Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

ন্যায়বিচার ও ন্যায়ধর্ম

Advertisement

Icon

বিমল সরকার

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ন্যায়বিচার ও ন্যায়ধর্ম

ন্যায়বিচার। ছবি: যুগান্তর

Advertisement

আইনের চোখে সবাই সমান। যে যত উঁচুই হোন না কেন, আইন সবার ঊর্ধ্বে। একটি রাষ্ট্রে বিচারালয় হচ্ছে ব্যক্তি, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন যে কারও জন্যই শেষ ভরসাস্থল। গ্রিক দার্শনিক মহামতি অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘ন্যায়বিচারের মধ্যেই সমাজের সুস্থিতি নির্ভরশীল।’

ভাই ভাইকে ঠকাতে পারে। পিতা পুত্রকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করলেও খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। সমাজে আজকাল এমন সব ঘটনা ঘটেই চলেছে। স্বার্থের দুনিয়া বলে কথা। বাবা বা মায়ের বিরুদ্ধে সন্তান কিংবা সন্তানের বিরুদ্ধে বাবা বা মাকেও আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে দেখা যায়।

আইনের শাসনে পৃথিবীর সব দেশেই এমন বন্দোবস্ত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিচারালয় হচ্ছে সবার কাছেই অগাধ আস্থা আর বিশ্বাসের প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে আইনপ্রণেতারা যখন নিজেদের করা আইন নিজেরাই অবলীলায় ভেঙে চলেন, প্রয়োগকারীরা আইনকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদানে তৎপর হয়ে ওঠেন, তখন এসব ঘটনাকে নিছক দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু ভাবার অবকাশ থাকে না।

নেমে আসে চরম হতাশা। অতএব যে করেই হোক, আইন ও বিচারালয়কে সবসময় সবার উপরে যথোপযুক্ত মর্যাদায় রাখতেই হবে। এবং তা স্থান, কাল, পাত্র তথা নিজেদের স্বার্থেই।

এক সময় রাশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া প্রভৃতি দেশে প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার নামে এক ধরনের শাসন প্রচলিত ছিল। প্রুশিয়ায় ফ্রেডারিক নামে একজন সম্রাট শাসন করতেন। তিনি ‘মহান ফ্রেডারিক’ (ফ্রেডারিক দ্য গ্রেট) নামে সমধিক পরিচিতি ও প্রসিদ্ধি অর্জন করেন।

পটসডাম নগরে তার রাজপ্রাসাদের কাছে একজন কৃষকের শস্য চূর্ণ করার একটি জাঁতাকলগৃহ ছিল। কলটি থাকায় একদিকে রাজপ্রাসাদের শোভা নষ্ট হয়, অন্যদিকে রাজা এর পাশে একটি নতুন বাগান তৈরি করতে মনস্থ করেন। এ অবস্থায় প্রাসাদ ও বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে কলগৃহটি সেখান থেকে সরানোর প্রয়োজন দেখা দেয়।

সম্রাট ফ্রেডারিক কলের মালিককে বলে পাঠালেন, ‘আমি তোমার কলটি ক্রয় করতে ইচ্ছা করি; তুমি কত টাকায় এটা বিক্রি করতে পার?’ কলটি ছিল সে ব্যক্তির অত্যন্ত প্রিয় ও ভালো একটি অবলম্বন।

তাছাড়া এর সঙ্গে লোকটির নিজের ও সন্তানদের নানা স্মৃতি জড়িত। তিনি এটা কোনোক্রমেই বিক্রি করতে সম্মত হলেন না এবং তার মনোভাব সরাসরি রাজাকে জানিয়ে দিলেন।

রাজা : তুমি টাকা পাচ্ছ, বেশ অনেক টাকা, তবু কেন কলঘরটি ছাড়তে রাজি হচ্ছো না?

কৃষক : মান্যবর, এটা আমার পৈতৃক গৃহ। ওখানেই আমার পিতা তার জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেছেন এবং আমার ও আমার ভাইবোনদের লালন-পালন ও মৃত্যুবরণ করেছেন। এ ছাড়া আমার পুত্রেরও জন্ম হয়েছে এখানেই। এর সঙ্গে আমাদের এক ধরনের নাড়ির সম্পর্ক। আমি এটা বেচব না, বেচতে পারব না।

এতে সম্রাট খুবই রাগান্বিত হলেন। তিনি কৃষককে আবারও বললেন- ‘তুমি শুনে রাখ, আমি ওই স্থানে প্রাসাদ নির্মাণ করতে চাই।’ শুনে কৃষক বললেন, ‘মহারাজ বোধকরি বিস্মৃত হয়েছেন যে ওই জাঁতাকলগৃহ আমার প্রাসাদ।’ সম্রাট বললেন, ‘তুমি কি জান, যদি বিক্রি না কর তবে আমি এটা কেড়ে নিতে পারি?’

এ কথা শুনে কৃষক আবারও বললেন, ‘না, পারেন না, আপনি আমার মূল্যবান প্রিয় সম্পদ কেড়ে নিতে পারেন না; বার্লিন নগরে বিচারক আছেন।’

তা সত্ত্বেও সম্রাটের পক্ষ থেকে কলঘরটি ভেঙে ফেলার আদেশ জারি হল। যথারীতি কল ভাঙার প্রস্তুতি চলে। ভাঙার কাজ শুরুও হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে অনন্যোপায় হয়ে কলের মালিক সম্রাট ফ্রেডারিকের বিরুদ্ধে বিচারালয়ে মামলা ঠুকে দিলেন। চলতে থাকে বিচারকাজ। বিচারে শেষপর্যন্ত সম্রাট হেরে গেলেন।

বিচারপতি জরিমানা ধার্য করলেন এবং সম্রাটকে কলটি পুনরায় তৈরি করে দেয়ার আদেশ দিলেন। মহামতি ফ্রেডারিক বিচারপতির আদেশ শিরোধার্য করে ভাবলেন, আসলেই তো। এমনই হওয়া উচিত।

শাসকরা আইন গড়তে পারেন, গড়েন; কিন্তু তারা আইন ভাঙতে পারেন না। সম্রাটের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- ‘আমার সাম্রাজ্যে যে এমন সুবিচার হয় এবং এমন বিচারক রয়েছেন তা দেখে আমি অত্যন্ত প্রীত হলাম।’

দিন অতিবাহিত হতে থাকে। এ ঘটনার কয়েক বছর পর কলটির মালিক ঋণভারে জর্জরিত হয়ে কলটি বিক্রি করতে মনস্থির করলেন। খবরটি সহসা সম্রাটের কানে গেল এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঋণ শোধের জন্য প্রচুর অর্থ কৃষকের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দুর্ভাবনার কিছু নেই, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। আমি তোমার ঋণ শোধ করে দিচ্ছি। তোমাকে আর কলটি বিক্রি করতে হবে না।’

কৃষকের ওই জাঁতাকলগৃহটি যুগের পর যুগ সম্রাটের প্রাসাদের অদূরেই থাকে।

ঠিক এভাবেই ন্যায়ধর্ম দেশ থেকে দেশান্তরে যুগ যুগ ধরে আপন মহিমা বজায় রেখে চলেছে। এ ক্ষেত্রে উঁচু-নিচু, ধনী-নির্ধন, আশরাফ-আতরাফ সবকিছুই আসলে মনগড়া। সংকীর্ণ স্বার্থরক্ষার জন্য ন্যায়ধর্মকে যার যার মতো করে একেকজন ব্যবহার করে মাত্র।

বিচারের চেয়ে ন্যায়বিচার বড়, ন্যায়বিচারের চেয়েও সত্য বড়। আর এ সত্যকেই প্রতিনিয়ত ভাবলেশহীন হয়ে হত্যা করে চলেছে একশ্রেণির লোক। ফলে কোথাও বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে, কোথাও আবার মিথ্যা, অসত্য ও অবিচারকেই চালিয়ে নেয়া হচ্ছে ন্যায় ও সত্য বলে। তবে মনে রাখতে হবে, ন্যায়ের উপরে ধর্ম নেই। মিথ্যার আস্ফালন ক্ষণস্থায়ী, একমাত্র সত্যই শাশ্বত-চিরস্থায়ী। সত্যের উপরে কোনো ধর্ম নেই।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক

 

Advertisement

বিমল সরকার ন্যায়বিচার ন্যায়ধর্ম

Advertisement

আরও পড়ুন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

সাক্ষাৎকার উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি : নতুন করে ভাবতে হবে

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি : নতুন করে ভাবতে হবে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম