মা দুর্গার আগমন
Advertisement
ড. অরূপরতন চৌধুরী
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুর্গাপূজা বাঙালির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস এবং ঢাকের বাদ্য সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে এক অনন্য আনন্দের আবহ সৃষ্টি করে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সামাজিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে পরাজিত করে শুভ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। তাই দুর্গাপূজা মূলত অশুভের ওপর শুভের, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের এবং অসত্যের ওপর সত্যের বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। এ পূজার মধ্য দিয়ে শক্তি, জ্ঞান, সমৃদ্ধি, সাহস ও মঙ্গল কামনা করা হয়।
বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস বহু পুরোনো। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিভিন্ন জমিদার ও অভিজাত পরিবারে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। পরবর্তীকালে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজার প্রসার ঘটে। এর ফলে দুর্গাপূজা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উৎসবের সীমা ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা পালন করেন।
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে দুলতে থাকা কাশফুল, ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ, প্রকৃতি যখন এমন অপরূপ সাজে সেজে ওঠে, তখনই বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে ঢাকের কাঠি। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ, মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলে ওঠে আলোর মালা। মা দুর্গার আগমনের সঙ্গে যেন প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে নতুন আনন্দের সঞ্চার হয়। দুর্গাপূজা তাই কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির চিরচেনা আবেগ, ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতির এক অপূর্ব প্রকাশ। দেবীর আগমন যেন অন্ধকারের মধ্যে আলোর বার্তা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় এবং মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার।
দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনোৎসব। এ উৎসব মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ বাড়িয়ে তোলে। ধর্মবর্ণনির্বিশেষে মানুষ একে অপরের আনন্দে অংশ নেয়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে এ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সম্প্রীতির চর্চা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
দুর্গাপূজার কয়েকদিন বাঙালির জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মহালয়ার মাধ্যমে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমীর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়। অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপূজা, নবমীর পূজা এবং দশমীর বিসর্জন দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের আনন্দের পাশাপাশি এক ধরনের আবেগও সৃষ্টি হয়। দেবীকে বিদায় জানিয়ে মানুষ আবার তার আগমনের অপেক্ষা করে।
দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ। শিল্পীরা মাটি, খড় ও বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রতিমা নির্মাণ করেন। মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, চিত্রকলা, আলোকসজ্জা ও লোকশিল্পের নানা উপাদান ব্যবহৃত হয়। অনেক পূজামণ্ডপ স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য বা সমকালীন বিভিন্ন বিষয়কে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরে। ফলে দুর্গাপূজা একদিকে ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে শিল্প ও সৃজনশীলতারও এক বড় ক্ষেত্র।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে সামাজিক মিলনও বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করা, নতুন পোশাক পরা, মণ্ডপে ঘুরতে যাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করা, সবকিছু মিলিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও অনেক সময় পরস্পরের উৎসবে অংশ নেন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে এ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কুমারী পূজা : দুর্গাপূজার একটি বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ আচার হলো কুমারী পূজা। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে, কুমারী কন্যার মধ্যে দেবী দুর্গার মাতৃশক্তি ও পবিত্রতার প্রতীকী প্রকাশ দেখা হয়। সাধারণত অল্পবয়সি একটি কন্যাশিশুকে স্নান করিয়ে, নতুন পোশাক ও অলংকারে সাজিয়ে দেবীরূপে সম্মান ও পূজা করা হয়। তাকে ফুল, চন্দন, নৈবেদ্য ও প্রণাম নিবেদন করা হয় এবং আশীর্বাদ কামনা করা হয়।
কুমারী পূজার মূল তাৎপর্য হলো-নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও মাতৃশক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। একটি শিশুকন্যার মধ্যে দেবীত্বের প্রতীক কল্পনা করার মাধ্যমে সমাজে নারীর সম্মান, পবিত্রতা ও শক্তির প্রতি শ্রদ্ধার বার্তা তুলে ধরা হয়। দুর্গাপূজার বৃহত্তর চেতনার সঙ্গে এ আচার তাই গভীরভাবে যুক্ত।
এ পূজায় একটি ছোট মেয়েকে দেবী দুর্গার প্রতীক হিসাবে পূজা করা হয়। তাকে নতুন পোশাক ও ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়। এরপর তাকে দেবীর আসনে বসিয়ে ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করা হয় এবং আশীর্বাদ নেওয়া হয়। কুমারী পূজার মাধ্যমে নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, নারী সমাজের শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক। তাই কুমারী পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি নারীকে সম্মান করারও একটি সুন্দর আয়োজন।
দুর্গাপূজার সঙ্গে বাঙালির সাহিত্য ও সংগীতেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আগমনি গান, বিজয়ার গান, কবিতা, নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দুর্গোৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে। পূজাকে কেন্দ্র করে বহু শিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়। ফলে এ উৎসবের ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।
দুর্গাপূজার আনন্দ কয়েকটি দিনের হলেও এর আবেদন মানুষের মনে থেকে যায় অনেকদিন। বিজয়ার বিষণ্ন বিদায়ের মুহূর্তে যখন প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়, তখন সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘আবার এসো মা।’ এ বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের প্রত্যাশা। দুর্গাপূজা আমাদের শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, অশুভকে পরাজিত করতে এবং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও ভালোবাসাকে জীবনের পথনির্দেশক করতে। তাই বাঙালির দুর্গাপূজা শুধু পূজা নয়, এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব; যেখানে ধর্মের পাশাপাশি মিশে আছে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সৌন্দর্য ও মানবতার চিরন্তন আহ্বান। দেবীর আগমন হোক আমাদের জীবনে শুভবোধের জাগরণ, আর তার বিদায় রেখে যাক নতুন দিনের আশার আলো।
মা দুর্গার আগমন যেন আমাদের মনে এ বার্তাই জাগিয়ে তোলে, অশুভ ও বিভেদকে দূরে সরিয়ে মানবিকতা, সহনশীলতা ও ঐক্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে হবে। তাই দুর্গাপূজার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা উৎসবের আনন্দে নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের বন্ধনে। বিজয়ার বিদায় বেলায় তাই আমাদের প্রত্যাশা হোক ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিকতার বন্ধন হোক সবার। এ সম্প্রীতি ও সৌহার্দই বাঙালির দুর্গাপূজাকে করে তুলুক আরও সুন্দর, অর্থবহ ও চিরন্তন।
তবে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে আমাদের দায়িত্বও মনে রাখতে হবে। পূজামণ্ডপ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানজট কমাতে সহযোগিতা করা এবং প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। উৎসব যেন সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় হয়-এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিকিৎসক
