মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ
Advertisement
বিভাস গুহ
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে এ উৎসবকে শারদীয় দুর্গোৎসব বলে। আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের মহালয়ায় এসে পিতৃপক্ষের শেষ হয় এবং সূচনা হয় মাতৃপক্ষ বা দেবীপক্ষের। আশ্বিনের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে বিল্ব বৃক্ষতলে দেবী দুর্গার বোধনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মা দুর্গার আরাধনা। মহাসপ্তমী তিথিতে নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে লাল পাড়ে সাদা শাড়ি পরিয়ে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করার পরে সপ্তমীবিহিত পূজা শুরু হয়। নবপত্রিকা হলো নয়টি উদ্ভিদ, যা দেবী দুর্গার প্রতীকী রূপ : কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান। এ নয়টি উদ্ভিদকে অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা স্থাপন করা হয়। নবপত্রিকা পূজার মাধ্যমে বৃক্ষকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। বৃক্ষকে পূজা করার মাধ্যমে বৃক্ষ সংরক্ষণের তাত্ত্বিক দিকটি ফুটে ওঠে। বৃক্ষ আমাদের জীবনের জন্য অত্যন্ত উপকারী। বৃক্ষ আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপাদান অক্সিজেন দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। কাঠ, ফুল, ফলে পরিবেশকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রাখে। পৃথিবীকে সবুজের সমারোহে ভরিয়ে তুলতে বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করার নয়। এ পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বৃক্ষরোপণ এবং বৃক্ষ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক দুর্গাপূজায় ফুটে ওঠে। বৃক্ষের সংরক্ষণের জন্য দুর্গাপূজা আমাদের শিক্ষা দিয়ে থাকে। অষ্টমী তিথিতে কুমারী পূজা করার মাধ্যমে কুমারী নারীর মধ্যে ভগবতী রূপের পূজা করা হয়। সব নারীই ভগবতীর একেকটি রূপ। বিশুদ্ধ পবিত্র হৃদয়ে ভগবতীর প্রকাশ সবচেয়ে বেশি। তাই কুমারী নারীকে ভগবতী জ্ঞানে পূজা করা হয়। সব নারীর মধ্যে অপরিমেয় শক্তি নিহিত আছে। কুমারী মেয়ের মধ্যে সাত্ত্বিক পবিত্র একটি রূপ রয়েছে। সে রূপটিকে পূজা করার মাধ্যমে নারীদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর ভাবটি পরিলক্ষিত হয়।
অষ্টমী তিথির শেষের ২৪ মিনিট আগে এবং নবমী তিথির শুরুর ২৪ মিনিট পরে মোট ৪৮ মিনিট ধরে করতে হয় সন্ধিপূজা। প্রচলিত আছে, এ সময়ের মধ্যে ভগবান রামচন্দ্র ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে মা দুর্গার পূজা করেছিলেন এবং মা দুর্গা সন্তুষ্ট হয়ে এ সন্ধিক্ষণেই রাবণ বধের জন্য বর দান করেছিলেন। ভগবান রামচন্দ্র রাবণকে বধ করেছিলেন। নবমী পূজা শেষে দশমীতে অঞ্জলি প্রদান করে মহামায়ার মৃন্ময়ী অবয়বটাকে নদী, সাগর বা পুকুরের জলে নিরঞ্জনের মাধ্যমে মাকে বিদায় দেওয়া হয়। দুর্গাপূজা করা হয় দুর্গতি নাশ করার জন্য। জগতের সব মানুষের দুর্গতি নাশ করে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা পূর্ণ করুক সবার মনোবাসনা। শুভ চেতনার আলো প্রজ্বলিত হয়ে অজ্ঞানের আঁধার থেকে মুক্ত হোক ধরণি। অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনার মঙ্গলকামী ধ্বজা উড্ডীন হোক আকাশে।
সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়নি নমোহস্তুতে।
অশুভ এবং অসুর শক্তি বিনাশ করে শুভ এবং সুর শক্তি প্রতিষ্ঠা করাই দুর্গাপূজার মূল উদ্দেশ্য। মা দুর্গার পায়ের তলায় মহিষাসুরকে দেখা যায়। মহিষাসুরকে বিনাশ করতে পারলে জয়ের মুকুট শিরে ধারণ করা যায়। অর্থাৎ মঙ্গলময় শিব শিরে শোভা পায়। দুর্গাপূজার কাঠামোতেও আমরা দেখি মহিষাসুর পায়ের তলায় আর মঙ্গলময় শিব মাথার উপরে। ভক্তের অপরিমেয় ভক্তি অর্ঘ্যে এবং শ্রদ্ধায় মায়ের মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ ঘটে। প্রতি ঘরে ঘরে মা রয়েছে, আমরা প্রতিটি সন্তান যেন ঘরের মাকে মন্দিরের দেবতার মতো করে ভক্তি এবং শ্রদ্ধাভরে পূজা করি, তবেই পূজা হবে সার্থক।
বিভাস গুহ : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
