Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

Advertisement

Icon

ড. সনজিত পাল

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

প্রতিবছরের মতো এবারও প্রকৃতিতে শরৎ ঋতুর নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলা যেন দেবী দুর্গার আগমন বার্তা বলে দিচ্ছে। শিউলি আর কাশফুলের সমারোহে ধরায় অসুর শক্তির বিপরীতে সুর শক্তির জাগরণ ধ্বনি চতুর্দিকে বারবার ধ্বনিত হচ্ছে। ভক্তরা নীল পদ্ম আর বেলপাতায় অঞ্জলি দেওয়ার অভিপ্রায়ে উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছে। পিতৃপক্ষের অবসানে শুরু হয় দেবীপক্ষ। শুরু হয় শারদীয় উৎসব দুর্গাপূজা। পবিত্র চণ্ডীর মন্ত্রোচ্চারণে ঢাকের বাদ্য আর শঙ্খের ধ্বনিতে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই দশভুজার আরাধনায় যুক্ত হয়। এ মাহেন্দ্রক্ষণে দেশবাসীকে জানাই শারদ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। শুভ শারদীয়।

দুর্গাপূজা করা হয় দুর্গতি নাশ করার জন্য। দুর্গতি দুঃখময় গতি। প্রাণ অবলম্বন করে সাধনা না করলেই দুঃখ। প্রাণভিত্তিক যোগক্রিয়া মহাসুখময় গতি দান করে। তাই প্রত্যেক প্রতিমা পূজার প্রথমেই করতে হয় প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা। প্রাণ প্রতিষ্ঠা না করে পূজা হয় না। পূজারী অর্থাৎ সাধক পঞ্চভূতময় দেহকে করেন পরিশুদ্ধ। আসনশুদ্ধি, ভূতশুদ্ধি, অঙ্গন্যাস, করাঙ্গন্যাস, প্রাণায়াম, পুষ্পশুদ্ধি, জলশুদ্ধি ইত্যাদি পূজায় বসেই প্রথমে করতে হয়। তারপর দেবীর ধ্যান করে করে ‘নিজেই দেব’ (দেবীং সোহমিতিবিচিন্ত্য) এ কথা চিন্তা করে নিজের মস্তকে পুষ্প দিয়ে (স্বশিরসি পুষ্পং দত্তা) দেবীকে মানসোপচারে পূজা করতে হয়। বাহ্যষোড়শ উপচারে পূজা হয় পরে। আগে অন্তরে অন্তরে পূজার বিধান আছে। পূজা হয় তারপর ঘটে। ঘট স্থাপন করতে হয়। এ ঘট দেহের প্রতীক। দেহই ঘট। ‘দেহ মধ্যে প্রাণযজ্ঞ কররে যাজন।’ সদ্গুরুর উপদেশ লাভ করে সাধনায় এ প্রাণযজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে হয়। তবেই হয় সত্যিকারের পূজা। এভাবে ব্রহ্মোপলব্ধি লাভ করার অনুপ্রেরণায় উদ্বোধিত হওয়ার জন্য পূজা অনুষ্ঠান।

মহালয়া থেকে দেবী পক্ষ শুরু। মহতের আলয়-মহালয়। অমাবস্যা তিথিতে মহালয় অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি অমাবস্যা শাস্ত্রে প্রসিদ্ধ। প্রথমটি আলোক অমাবস্যা, দ্বিতীয়টি মহালয়া অমাবস্যা এবং তৃতীয়টি দীপান্বিতা অমাবস্যা। প্রতিটির নিগূঢ় তত্ত্ব আছে। মহালয়া মানে মহাকূটস্থ দর্শন ক্ষেত্র। মহালয়ার মহাকূটস্থ দর্শন করে সাধক প্রথমা থেকে পঞ্চমী পর্যন্ত তিথিতে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম-এ পঞ্চভূতকে শোধন করেন ক্রমান্বয়ে। ষষ্ঠী তিথিতে তখন তার হয় আত্মবোধন। দেবীর বোধন পূজা সাধকের আত্মবোধনের রূপক। বোধন অনুষ্ঠানে হয় নব পত্রিকা সংস্থাপন। নব পত্রিকা হচ্ছে-‘রম্ভা কচ্চী হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ। /অশোক মানকশ্চৈব ধান্যঞ্চ নব পত্রিকা॥’ উদ্ভিদ জগতের প্রতিনিধি স্থানীয় নয়টি উদ্ভিজ্জে দেবীর অনুভূতি লাভ করা হচ্ছে। এ নয়টি উদ্ভিজ্জকে অপরাজিতা লতা দিয়ে বাঁধতে হয়। এ সবকিছুকে প্রাণ সম্পর্কে আবদ্ধ করলে মানুষ জয়ী হতে পারে। ‘সর্বভূতে প্রাণের স্থিতি ভাবের রীতি চমৎকার’। দেবীর বোধন করি। আসলে কিন্তু করা হয় সাধকের আত্মবোধন আত্মজাগরণ।

মন ষষ্ঠ অবস্থা। মনের বোধন হয় ষষ্ঠী তিথিতে। সপ্তমীতে বুদ্ধি জয়। অষ্টমীতে অহংকার জয়। অষ্টম অবস্থার পরে আরও উত্তরণ। এ উত্তরণ উদ্দেশ্য করেই অষ্টমী নবমী তিথির সন্ধিলগ্নে সন্ধিপূজা করা হয়। সন্ধিতে ৬৪ যোগিনী পূজা ও ভূত পূজা ইত্যাদি করতে হয়। ‘ভূত শুদ্ধি করতে না পারলে হয় না পূজার অধিকার।’ নবমীতে নবম অবস্থা-অহংবোধ বিনাশের পরবর্তী স্তর। তাই নবমী পূজা খুব সংক্ষিপ্ত। দশমীতে দশম অবস্থায় পূর্ণ বিজয়। সেই অবস্থা সম্পর্কে খুব সহজে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। যোগসংগীতে আছে-‘তিনদিন পরে ত্রিগুণের পরে স্রোতের জলেতে ডুবিল প্রতিমা/দশমীর দশা এ যে বিষম দশা কী বলে বোঝাবো বুঝিতে পারি না।’ আসলে বিজয়াতে জয় সব বাসনা। তখন দেবী শক্তির নিরঞ্জন। নিরঞ্জন শিবের সঙ্গে মিলে গিয়ে তিনি নিরঞ্জন হয়ে যান। বাহ্যত প্রতিমার বিসর্জন হয় জলে। আসলে ঈড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না ধারার অতীত হয়ে সাধক ক্রিয়াহীন শবাকার শিবে লয় প্রাপ্ত হন। বিসর্জন অনুষ্ঠানে তারই প্রকাশ। তিনি বিন্দুবাসিনী। বিন্দু থেকে জগতের সৃষ্টি, আবার লয়প্রাপ্ত হয় বিন্দুতে। তাই দশমীতে করি বিন্দুবাসিনী পূজা। এই দশমী বিজয়া দশমী। অসুর শক্তির বিরুদ্ধে সুরশক্তি অর্থাৎ সাধন শক্তির বিজয়ের উৎসব। একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী ও চর্তুদশী অবস্থা শুধু সাধনগম্য, অনির্বচনীয়। পঞ্চদশীতে পূর্ণিমা-মহাজ্যোতির উদ্ভাস। এ পূর্ণিমা লক্ষ্মী পূর্ণিমা। সাধক তখন সর্বঐশ্বর্য লাভ করে সিদ্ধ অবস্থা পেয়েছেন। এ পূর্ণিমাকে বলা হয় কোজাগরী পূর্ণিমা। কঃ জাগর? কে জাগ্রত? প্রাণই জাগ্রত দেহ মধ্যে। এ প্রাণের উপলব্ধি সাধকের তখন পূর্ণভাবে ঘটে। প্রাণন ক্রিয়ার তথা আত্মক্রিয়ার তথা যোগক্রিয়ার একটি পূর্ণ অধ্যায় মহালয়া থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত প্রকাশিত।

কালরাত্রি, মহারাত্রি, মোহরাত্রির অপনোদনকর্ত্রী মহাশক্তি দুর্গার প্রতিমার সম্মুখে দাঁড়ালে আমাদের মন মহারণরঙ্গরসে প্রবলভাবে জাগ্রত হয়, ভীষণভাবে আলোড়িত হয়, আবার মহা বিস্ময়ে প্রশান্ত হয়। মহারণরঙ্গিনী মাতৃমূর্তি-দশপ্রহরণ ধারিণী দশভুজা দুর্গা-পদতলে মহিষাসুর বিপর্যস্ত, পদদলিত, শরাহত-শিরোদেশে দেবাদিদেব মহাদেব স্থির প্রশাস্ত। যেন মনে হয়, সংগ্রামে অসুর শক্তিকে পদদলিত পরাজিত করতে পারলেই শিবকে অর্থাৎ কল্যাণকে লাভ করা যায়-মস্তকোপরি স্থাপন করা যায়। মানবজীবনের লক্ষ্যও তাই। জীবনে অশুভকে পরাজিত করতে পারলেই শুভকে লাভ করা যায়। অশুভ বা অসুর চায় সমগ্রচিত্তকে অধিকার করে রাখতে-যেমন করে মহিষাসুর শুম্ভাসুর ইত্যাদি অসুরশক্তি দেবতাদের স্বর্গ রাজ্যচ্যুত করে স্বর্গ ভোগ করেছিল। দেবতাদের পুনরায় স্বর্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মহাশক্তি চণ্ডীর আবির্ভাব ঘটেছিল। মানুষের মধ্যেও সুর ও অসুর শক্তির দ্বন্দ্ব প্রতিনিয়ত চলছে। সুরশক্তির জয়ের এবং অসুরশক্তির পরাজয়ের জন্য মহাশক্তির উদ্বোধন মানুষের মধ্যে প্রয়োজন। যদিও দেবী নিত্যজাগ্রতা। মানুষের সাধ্য কী তার বোধন করার। তবুও সাধককে নিজের মধ্যে দেবীশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হয়-বোধন করতে হয়। আসলে সাধক আপন চিত্তের বোধনই করেন মহাশক্তিকে লাভ করার জন্য, সুর শক্তিকে শিরোদেশে স্থাপন করার জন্য।

মহাশক্তি দুর্গার পূজা করে আমরা আত্মবলে বলীয়ান হবো, হবো মহাশক্তির অধিকারী, হবো মহাসত্যের অধিকারী। সনাতন ধর্মের সব পূজাকর্মে ও দেবদেবীর প্রতিমা রূপায়ণে আত্মোপলব্ধি তথা ব্রাহ্মোপলব্ধির ইঙ্গিত করা হয়েছে। দুর্গাপূজায়ও সেই সাধন শক্তি অর্জনের নির্দেশ। এখানেই দুর্গাপূজার তাত্ত্বিক রহস্য। দুর্গাপূজা ও দুর্গাকাঠামো সাধনতাত্ত্বিক রহস্যে ভরা। এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে প্রতিজন সাধক নিজের আত্মশক্তি জাগানোর মধ্য দিয়ে মাতৃ আরাধনা সম্পন্ন করবেন-এ আশা করি। শুভ হোক এবারের মাতৃশক্তির আরাধনা। শুভ হোক দশভুজার জাগরণ।

ড. সনজিত পাল : সিনিয়র শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

মা দুর্গার আগমন

মা দুর্গার আগমন

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম