Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে আরও সতর্কতা প্রয়োজন

Advertisement

Icon

সালাহ্উদ্দিন নাগরী

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে আরও সতর্কতা প্রয়োজন

গ্যাস সিলিন্ডার। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

বাসায় কিংবা যানবাহনে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যু ও দুর্ঘটনার খবর অহরহ পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকারও আমরা সবাই জানি। ৩০ অক্টোবর রাজধানীর রূপনগরে বেলুনে গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৬ শিশু নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় অনেকেই আঁতকে উঠেছেন।

সব সময়, বিশেষ করে, বিভিন্ন উৎসবে ছোট ছোট শিশু গ্যাস বেলুন বিক্রেতাকে ঘিরে ধরে; বেলুন কেনার জন্য কাড়াকাড়ি লেগে যায়। তাই সবার চিন্তিত হওয়া খুবই যৌক্তিক। তবে প্রশ্ন হল, কেন এমন হল? ওই বেলুন বিক্রেতা সিলিন্ডারকে মডিফাই করে গ্যাস প্রডিউসিং রিঅ্যাক্টর বানিয়ে হাইড্রোজেন তৈরি করে গ্যাস বেলুন বিক্রি করেছিল।

এতে সিলিন্ডার ফেটে বিস্ফোরণ ঘটে। এ পদ্ধতিতে গ্যাস বেলুন তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ১৭ নভেম্বর সকালে চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে একটি ভবনের দেয়াল উড়ে গিয়ে ৭ জনের মৃত্যু ও কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছে। এ সময় আশপাশের সব ভবন ও বাসাবাড়ি কেঁপে ওঠে।

হতাহতের স্বজনদের আহাজারিতে ঘটনাস্থল ও মেডিকেল কলেজ মর্গ এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একটি সূত্রমতে, ওই ভবনের নিচতলায় বাসায় রান্নার জন্য দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালানের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিস বলছে- গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ২০১৫ সালে ৮০টি, ২০১৬ সালে ১৩১টি এবং ২০১৭ সালে ৭৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ বছরে ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৭ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১ হাজার ৫৯০ জনের প্রাণ গেছে। বড় অগ্নিকাণ্ড মানেই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। এতে আগুনের তীব্রতা অত্যন্ত বেশি হয় এবং বিষাক্ত ভারি ধোঁয়ায় শ্বাসনালি ও ফুসফুস পুড়ে যায়। এ অবস্থায় দগ্ধদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বিস্ফোরক অধিদফতর সূত্র জানায়, দেশে আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ লাখ এলপিজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এবং যানবাহনে প্রায় ৪ লাখ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার ৬৫ শতাংশ বেশি মানুষ বাসে চলাচল করে। এসব বাসের ৯০ শতাংশ আবার সিএনজিচালিত।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের মতে, সিএনজিচালিত ৪৪ শতাংশ বাসের গ্যাস সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিএনজি সিলিন্ডার নিয়ে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন চলাচল করছে। বাস ছাড়াও ৩৬ শতাংশ ট্রাক ও ৯ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশার সিলিন্ডারের মেয়াদ শেষ।

বছরে অন্তত দেড়শ’ গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। গাড়িতে সিএনজি ব্যবহারে মাসে প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকা সাশ্রয় হলেও ব্যবহারকারীদের অসচেতনতায় নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানো যাচ্ছে না।

প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার ৫ বছর পরপর রিটেস্ট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে; কিন্তু সরকারের নানা প্রচেষ্টার পরও সিএনজিচালিত গাড়ির মালিক-চালকরা রিটেস্টে আগ্রহী হচ্ছে না। ফলে বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে চুলা থেকে সৃষ্ট অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে ২৩৮টি। আর এ সময় গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৬৫০টি। বাসা, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে আর এ সুযোগে এলপি গ্যাসের বাজারে ঢুকে পড়েছে অখ্যাত ও নিম্নমানের বহু কোম্পানি।

বিক্রি হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের পুরনো সিলিন্ডার। অনেক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নিচতলায় গ্যাস সিলিন্ডার রেখে পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যদি কোনো কারণে ওইসব সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে পুরো স্থাপনা ও বসবাসকারীদের কঠিন সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা গ্যাস রাইজার বাসার সামনে রাস্তার পাশেই স্থাপন করে থাকি, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ গ্যাস রাইজারের সমস্যা থেকেও বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে।

জনপদগুলোয় যেভাবে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকাগুলো একে অন্যের সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে এবং শহর এলাকায় যেভাবে গা ঘেঁষে একটার পর একটা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, তাতে শুধু সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়; যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার মাত্রা শত-সহস্রগুণ তীব্র ও মারাত্মক করে তুলবে।

আমরা এ বিষয়গুলো ভেবে দেখি না কেন? রাস্তাঘাটে গড়ে ওঠা হোটেল-রেস্তোরাঁর প্রবেশমুখের পাশে রাখা বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডার রান্নার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। সতর্কতার কোনো ব্যবস্থা নেই, আল্লাহ মাফ করুন- যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে; তাহলে প্রাণহানি ও ক্ষতির মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে?

বাসায় ২৪ ঘণ্টা গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখায় রান্নাঘর ও চুলার সংযোগ পাইপ গরম হয়ে ঝুঁকি বাড়ায়। আমাদের এ পুরনো বদভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। গ্যাসের পাইপ গরম বার্নারের সঙ্গে লেগে পাইপ গলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এদিকে আমাদের কোনো লক্ষই থাকে না।

চুলার পাশে, সিলিন্ডারের ওপর দিয়াশলাই রাখা বিপজ্জনক, যা পরিত্যাজ্য। রান্নাঘরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে সতর্কতা জরুরি। চুলা বন্ধ করার পর সিলিন্ডারের মুখ সেফটি ক্যাপ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।

জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় প্রতিনিয়ত দূরপাল্লার রুটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে মেয়াদোত্তীর্ণগুলো বাদ দিয়ে ভালো মানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হবে এবং সবাইকে সচেতন হতে হবে।

সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেয়ার সময় আমরা গাড়িতেই বসে থাকি, মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। কিন্তু প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস রিফিলের সময় সতর্কতামূলক বিষয়গুলো সাইনবোর্ডে লেখা থাকলেও আমরা সেগুলোকে মোটেই আমলে নিই না।

অবশ্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া কর্মীদেরও এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সিলিন্ডার ব্যবহারকারীরা যদি নিজেদের ও জনমানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আমলে না আনে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবাধ্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

খোলা ট্রাকে রোদের মধ্যে সিলিন্ডার পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া ত্রুটিপূর্ণ রাস্তার কারণেও বড় ধরনের ঝাঁকুনিতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বাস, টেম্পো ও অন্যান্য যানবাহনে অনেক সময় সিটের নিচে সিলিন্ডার বসানো হচ্ছে। যাত্রী নিরাপত্তায় এ সিলিন্ডার চেসিসের নিচে বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

বিস্ফোরক অধিদফতরের বার্ষিক প্রতিবেদনমতে, দেশে মোট আমদানি করা এলপিজি সিলিন্ডারের সংখ্যা ৩৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৮টি। আর দেশে তৈরি অনুমতিপ্রাপ্ত বাজারজাতকৃত সিলিন্ডারের সংখ্যা ১১ লাখ ৪ হাজার ৩৪৫। এসব সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই।

সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি-বেসরকারি যেসব সংস্থা কাজ করছে, এ ব্যাপারে তাদের পুরোপুরি সক্ষমতা নেই। সারা দেশে মাত্র ৪টি এলপিজি তৈরির কারখানা ও ১৫টি পুনঃপরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। এ ধরনের কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো দরকার।

সারা দেশে বাসাবাড়ি, স্থাপনা ও যানবাহনের সব গ্যাস সিলিন্ডার মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। জননিরাপত্তার উপায় বের করতে হবে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা যানবাহনের বার্ষিক নবায়নের সময় গ্যাস সিলিন্ডার ক্লিয়ারেন্সের শর্ত বেঁধে দেয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন এবং একই সঙ্গে নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ সব ধরনের গ্যাস সিলিন্ডারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার কথাও বলছেন।

অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক এ প্রস্তাবটি গ্রহণ করা যেতে পারে এবং একই সঙ্গে রাস্তায় যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করার সময় সিলিন্ডার টেস্টের রিপোর্টটিও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে।

গ্যাস সিলিন্ডারকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে ‘বোমা’, ‘চলন্ত বোমা’ ইত্যাদি হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এগুলো অরক্ষিত ও অনিরাপদ। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, অকালে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ; পঙ্গু হচ্ছে হাজারও মানুষ। তারপরও আমাদের মধ্যে সতর্কতা সেভাবে এখনও লক্ষ করা যাচ্ছে না।

মানুষের বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, যানবাহন প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার মাত্রা কমিয়ে আনার জন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করলে ছোটবেলা থেকে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে উঠতে পারে।

কই সঙ্গে জনগণকে সার্বক্ষণিক সচেতন রাখার জন্য ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবিধা নেয়া যেতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার শুভক্ষণে আমাদের আইন অমান্যতা, অসাবধানতা, অসচেতনতা, বেখেয়ালিপনা ও অন্যায় কার্যক্রমের জন্য জানমালের নিয়মিত ক্ষতি হতেই থাকবে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

 

Advertisement

সালাহ্উদ্দিন নাগরী গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্ফোরণ

Advertisement

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকার উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি : নতুন করে ভাবতে হবে

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি : নতুন করে ভাবতে হবে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

মা দুর্গার আগমন

মা দুর্গার আগমন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম