারপরও রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় স্থাপিত ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগই ভালোভাবে চলছে না। ব্যাংক খাতের স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক স্থাপন করা হলে তার ফল যে ভালো হয় না, আমরা ইতোমধ্যেই তার প্রমাণ পেয়েছি।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আমলে দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই লক্ষ্যে ইসলামি ধারার দুর্বল ৫টি ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংকে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সে প্রচেষ্টা বর্তমান সরকার আমলেও অব্যাহত রয়েছে। তবে ব্যাংক একীভূতকরণ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে একটি নির্দিষ্ট সময় দিয়ে তাদের পারফরম্যান্স ভালো করার জন্য বলা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে তারা যদি উদ্দীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তাহলে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলক সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা যেতে পারে। তা যদি সম্ভব না হয় অথবা ভালো ফল না দেয়, তাহলে ব্যাংকগুলোকে অবসায়ন করা যেতে পারে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ‘যোগ্যদের টিকে থাকা’র নীতি অনুসরণ করা হয়। সেক্ষেত্রে জনগণের অর্থ ব্যয় করে শ্বেতহস্তী পোষার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংক খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে এটাই কাক্সিক্ষত। কিন্তু ব্যাংকগুলো নিজেরাই যদি ভালোভাবে চলতে না পারে, তাহলে তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে কীভাবে? ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় আবেগপ্রবণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। যেসব ব্যাংক দুর্বল অবস্থায় আছে, তাদের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে একীভূতকরণ অথবা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো ব্যাংক একীভূত করা হলে টিকে থাকতে পারবে বলে যদি মনে হয়, তাহলে সেগুলোকে একীভূত করা যেতে পারে। কিন্তু যেসব ব্যাংক একীভূত করা হলেও ভালোভাবে টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই, সেগুলোকে অবসায়ন করাই যৌক্তিক হবে। দেশের প্রয়োজনে যতগুলো ব্যাংক থাকা দরকার, ততগুলো ব্যাংক থাকতে পারে। তাই ব্যাংকগুলো লাভজনকভাবে চলছে কিনা, তারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে কিনা, সেটাই মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।
যুগান্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা দেখা দিলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বেশির ভাগ দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে পারেনি। এর কারণ কী?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে যেসব সমস্যা অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে, তার মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অন্যতম। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেসময় বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এটি ছিল দেশটির ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক (ফেড) বারবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। এছাড়া আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও বারবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করতে থাকে। আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ। এটা বৃদ্ধি করতে করতে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য পলিসি রেট সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু তারপর আমাদের দেশের মূল্যস্ফীতির হার সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরোপ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সফল হয়নি। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার আগের মাসের তুলনায় কিছুটা বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আগের মাসে অর্থাৎ আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা বাড়তে পারে, এটা অনুমিতই ছিল। কারণ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তা ফলপ্রসূ হয়নি। এর অর্থ হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পাশাপাশি আরও কিছু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হচ্ছে পরিবহণ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খল অবস্থা। তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদক থেকে একটি পণ্য ভোক্তা পর্যায়ে আসার জন্য ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজিসহ নানারকম হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রবল উপস্থিতি রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে আসতে একটি পণ্যের মূল্য দ্বিগুণ/তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। যতদিন পর্যন্ত বাজারে বিদ্যমান মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা না যাবে, ততদিন উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে খুবই কঠিন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পলিসি রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তার উপযুক্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শ্রীলংকা। শ্রীলংকা সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতির হার সেপ্টেম্বর ২০২২-এ ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। সে অবস্থা থেকে বর্তমানে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশকে নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ বড়ই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। এতে বলা হয়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। গত চার বছরে মোট ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপরে আছে ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। তারা সামান্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা অন্য কোনো কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ ঘটলেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে।
যুগান্তর : সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে চায়। এ লক্ষ্য অর্জনে করণীয় কী?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : এজন্য কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। কোনো কোনো গবেষকের মতে, বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জন করতে হলে প্রতিবছর গড়ে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণ করা প্রয়োজন। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও ৮ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা লাইসেন্স পেতে গড়ে ৪৯ দিন সময় লাগে। চীন বা ভারতে একই ধরনের অনুমতি পেতে বাংলাদেশের তুলনায় অর্ধেক সময় লাগে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত না করতে পারলে বিনিয়োগের প্রত্যাশা কোনোভাবেই পূরণ হবে না।
যুগান্তর : সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের মূল কৌশলটি কেমন হওয়া উচিত?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : বর্তমান জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মূল কৌশল হওয়া উচিত-অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব না ফেলে মূল্যস্ফীতি কমানো। শুধু উচ্চ নীতি-সুদহারের মাধ্যমে চাহিদা সংকুচিত করাই এর লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। যেহেতু বর্তমান মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত চাপ, খাদ্য ও জ্বালানি খাতের আকস্মিক অভিঘাত, বিনিময় হারের প্রভাব, বাজারের অসম্পূর্ণতা এবং কাঠামোগত সরবরাহ সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল, তাই মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক করার পাশাপাশি রাজস্ব নীতিতে সংযম এবং সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সংক্ষেপে, সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, বিচক্ষণ রাজস্বনীতি, তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বিনিময় হার ব্যবস্থা, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ও পণ্যমূল্য শৃঙ্খল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারকরণ এবং অগ্রাধিকারমূলক কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন। এ সমন্বিত পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং দরিদ্র ও স্বল্প-আয়ের পরিবারের কল্যাণ অক্ষুণ্ন রেখে মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে হ্রাস করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : ধন্যবাদ।
(সহযোগিতায় : এমএ খালেক)
