ব্যাংকিং সমস্যা শেয়ারবাজারকে অনিশ্চিত করে তুলছে

  ড. আর এম দেবনাথ ২৩ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক

এপ্রিল আসতে আর বেশিদিন দেরি নেই। জানুয়ারি যায় যায়। সারা দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ‘নয়-ছয় সুদনীতি’ বাস্তবায়নের জন্য। সরকার এটা চায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায়। দীর্ঘদিনের কথা। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে না নানা বাহানায়। সর্বশেষ বলা হয়েছে, এপ্রিল ২০২০ থেকে ‘নয়-ছয় সুদনীতি’ অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই অপেক্ষা। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সমস্যা কিছু রয়েই যাচ্ছে। এক সমস্যা তো আমানত (ডিপোজিট) আছেই।

এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলো নিশ্চিত হতে পারছে না বলে জানানো হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এখন শেয়ারবাজারের সমস্যা। শেয়ারবাজারের বর্তমান সমস্যা যে নয়-ছয় সুদনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে, তা আগে বোঝা না গেলেও এখন টের পাওয়া যাচ্ছে। কীভাবে? শেয়ারবাজরে প্রতিদিন একের পর এক পতন ঘটছে। সূচক উঠছেই না। সরকার ও অর্থমন্ত্রী প্রচুর আশ্বাস দিচ্ছেন। কিন্তু বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব নেই।

শেয়ারবাজারের বর্তমান সমস্যার কারণ সম্পর্কে প্রতিদিন কাগজে লেখা হচ্ছে। অন্যতম বড় কারণের মধ্যে বিনিয়োগ একটা। দেখা যাচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগকারী, যারা ‘পোর্টফলিও’তে বিনিয়োগ করেন, তারা বিনিয়োগে আসছেন না। বরং যা বিনিয়োগ ছিল তা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। গুজবকে আরেকটা সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ তো ভীষণ পুরনো সমস্যা।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ এ বাজারে এখন নেই। শেয়ারবাজার চলে ব্যাংকের ঋণে। এ কথার ভিত্তি কী? ভিত্তি হিসেবে সাবেক অর্থমন্ত্রীর মূল্যায়নকে সামনে আনা যায়। তিনি একটি দৈনিকে ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে সম্প্রতি শেয়ারবাজার সম্পর্কে যা বলেছেন তা হচ্ছে এই : ‘এটা খুবই দুঃখজনক (শেয়ারবাজার পরিস্থিতি)। এখানে বাজারটা সবসময়ই ফাটকা বাজার হিসেবে থেকে গেছে। আসলে আমরা সঞ্চয় করি না, খালি খরচ করি। ভারতের সবাই সঞ্চয় করে।

সম্পদ ভালো থাকলে খরচের প্রবণতা ভালো, যেটা যুক্তরাষ্ট্রে আছে।’ এর থেকে বোঝা যায় আমাদের শেয়ারবাজার আমাদের সঞ্চয়কারীদের ওপর ভরসা করে চলে না। সঞ্চয়কারীদের ব্যাংক ঋণের দরকার হয়। এখন সেই ঋণে টান পড়েছে। ব্যাংকের তারল্য সংকট আছে।

শুধু তাই নয়, আরেকটি বড় ঘটনাও শেয়ারবাজারকে প্রতিকূলভাবে প্রভাবান্বিত করছে। আর সেটি হচ্ছে গ্রামীণফোন ঘটনা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে গ্রামীণফোনের ‘লেনা-দেনা’ আছে। বহু টাকা বিটিআরসির পাওনা গ্রামীণফোনের কাছে। তা তারা না দিয়ে ‘কোর্ট-কাচারি’ করছে। ফলে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দামে পতন ঘটছে, অথচ এটা শেয়ারবাজারের বড় শেয়ার। বিশাল বাজার তার।

সম্প্রতি এক ইন্টারভিউয়ে সাবেক উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন কৌশলগত বিনিয়োগ সম্পর্কেও। ‘ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন’ কার্যকর হয়েছে অর্থাৎ শেয়ারবাজারের ব্যবস্থাপনাকে মালিকানা থেকে আলাদা করা হয়েছে। চীন থেকে কৌশলগত বিনিয়োগও নেয়া হয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রভাব শেয়ারবাজারে নেই। এছাড়া রয়েছে আমাদের বিনিয়োগকারীদের দৈনিক ব্যবসার মনোবৃত্তি। তারা শেয়ার ধরে রাখতে রাজি নন। সকালে কিনতে চান তারা, বিকালে বিক্রি। বস্তুত এদের বিনিয়োগকারী বলা চলে না। এরা অন্য ব্যবসায়ীদের মতোই ব্যবসায়ী। অনেকে এ সমস্যাকে আরেকটি বড় সমস্যা বলে চিহ্নিত করছেন। আর সর্বোপরি আস্থার সংকট তো শেয়ারবাজারের পুরনো রোগ।

উপরে আলোচিত সমস্যাগুলো ছাপিয়ে উঠে এসেছে আরও বড় সমস্যা। শেয়ারবাজারের সূচকে পতন ঘটছে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের শেয়ারের দামেও পতন ঘটছে। অথচ ব্যাংক শেয়ারবাজারের প্রাণ। মোট ত্রিশটি ব্যাংকের শেয়ার আছে বাজারে। মোট ‘মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের’ একটা বিরাট অংশজুড়ে আছে ব্যাংকের শেয়ার। অথচ এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে একটি ভয়াবহ চিত্র। সর্বশেষ বাজার পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান ৮টি ব্যাংকের শেয়ারের দাম ‘ফেইস ভ্যালুর’ নিচে। অর্থাৎ শেয়ারের প্রকৃত মূল্য যা, তার চেয়েও কম দামে তা বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

আরও ৮টি ব্যাংকের শেয়ারের দাম ‘ফেইস ভ্যালুর’ সামান্য উপরে। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের অর্ধেকের অবস্থা খারাপ। অথচ ব্যাংকের শেয়ার বরাবরই দামি শেয়ার ছিল। বিনিয়োগকারীরা এর ওপর ভরসা রাখত। সর্বশেষ পরিস্থিতি বলছে, বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের শেয়ারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। আস্থা হারানোর কারণ অনেক। এ মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতে ‘খেলাপি ঋণ’ নিয়ে নানা ঘটনা ঘটছে। ঋণের পুনঃতফসিলিকরণে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সরকার ঋণখেলাপিদের নানা ধরনের সুযোগ দিয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের ধারণা, ব্যাংকের মুনাফা আগামী দিনে হ্রাস পাবে।

আরও কথা আছে। ‘নয়-ছয় সুদনীতির’ ফল শেষ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোয় কীভাবে পড়বে তাও বিনিয়োগকারীদের সামনে পরিষ্কার হচ্ছে না। একটা অস্পষ্টতা সর্বত্র। এতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন ব্যাংক মালিকরা এবং ব্যাংকের নির্বাহীরা। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক সভায় কতগুলো প্রণিধানযোগ্য কথা বলেছেন। তাদের কথা হল- এপ্রিল থেকে ঋণের সুদ কমাতে হলে এখনই আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি সরকারি আমানত যত দ্রুত মিলবে, তত সুবিধা হবে। তবে ক্রেডিট কার্ডের সুদ হার যেমন কমানো যাবে না, তেমনি ৯ শতাংশ সুদ কার্যকর করা সম্ভব হবে না ছোট ও খুচরা ঋণেও। আবার ব্যাংকগুলোর সুবিধা হলেই বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল করবে। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তাদের এসব কথার মধ্যে অনেক কথা আছে। প্রথম কথা হল, ঢালাওভাবে ৯ শতাংশ সুদ ঋণের ওপর কার্যকর করা যাবে না। ঢালাওভাবে পুনঃতফসিল সুবিধাও দেয়া যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, তারা ৬ শতাংশে আমানত পাওয়ার নিশ্চয়তা চান। সরকারি আমানতে অনিশ্চয়তা আছে। সরকারের সব ‘কর্পোরেশন’ থেকে সরকার সব টাকা তুলে নিচ্ছে বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য। অতএব, এসব সংস্থা বিভিন্ন ব্যাংকে যে মেয়াদি আমানত রাখত তার সুযোগ আর থাকবে না। দ্বিতীয়ত, ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির জমানায় ৬ শতাংশে আমানত পাওয়া যাবে কি না, ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা তাতেও নিশ্চিত নন। আরও কারণ, ৬ শতাংশ সুদ নয়, এর থেকে ১০-১৫ শতাংশ আয়কর উৎসে কেটে নেয়া হবে। তাহলে প্রকৃত সুদহার হবে ৫ শতাংশের মতো।

এখানে দেখা যাচ্ছে, ‘স্প্রেড’ হচ্ছে মাত্র তিন শতাংশ। স্প্রেড মানে আমানতের ওপর সুদ আর ঋণের ওপর সুদের পার্থক্য। ৩ শতাংশ ‘স্প্রেডের’ টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে হবে, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এখন থেকে যে ঋণখেলাপি হবে, তার জন্য ‘প্রভিশন’ও এই স্প্রেডের টাকা থেকেই রাখতে হবে। অনেক ব্যাংকার বলছেন, এটা সম্ভব নয়। ছোট ছোট ঋণ, মাঝারি ঋণ ইত্যাদিতে ‘কস্ট অব সুপারভিশন’ অনেক বেশি। ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা তাই এসব ঋণে উচ্চতর সুদহার ধার্য করতে চান।

ব্যাংকারদের দ্বারা চিহ্নিত এসব সমস্যা আজকের নয়। গত ১-২ বছর ধরেই এ নিয়ে আলোচনা চলছে। বস্তুত যেদিন থেকে ‘নয়-ছয় সুদনীতি’ নিয়ে কথা হচ্ছে, সেদিন থেকেই এসব সমস্যা আলোচনার শীর্ষে। মনে হচ্ছে, এসব সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। প্রশ্ন, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতদিন কী করল? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ। অর্থমন্ত্রী চান। তারপরও ‘নয়-ছয় সুদনীতির’ জট খুলছে না কেন? খুলছে না তো খুলছে না। কিন্তু এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে শেয়ারবাজারে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ব্যাংকের মুনাফা কমিয়ে দেবে। এতে লভ্যাংশ কম হবে। খেলাপি ঋণ নিয়েও বড় প্রশ্ন।

একটা ধারণার জন্ম হয়েছে যে, খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে। কারণ খারাপ খেলাপিরা সুযোগ পাওয়ায় ভালো ঋণগ্রহীতারা ক্ষতিগ্রস্ত। যারা ব্যাংকের টাকা নিয়মিত শোধ করেন, তারা নানা সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এখন দেখা যাচ্ছে তারাও খেলাপি হতে চাইছে। হবেই না বা কেন? এটা আমাদের দেশের এক বড় সমস্যা। সব ক্ষেত্রেই নিয়মিত গ্রাহক, নিয়মিত করদাতা, নিয়মিত বিলদাতারা ঠকে। যারা খেলাপি তাদের দাপটই বেশি।

এসব ব্যাংকিং সমস্যা শেয়ারবাজারকে অনিশ্চিত করে তুলছে। বিনিয়োগকারীরা দেখছেন, ব্যাংকে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের চাকরি যাচ্ছে। যদি তাদের অবস্থা ভালো হতো, তাহলে কি লোকের চাকরি যেত? এভাবে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকের সমস্যা শেয়ারবাজারে উপচে পড়েছে; আবার শেয়ারবাজারের সমস্যা ব্যাংকে পড়ছে। রয়েছে সঞ্চয়ের বাজারের সমস্যা, আবাসন শিল্পের সমস্যা, স্বর্ণের দামের সমস্যা। বস্তুত এসব সমস্যা একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪৮ ১৫
বিশ্ব ৬,৫০,৫৬৭১,৩৯,৫৫২৩০,২৯৯
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×